ঢাকা শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২৬

প্রখর রোদ আর কনকনে শীতের রাত, সেউতায় বাঁচার আকুতি

প্রখর রোদ আর কনকনে শীতের রাত, সেউতায় বাঁচার আকুতি
×

ছবি: দ্য গার্ডিয়ান

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬ | ২২:০০ | আপডেট: ০৮ আগস্ট ২০২৬ | ২২:৫২

স্পেনের সেউতা ভূখণ্ডে সুপ্রশস্ত অ্যাভিনিউ কিংবা গাছপালা ঘেরা শহরের কেন্দ্রস্থলের প্লাজাগুলো দেখলে বোঝার উপায় নেই যে, সম্প্রতি এখানেই ঘটে গেছে তোলপাড় সৃষ্টি করা এক ঘটনা। তবে, ব্যস্ত বার ও রেস্তোরাঁ থেকে মাইলেরও কম দূরে এল ট্রাম্পোলিন সৈকতে গেলে এই সংকটের স্থায়ী ক্ষত আর উপেক্ষা করার সুযোগ থাকে না।

‘আমরা এখানে একদম খোলা আকাশের নিচে। আমাদের কোনো তাঁবু বা কম্বল নেই’- বলছিলেন ২৬ বছর বয়সি ইমাদ। এসেছেন ইয়ামেন থেকে। মরক্কো সীমান্তঘেঁষা স্পেনের সেউতা ভূখণ্ডে গত সপ্তাহে যে ৭২ হাজারের বেশি মানুষ অনুপ্রবেশ করে, ইমাদ তাদেরই একজন। 

ইমাদা বলেন, ‘এখানে কোনো বাথরুম নেই। রাতে সমুদ্রের তীরে প্রচণ্ড ঠান্ডা। আর দিনে প্রখর রোদ, সহ্য করা যায় না। আমি রাতে টেনেটুনে দুই ঘণ্টাও ঘুমাতে পারি না।’

এক সপ্তাহ আগে সংকট শুরু হলেও কী কারণে হঠাৎ এমন ঘটনা- তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে সেউতা শহরের দোকানপাট খুলছে। এই শহরের ৮৪ হাজার বাসিন্দার অনেকেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরছেন। কিন্তু তারা ব্যাপক সংক্ষুব্ধ। দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক প্রধান হুয়ান হেসুস ভিভাস টিভিইকে বলেন, ‘সেউতা এখন চরম উত্তেজনার মুখে দাঁড়িয়ে। পরিস্থিতি মোটেও স্বাভাবিক হয়নি। মনে হচ্ছে যেন একদিনে ৫ কোটি মানুষ স্পেনে প্রবেশ করেছে।’

টিকটক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মতো সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দেখে উৎসাহী হয়ে আসলে কতজন স্পেনে প্রবেশ করেছে আর কতজনকে ফেরত পাঠানো হয়েছে- সেই হিসাব এখনও পাওয়া যায়নি। স্পেন সরকার বলছে, প্রায় ৭২ হাজার মানুষ সেউতায় প্রবেশ করেছিল। এরমধ্যে ২ হাজার ৫০০ জন সেখানে অবস্থান করছে। অন্যদিকে ভিভাসের মতে, অনুপ্রবেশকারী প্রায় ৮০ হাজার, যার মধ্যে ৫ হাজার সেখানে রয়ে গেছে। সীমান্ত পার হতে গিয়ে ঠিক কতজন প্রাণ হারিয়েছেন, সেই সংখ্যাটিও ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। ধারণা করা হচ্ছে, এই সংখ্যা ১৪১ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। কারণ বহু মানুষ এখনও নিখোঁজ।

ভিভাস জানান, সেউতার বাসিন্দাদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দিয়েছে সামাজিকমাধ্যমে আসা কিছু পোস্ট, যেগুলোতে আগস্টের মাঝামাঝি আবারও এমন অনুপ্রবেশের ডাক দেওয়া হয়েছে। হেসুস ভিভাস বলেন, ‘সেউতার মানুষ ভীষণ আতঙ্কিত। এটি হওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ আমাদের মনে প্রশ্ন- আবার কি একই ঘটনা ঘটবে?’

মরক্কোর কর্মকর্তারা এই যাত্রায় অভিবাসীদের উৎসাহিত করেছেন, এমনকি কোথাও কোথাও সরাসরি সহায়তার হাত বাড়িয়েছেন- অভিবাসীদের মুখে এমন কথা শুনে স্থানীয়রা বেশ মর্মাহত। ভিভাস বলেন, ‘এতে স্পষ্ট প্রমাণ হয় যে, আমাদের সীমান্ত নিরাপত্তা দুর্বল। মরক্কো বিশ্বাস করার মতো দেশ নয়।’

স্পেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন যখন এই সংকটের রাজনৈতিক প্রভাব সামলাতে ব্যস্ত, তখন সেউতা শহরে ঠাঁই নেওয়া অভিবাসীরা বেঁচে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত। তবে সংকট শুরুর দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ ছিল বলে জানিয়েছেন ইমাদ।

তিনি বলেন, ‘সবকিছু বন্ধ ছিল, আমরা ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় মরতে বসেছিলাম। গাছের পাতা খেয়েছি, ময়লা পানি পান করেছি।’ তবে গত কয়েক দিনে অবস্থার সামান্য উন্নতি হয়েছে বলে জানান তিনি। রেড ক্রসের মতো আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলো খাদ্য সহায়তা দিতে শুরু করেছে। স্পেন সরকার জানিয়ে, সৈকতে অতিরিক্ত বাথরুম ও শাওয়ারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পুলিশ একটি তথ্যকেন্দ্র চালু করতে যাচ্ছে।

প্রায় আট ঘণ্টা ক্লান্তিহীন সাঁতারের পর স্পেনে পৌঁছেন ইমাদ। ‘ভেবেছিলাম যেহেতু একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে এসেছি, আমাদের জন্য আশ্রয়ের আবেদন করাটা সহজ হবে। কিন্তু এসে দেখলাম অভিবাসী অভ্যর্থনা কেন্দ্রটি বন্ধ। কারোর জন্যই কোনো শিথিলতা নেই। সব দরজায় তালা ঝুলছে’- বলেন ইমাদ।

এখন খাবার আর আশ্রয়ের জন্য ইমাদকে প্রতিদিন সংগ্রাম করতে হয়। অন্যদিকে মনের মধ্যে তাড়িয়ে দেওয়ার আশঙ্কা। ইমাদ বলেন, ‘স্বপ্নে দেখি আমার পরিবার বোমাবর্ষণে মারা যাচ্ছে, কিংবা আমাকে টেনে-হিঁচড়ে মরক্কোয় পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মানসিকভাবে আমি ভেঙে পড়েছি।’

সেউতায় আটকে পড়া অভিবাসীদের মধ্যে এক হাজার ৩০০ জন শিশু। তাদের কোনো অভিভাবক নেই। বেসরকারি সংস্থাগুলো বলছে, শত শত শিশু নিরাপত্তাহীন অবস্থায় শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এক কিশোরী জানায়, সেউতা পৌঁছার পর সে অভ্যর্থনা কেন্দ্রে যায়, কিন্তু সেখানে জায়গা খালি নেই বলে জানিয়ে দেওয়া হয়। এরপর থেকে রাস্তায় খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে হচ্ছে। ‘আমি খাবার ছাড়া দিনের পর দিন কাটিয়েছি। নারীদের জন্য কেউ খাবার নিয়ে এলে, পুরুষরা ভিড় করে সব নিয়ে যেত, আমরা কিছুই পেতাম না। জামাকাপড়ের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে, লাইনের সামনে পৌঁছানোর আগেই সব শেষ’- বলে সে।

একপর্যায়ে বাড়ি ফিরে যাওয়ার কথা ভেবেছিল ওই কিশোরী। কিন্তু পরে বুঝতে পারে, মরক্কোয় নিজের পরিবারকে চরম দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করার জন্য চাকরি খুঁজে পাওয়ার এটিই সহজ পথ হতে পারে। ‘আমি একজন সাধারণ মেয়ের মতো বাঁচতে চাই। আমি কাপড় পরতে চাই, গোসল করতে চাই, পেট ভরে খেতে চাই, ঘুমানোর জন্য একটু আশ্রয় চাই, পড়াশোনা করতে চাই, কাজ করতে চাই। আর আমার পরিবারকে সাহায্য করতে চাই’- আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলে ১৬ বছরের মেয়েটি।

এমন করুণ পরিস্থিতি শহরতলির সিদি এমবারেক এলাকার বাসিন্দাদের এগিয়ে আসতে বাধ্য করেছে। সিদি এমবারেক পাড়াকল্যাণ সমিতির প্রধান আবদুল্লাহ আবদুল্লাহ মুস্তফা বলেন, ‘আমরা নারী ও শিশুদের নিয়ে উদ্বিগ্ন। মরক্কোয় ফেরত পাঠানোর ভয়ে অনেকে জঙ্গলে লুকিয়ে ঘুমাচ্ছে। এর মানে হলো, চরম ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে ছোট ছোট শিশুদের থাকতে হচ্ছে।’ পরিস্থিতি সামাল দিতে তারা একটি অস্থায়ী ক্যাম্প তৈরি করেছেন। একটি উঠানে তাঁবু খাটিয়ে সাময়িক আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। জায়গাটি স্থানীয়রা পাহারা দেন।

মুস্তফা বলেন, ‘আমরা তাদের নিরাপদে ঘুমানোর জন্য এটুকুই দিতে পারছি। আমাদের কাছে বাথরুম, বিছানা বা অন্য কোনো সম্পদ নেই। আমরা জানি এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়, এমনকি হয়তো আইনসম্মতও নয়। কিন্তু শিশুদের এভাবে অরক্ষিত ফেলে রাখা বড় অপরাধ বলে মনে হয়েছে।’

শহরের একটি ফ্ল্যাটে রান্না করে প্রতিদিন প্রায় ৪০০ মানুষকে খাওয়াচ্ছেন ডজনখানেক স্বেচ্ছাসেবক। আর স্থানীয় অলাভজনক সংস্থা ‘লুনা ব্লাঙ্কা’ প্রতিদিন প্রায় ৫ হাজার মানুষের মাঝে খাবার বিতরণ করছে। স্থানীয় বাসিন্দা আয়েশা আহমেদ আম্মার প্রতিদিন তার দুই সন্তানকে নিয়ে খাবার ও জামাকাপড় হাতে হাজির হন এল ট্রাম্পোলিন সৈকতে। নিজের মোবাইল ফোনের ওয়াইফাই হটস্পট চালু করে অভিবাসীদের সুযোগ করে দেন দেশে থাকা স্বজনের সঙ্গে কথা বলার। তিনি জানান, সুদান, মিসর ও ইয়েমেন থেকে আসা আশ্রয়প্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলে তিনি আপ্লুত হয়েছেন। আয়েশা বলেন, ‘তাদের সৌজন্যবোধ দেখে আমি অভিভূত। কিছু দিতে গেলে তারা প্রায়ই বিনয়ের সঙ্গে বলে- এটি আমাকে না দিয়ে অন্য কাউকে দিন, যার প্রয়োজন আমার চেয়েও বেশি।’

তবে সমস্যার বিশালতা আয়েশাকে অশ্রুসজল করে। আফসোস করে তিনি বলেন, ‘আপনার আরও কিছু করতে ইচ্ছে করবে, কিন্তু আপনি পারবেন না! এই অক্ষমতা আমাকে চরম অসহায়ত্বে ডুবিয়ে দেয়।’ সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

আরও পড়ুন

×