ঢাকা বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬

ভারত সফরের পর নারীর মস্তিষ্কে মিলল ৩৮ পরজীবী

ভারত সফরের পর নারীর মস্তিষ্কে মিলল ৩৮ পরজীবী
×

মস্তিষ্কে পরজীবী নিয়ে দীর্ঘ লড়াইয়ের পরও ভারতের মানুষ, সংস্কৃতি, খাবার ও প্রকৃতিকে ভালোবাসার সঙ্গে স্মরণ করেন লাওরি। ছবি: সংগৃহীত

বিবিসি

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬ | ১২:০৩

একদিন হঠাৎ এমন একটি দৃশ্য দেখেছিলেন, যা আজও ভুলতে পারেন না লাওরি ডেনম্যান। প্রায় এক মিটার লম্বা, ফিতার মতো দেখতে একটি কৃমি বেরিয়ে এসেছিল তার শরীর থেকে। ঘৃণায় সেটি সঙ্গে সঙ্গেই ফ্লাশ করে দেন। তখন তিনি বুঝতেই পারেননি, ওই ঘটনাই ছিল ভয়াবহ এক রোগের শুরু।

তিন বছর আগে, ২০০৭ সালে, যুক্তরাজ্যের ওয়েলসের বাসিন্দা লাওরি তিন মাসের জন্য ভারত ভ্রমণে গিয়েছিলেন। রঙিন সেই সফরে তিনি ঘুরেছেন নানা শহর, উপভোগ করেছেন প্রকৃতি, মানুষ আর সংস্কৃতি। খাদ্যে বিষক্রিয়ার ভয় এড়াতে পুরো সফরজুড়ে মাংসও খাননি। কিন্তু চিকিৎসকদের ধারণা, অজান্তেই তিনি এমন কোনো খাবার বা দূষিত পানি গ্রহণ করেছিলেন, যাতে শূকরের ফিতাকৃমির অতি ক্ষুদ্র ডিম ছিল।

২০০৭ সালের ভারত সফরের স্মৃতি আজও ভালোবাসার সঙ্গে মনে করেন লাওরি

সেই সফরের তিন বছর পর, ২০১০ সালে, শৌচাগারের সেই অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন তিনি। চিকিৎসকের কাছে গেলেও পরীক্ষায় কোনো সমস্যা ধরা পড়েনি। তাই জীবন আবার স্বাভাবিক ছন্দেই চলতে থাকে। কিন্তু বেশিদিন নয়। কিছুদিনের মধ্যেই শুরু হয় তীব্র মাথাব্যথা। এরপর একদিন হঠাৎ খিঁচুনি। জ্ঞান ফেরে অ্যাম্বুলেন্সে।

হাসপাতালে সিটি স্ক্যান ও এমআরআই করার পর চিকিৎসক তাকে এবং তার মাকে বসিয়ে যে খবরটি দেন, তা যেন বজ্রাঘাতের মতো ছিল-লাওরির মস্তিষ্কে রয়েছে ৩৮টি পরজীবী।

প্রথমে চিকিৎসকেরা অন্য একটি সংক্রমণের সন্দেহ করলেও পরে নিশ্চিত হন, তিনি নিউরোসিস্টিসারকোসিস নামে বিরল এক রোগে আক্রান্ত। শূকরের ফিতাকৃমির ডিম শরীরে প্রবেশ করলে এই রোগ হতে পারে। পরজীবীগুলো রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছে সেখানে বাসা বাঁধে এবং খিঁচুনি, তীব্র মাথাব্যথা, এমনকি মানসিক বিভ্রান্তিও সৃষ্টি করতে পারে।

২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বোনের সঙ্গে লাওরি

দুই সপ্তাহ হাসপাতালে রেখে তাকে পরজীবীনাশক ওষুধ ও স্টেরয়েড দেওয়া হয়। কয়েক বছর সবকিছু ভালোই চলছিল। তিনি আবার ভ্রমণ করেছেন, পড়াশোনা করেছেন, এমনকি ম্যারাথনেও অংশ নিয়েছেন।

কিন্তু রোগটি আবার ফিরে আসে। মস্তিষ্কে পরজীবীগুলোর চারপাশে মারাত্মক প্রদাহ দেখা দেয়। ধীরে ধীরে তিনি বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। তীব্র উদ্বেগ, আতঙ্ক আর সাইকোসিসে আক্রান্ত হয়ে ছয় সপ্তাহ নিউরোসাইকিয়াট্রিক হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়। তার ঘনিষ্ঠজনেরা পর্যন্ত একসময় তাকে চিনতে পারতেন না।

বহু বছরের চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও লড়াইয়ের পর আজ লাওরি সুস্থ। মস্তিষ্কে থাকা পরজীবীগুলো এখন ক্যালসিফাইড, অর্থাৎ নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। ২০১৭ সালের পর তার আর খিঁচুনি হয়নি, যদিও সারা জীবন তাকে মৃগীরোগের ওষুধ খেতে হবে।

অদ্ভুত হলেও সত্য, এত কিছুর পরও ভারতের প্রতি তার কোনো ক্ষোভ নেই। বরং তিনি বলেন, ভারতের মানুষ, সংস্কৃতি, প্রকৃতি ও সেই ভ্রমণের স্মৃতি আজও তার কাছে অমূল্য।

এখন তার একটাই লক্ষ্য-নিজের অভিজ্ঞতা অন্যদের জানানো। কারণ, তার বিশ্বাস, সচেতনতা তৈরি করতে পারলে হয়তো আরেকজন এমন ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়ার আগে সতর্ক হতে পারবেন।

আরও পড়ুন

×