ঢাকা রোববার, ০৯ আগস্ট ২০২৬

সন্তান জন্ম দিতে বছরে কত মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে যান, কেন ‘বার্থ ট্যুরিজম’ ঠেকাতে চান ট্রাম্প

সন্তান জন্ম দিতে বছরে কত মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে যান, কেন ‘বার্থ ট্যুরিজম’ ঠেকাতে চান ট্রাম্প
×

ওয়াশিংটন ডিসিতে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের বাইরে শিশু সন্তানসহ এক বিক্ষোভকারী। ছবি: সংগৃহীত

বিবিসি

প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬ | ১৫:৪৩

যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দিয়ে শিশুকে দেশটির নাগরিকত্ব পাইয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে বিদেশিদের দেশটিতে যাওয়ার প্রবণতাকে বলা হয় ‘বার্থ ট্যুরিজম’। এ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দুটি নির্বাহী আদেশকে কেন্দ্র করে। ট্রাম্পের এসব আদেশের একটি লক্ষ্য বার্থ ট্যুরিজম বন্ধ করা, অন্যটি নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করা।

যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে জন্ম নেওয়ার কারণে নাগরিকত্ব পাওয়ার নীতিকে আইনগতভাবে ‘জুস সলি’ বা ‘মাটির অধিকার’ বলা হয়। দেশটির সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীতে এই নীতির ভিত্তি রয়েছে। গৃহযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া সাবেক দাসদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে ১৮৬৮ সালে এই সংশোধনী গ্রহণ করা হয়।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া প্রায় সব শিশুই স্বয়ংক্রিয়ভাবে মার্কিন নাগরিকত্ব পায়। বাবা-মা মার্কিন নাগরিক না হলেও সাধারণত শিশুর নাগরিকত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে তা বাধা হয় না। তবে বিদেশি কূটনীতিকদের সন্তানসহ কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রয়েছে।

বিদেশি নাগরিকেরা শুধু যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দেওয়ার উদ্দেশ্যে দেশটিতে ভ্রমণ করলে সেটিকে বার্থ ট্যুরিজম বলা হয়। সন্তান যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নিলে সাধারণত সে দেশটির নাগরিকত্ব পাওয়ায় এ ধরনের ভ্রমণের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়।

তবে যুক্তরাষ্ট্রে পর্যটন ভিসায় গিয়ে সন্তান জন্ম দেওয়া নিজে অবৈধ নয়। কিন্তু সন্তান জন্ম দেওয়াই ভ্রমণের মূল উদ্দেশ্য—এ তথ্য গোপন করে ভিসা নেওয়া বা ভিসার অপব্যবহার করা বেআইনি হতে পারে।

বার্থ ট্যুরিজমের সঠিক সংখ্যা নিয়ে সরকারি কোনো নির্ভুল পরিসংখ্যান নেই। কারণ কোনো নারী যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দেওয়ার উদ্দেশ্যেই দেশটিতে এসেছেন কি না, শুধু জন্মনিবন্ধনের তথ্য দেখে তা নির্ধারণ করা যায় না।

যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিদেশি ঠিকানা দেওয়া মায়েদের কাছে যুক্তরাষ্ট্রে ৯ হাজার ৫০০টির কিছু বেশি শিশু জন্ম নেয়। ওই বছর দেশটিতে মোট জন্ম হয়েছিল প্রায় ৩৭ লাখ। অর্থাৎ বিদেশি ঠিকানার মায়েদের কাছে জন্ম নেওয়া শিশুর সংখ্যা মোট জন্মের প্রায় শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ।

তবে এই ৯ হাজার ৫০০ শিশুকে বার্থ ট্যুরিজমের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া শিশু বলা যায় না। কারণ বিদেশ থেকে আসা কেউ যুক্তরাষ্ট্রে স্থানীয় কোনো ঠিকানা ব্যবহার করেও জন্মনিবন্ধন করতে পারেন।

মাইগ্রেশন পলিসি ইনস্টিটিউটের এক হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বছরে আনুমানিক ২০ হাজার থেকে ২৬ হাজার শিশু বার্থ ট্যুরিজমের মাধ্যমে জন্ম নেয়। এটি দেশটির মোট বার্ষিক জন্মের প্রায় শূন্য দশমিক ৫ থেকে শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ।

গবেষকদের মতে, বার্থ ট্যুরিজমের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন। কোনো নারী সন্তান জন্ম দেওয়ার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন কি না, সরকারি তথ্য থেকে সব সময় তা জানা যায় না।

ট্রাম্পের নতুন নির্বাহী আদেশের একটিতে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের বিদ্যমান ব্যতিক্রমের পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে নির্দিষ্ট কিছু শ্রেণির বাবা-মায়ের সন্তানদের নাগরিকত্বের সুযোগ সীমিত করার কথা বলা হয়েছে। অন্য আদেশটিতে বার্থ ট্যুরিজম বন্ধে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগকে আরও কঠোরভাবে আইন প্রয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এর আগে ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দিনেই জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করার একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেছিলেন ট্রাম্প। ওই আদেশে অস্থায়ী ভিসাধারী বা অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকারী অভিবাসীদের সন্তানদের স্বয়ংক্রিয় নাগরিকত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপের চেষ্টা করা হয়।

তবে চলতি বছরের জুনে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের ওই উদ্যোগের বিরুদ্ধে রায় দেয়। আদালত মনে করে, এ ধরনের বিধিনিষেধ যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বার্থ ট্যুরিজম দেখিয়ে দেয় যে বর্তমান জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব ব্যবস্থার অপব্যবহার হচ্ছে। তবে আদালতে এ যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রধান বিচারপতি জন রবার্টসের বক্তব্য ছিল, সময় ও পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলেও সংবিধানের বিধান একই থাকে।

বিশ্বের ৩০টির বেশি দেশে ব্যাপকভাবে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের ব্যবস্থা রয়েছে। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও মেক্সিকোসহ লাতিন আমেরিকার বেশির ভাগ দেশে এই নীতি কার্যকর।

উন্নত দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় সাধারণত বাবা-মায়ের নাগরিকত্ব বা অভিবাসন-অবস্থা বিবেচনা না করেই দেশটিতে জন্ম নেওয়া শিশুকে নাগরিকত্ব দেওয়া হয়।

অন্যদিকে যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে তুলনামূলকভাবে সীমিত ব্যবস্থা রয়েছে। এসব দেশে সাধারণত অন্তত একজন বাবা-মা নাগরিক বা স্থায়ী বাসিন্দা হলে শিশুর জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার তৈরি হয়।
 

আরও পড়ুন

×