কট্টরপন্থিদের চাপের মুখে সমঝোতাকারীরা
ইরানের ভেতরে দ্বন্দ্ব
ছবি: সংগৃহীত
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ১০:১৩
ইরানের অভ্যন্তরে চাপের মুখে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরকারীরা। কট্টরপন্থিরা চাইছেন কঠোর পদক্ষেপ এবং তারা প্রকাশ্যেই বিরোধিতা করছেন নেতৃস্থানীয়দের। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের খবরে উঠে এসেছে তথ্যটি। এমন একটি সময় এ খবর সামনে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান একে অন্যকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়েছে।
সিএনএনের খবর বলছে, ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শোক অনুষ্ঠান চলাকালে তাঁর কফিনের পাশ দিয়ে হাঁটার সময় দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে লক্ষ্য করে জনতা চিৎকার করে উঠেছিল, ‘সমঝোতাকারীর জন্য মৃত্যু’। ওই স্থানের খুব কাছেই ভিন্ন পরিস্থিতির মুখে পড়েছিলেন ইরানের শীর্ষ আলোচক আব্বাস আরাঘচি। তাঁকে লক্ষ্য করে মানুষ পাথর ছুড়তে শুরু করে এবং একপর্যায়ে তিনি পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। প্রসঙ্গত, ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে তিনি আলোচনা চালিয়েছিলেন এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ওপর থেকে কিছু নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ব্যবস্থা করেছিলেন। তাঁকে লক্ষ্য করে পাথর ছোড়ার সময় জনতা বলেছিল, ‘বিশ্বাসঘাতক, বিক্রি হয়ে যাওয়া ব্যক্তি’।
পুরো পরিস্থিতি একটি গুঞ্জনকে সামনে নিয়ে এসেছে, যা কয়েক মাস ধরেই চলছে। আর তা হলো, ইরানের যুদ্ধকালীন নেতা যারা আলোচনা করেছেন এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমঝোতায় স্বাক্ষর করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে এক ধরনের অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টা চলছে। সিএনএনের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজায় জড়ো হওয়া কট্টরপন্থিদের বেশির ভাগই বিশ্বাস করেন যে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করে কার্যত আত্মসমর্পণ করেছেন নেতারা এবং তারা সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির নির্দেশ লঙ্ঘন করেছেন। আলি খামেনির মৃত্যুর পর তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন ছেলে মোজতবা খামেনি। তবে এখনও ইরানের এই নতুন সর্বোচ্চ নেতাকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। এমনকি তিনি প্রকাশ্যে কোনো বক্তব্যও রাখেননি। যদিও তাঁর নামেই চলছে সবকিছু।
কট্টরপন্থিদের অভিযোগ, ইরানের বর্তমান নেতারা পার্লামেন্টের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করছেন। তারা মোজতবা খামেনির কথা শুনছেন না। এরই মধ্যে ইরানের কট্টরপন্থি আইনপ্রণেতা মাহমুদ নাবাভিয়ান সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ‘ইরানের জনসাধারণের উদ্দেশে সতর্কবার্তা: অভ্যুত্থান কি ঘটতে চলেছে?’
মোজতবা খামেনির অনুপস্থিতিতে মুখ্য আলোচক বাঘের গালিবাফ, পেজশকিয়ান, আরাঘচি– এরাই হয়ে উঠেছেন সবচেয়ে পরিচিত মুখ। সর্বোচ্চ নেতাকে না পেয়ে অসন্তুষ্ট হয়ে উঠেছেন কট্টরপন্থিরা। নতুন নেতাদের অবস্থানও মেনে নিতে পারছেন না তারা। ফলে তাদের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ঘটানোর অভিযোগ তুলতে শুরু করেছেন তারা। অন্তত সেটিই বলছেন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আরাশ আজিজি।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিতীয় দফায় সংঘাত শুরু হওয়ায় কট্টরপন্থিদের আশা কিছুটা হলেও পূরণ হয়েছে। তবে সংঘাত শুরু হওয়ার আগে সপ্তাহব্যাপী তারা ইরানের নেতাদের সমালোচনা করেছেন। প্রকাশ্যে ইরানের প্রেসিডেন্টকে হত্যার হুমকিও দিয়েছেন মোহাম্মদ আলি বকশি নামে এক ব্যক্তি। তিনি সরাসরি তাঁকে বলেছেন, ‘যদি নেতার (মোজতবা খামেনি) শর্ত পূরণ না হয়, তাহলে আমরা আসব এবং বিষয়টি মোড় নেবে আমাদের চাকু এবং আপনার গলা পরিস্থিতির দিকে। আমরা আপনার ওপর নরক নামিয়ে আনব।’
কট্টরপন্থিদের সরানো হচ্ছে।
এদিকে ইরানের অভ্যন্তরে কট্টরপন্থিদের সরিয়ে দেওয়ার কাজও শুরু হয়ে গেছে। গত মঙ্গলবার সমঝোতা স্মারকের বিরোধিতাকারী নাবাভিয়ানকে অপসারণ করা হয়েছে পদ থেকে। তিনি দেশটির পার্লামেন্টের জাতীয় সুরক্ষা কমিশনের সঙ্গে কাজ করতেন। সমঝোতার বিরোধিতা করার আগে নাবাভিয়ান ইরানের আলোচক দলেরও অংশ ছিলেন। তিনি গণমাধ্যমে সমঝোতার শর্তগুলো ফাঁস করে দিয়ে আলোচনা ব্যর্থ করার চেষ্টা করেছিলেন বলে উল্লেখ করেছে সিএনএন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের বর্তমান নেতারা সক্রিয়ভাবে কট্টরপন্থিদের কোণঠাসা করার চেষ্টা করছেন। এ প্রসঙ্গে জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের হামিদরেজা আজিজি বলেন, ‘আমরা গালিবাফকে প্রভাব খাটিয়ে এই কট্টরপন্থি উপাদানগুলো পাশ কাটাতে দেখছি।’ তিনি আরও জানান, কট্টরপন্থিরা সিস্টেমের জন্য বেশি ঝুঁকি তৈরি করছেন এবং তারা প্রকাশ্যে শত্রুতা শুরু করেছেন, বিশেষ করে এমন এক সময়ে যখন ইরানের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে শুরু করেছে। সিএনএনের বিশ্লেষণ বলছে, তারা (কট্টরপন্থিরা) সংখ্যায় নগণ্য, তবে তারা দেশজুড়ে প্রভাব বিস্তারকারী অবস্থানগুলো ধরে রেখেছে– পার্লামেন্ট থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি-সব স্থানেই তাদের উপস্থিতি রয়েছে এবং সেসব অবস্থান থেকেই তারা প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে প্রচার শুরু করেছে।
এই গোষ্ঠীর দেশজুড়ে কতটা সমর্থন রয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। তবে তাদের মধ্যে একজন ব্যক্তিত্ব– সাবেক রাষ্ট্রীয় সুরক্ষাপ্রধান সায়েদ জালিলি ২০২৪ সালের নির্বাচনে এক কোটি ৩০ লাখেরও বেশি ভোট পেয়েছিলেন। ইরানের জনসংখ্যা প্রায় ৯ কোটি ৩০ লাখ।
- বিষয় :
- ইরান
- যুক্তরাষ্ট্র
- সমঝোতা