ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

‘আমি ধীরে ধীরে মারা যাচ্ছি’, ক্যানসারের চিকিৎসার অপেক্ষায় গাজার শিক্ষক

‘আমি ধীরে ধীরে মারা যাচ্ছি’, ক্যানসারের চিকিৎসার অপেক্ষায় গাজার শিক্ষক
×

প্রায় নয় মাস ধরে গাজার বাইরে চিকিৎসার অনুমতির অপেক্ষায় আছেন দুই সন্তানের মা খালুদ। ছবি: মিডল ইস্ট আই

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬ | ২০:০২

৩৩ বছর বয়সী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক খালুদ আবু সাহমুদ লিভার ক্যানসারে আক্রান্ত। প্রায় নয় মাস ধরে গাজার বাইরে চিকিৎসার অনুমতির অপেক্ষায় আছেন দুই সন্তানের মা খালুদ। কিন্তু এখনো বের হতে পারেননি। এদিকে গাজায় ক্যানসারের ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর তীব্র সংকটে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমি ধীরে ধীরে মারা যাচ্ছি।’ 
 
মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের একটি স্কুলে আশ্রয় নিয়েছেন খালুদ। যুদ্ধের কারণে স্কুলটি এখন আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সেখানকার সিঁড়ির নিচের ছোট্ট একটি জায়গায় পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন তিনি।

খালুদ জানান, প্রায় নয় মাস আগে কন্যাসন্তানের জন্মের পর তার লিভার ক্যানসার ধরা পড়ে। এরপর ১৫ দফা কেমোথেরাপি দেওয়া হলেও চিকিৎসকেরা পরে জানান, গাজায় যে ওষুধ রয়েছে, তা তার ক্যানসারের জন্য উপযোগী নয়।

খালুদ বলেন, ‘কেমোথেরাপি আমার ক্যানসার সারাতে পারেনি। শুধু চুল ও নখ পড়ে গেছে। প্রায় প্রতিদিনই নখের কিছু অংশ খুলে পড়ে।’

ওষুধের তীব্র সংকট
২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও গাজায় জীবনরক্ষাকারী ওষুধ, ক্যানসারের ওষুধ, অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যানেসথেটিক, পরীক্ষাগারের সরঞ্জাম ও অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রবেশে কঠোর বিধিনিষেধ বহাল রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চের মধ্যে গাজার প্রয়োজনীয় ওষুধের ৪৬ শতাংশ এবং চিকিৎসাসামগ্রীর ৬৬ শতাংশ পুরোপুরি ফুরিয়ে যায়।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিশেষায়িত ক্যানসারের ওষুধের সংকটের কারণে স্তন, কোলন, পরিপাকতন্ত্র, মাথা ও গলার ক্যানসারসহ বিভিন্ন ধরনের রোগীর কেমোথেরাপি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।

মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গাজায় প্রায় ১১ হাজার ক্যানসার রোগীর মধ্যে অন্তত চার হাজার জনের চিকিৎসার জন্য বাইরে যাওয়ার রেফারেল রয়েছে। তবে তারা এখনো অনুমতির অপেক্ষায়।

‘প্রতিদিনই অবস্থার অবনতি হচ্ছে’
গাজার ক্যানসার সেন্টারের পরিচালক চিকিৎসক মোহাম্মদ আবু নাদা বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় কেমোথেরাপি-সংকটের মুখে পড়েছে গাজা। অনেক ক্ষেত্রে একাধিক ওষুধের পরিবর্তে একটি ওষুধ দিয়েই চিকিৎসা চালাতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসার কার্যকারিতা কমছে এবং মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে।

খালুদের চিকিৎসার রেফারেল অনুমোদিত হলেও নয় মাস ধরে তিনি গাজা ছাড়তে পারেননি। চিকিৎসকেরা তাকে জানিয়েছেন, তার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা জর্ডান বা তুরস্কে পাওয়া সম্ভব।

খালুদ বলেন, ‘অন্তহীন এই অপেক্ষায় প্রতিদিনই আমার স্বাস্থ্যের অবনতি হচ্ছে।’

তিনি জানান, শ্বাসকষ্ট, পেটে পানি জমে যাওয়া এবং অস্বাভাবিক ওজন কমে যাওয়ায় স্বাভাবিক জীবনযাপন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ইতিমধ্যে তার প্রায় ২০ কেজি ওজন কমেছে।

অন্তত ৩০ বার বাস্তুচ্যুত হন খালুদ
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধের পর অন্তত ৩০ বার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন খালুদ। তার বাড়ি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে থাকতে হয়েছে। বর্তমানে বড় বোনের পরিবারের সঙ্গে একটি স্কুল ভবনের সিঁড়ির নিচে প্রায় ১০ জন একসঙ্গে বসবাস করছেন।

খালুদের পাশে একটি বাক্সে রাখা রয়েছে তার ওষুধ। ইঁদুরের হাত থেকে বাঁচাতে সেগুলো যত্ন করে সংরক্ষণ করেন। আরেকটি ব্যাগে রয়েছে পড়াশোনা ও পেশাগত জীবনে অর্জিত প্রায় ৫০টি সনদ।

গাজার ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় রেকর্ড সময়ে স্নাতকোত্তর শেষ করার স্বীকৃতি পান তিনি। পরে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যক্রম ও শিক্ষাদান পদ্ধতি বিষয়ে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন।

খালুদ বলেন, ‘আমি পড়াশোনা ভালোবাসি। পুরো জীবন শিক্ষার জন্য উৎসর্গ করেছি। পিএইচডির পরও গবেষণা ও পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু অসুস্থতা আমার সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। সবচেয়ে কঠিন বিষয় হলো, চিকিৎসার অপেক্ষা- যার শেষ কবে, জানি না।’

সূত্র: মিডল ইস্ট আই

আরও পড়ুন

×