ঢাকা রোববার, ০৯ আগস্ট ২০২৬

‘ক্যাট অ্যান্ড মাউস’ খেলা শেষে আয়ারল্যান্ডে কিনাহান, নেওয়া হবে কারাগারে

‘ক্যাট অ্যান্ড মাউস’ খেলা শেষে আয়ারল্যান্ডে কিনাহান, নেওয়া হবে কারাগারে
×

ড্যানিয়েল কিনাহান

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬ | ১৯:২৬

এক দশক আগে হত্যাচেষ্টা থেকে বেঁচে আয়ারল্যান্ড ছেড়েছিলেন ড্যানিয়েল কিনাহান। এরপর সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) দুবাইয়ে নির্বাসিত জীবন কাটিয়েছেন তিনি। সেখানে গড়ে তুলেছিলেন বিশাল বক্সিং সাম্রাজ্য। তবে এবার তাকে আয়ারল্যান্ডে ফিরতে হচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতিতে- সংগঠিত অপরাধ পরিচালনার অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

রোববার আয়ারল্যান্ড সরকারের একটি বিশেষ বিমানে করে দুবাই থেকে ড্যানিয়েল কিনাহানকে আয়ারল্যান্ডে নেওয়া হচ্ছে। দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে তাকে ডাবলিনে নেওয়ার কথা রয়েছে।

৪৯ বছর বয়সী কিনাহানকে ডাবলিনের ফৌজদারি আদালতে নিয়ে সংগঠিত অপরাধ পরিচালনার অভিযোগ আনা হবে। এরপর তাকে রাজধানী থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে পোর্টলাওয়েজ কারাগারে নেওয়া হবে।

কিনাহানকে দীর্ঘদিন ধরে আয়ারল্যান্ডভিত্তিক সংগঠিত অপরাধচক্রের অন্যতম নেতা হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এই চক্র ইউরোপের মাদক ব্যবসার বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করে বলে অভিযোগ রয়েছে। মাদক ব্যবসার পাশাপাশি অস্ত্র ও চাদাবাজির মতো অপরাধেও চক্রটির সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।

বক্সিংয়ের জগতেও প্রভাব
অপরাধ জগতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকলেও ড্যানিয়েল কিনাহান শুধু অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি হিসেবেই পরিচিত ছিলেন না। বক্সিং ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান এমটিকে গ্লোবালের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনি ক্রীড়া জগতেও প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন।

বিভিন্ন বিশ্বখ্যাত বক্সারের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। তাদের মধ্যে ব্রিটিশ বক্সার টাইসন ফিউরিও ছিলেন। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার সেই প্রভাব কমতে থাকে।

কিনাহানের বিরুদ্ধে এখনো বিচার শেষ হয়নি। তবে দুবাই থেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি দীর্ঘ কারাদণ্ডের আশঙ্কার কথা নিজেই জানিয়েছিলেন। অভিযোগগুলোর কিছু অতিরঞ্জিত এবং তাকে একধরনের ‘বলির পাঁঠা’ বানানো হয়েছে বলেও দাবি করেছিলেন তিনি।

২০১৬ সালের হামলার পর দেশ ছাড়েন
ড্যানিয়েল কিনাহানের বাবা ক্রিস্টোফার কিনাহান ১৯৮০-এর দশকে ডাবলিনে হেরোইন আমদানির মাধ্যমে অপরাধজগতের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে সেই নেটওয়ার্ক লাতিন আমেরিকা, উত্তর আফ্রিকা, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিস্তৃত হয়।

২০০৯ সালে মার্কিন একটি কূটনৈতিক নথিতে ড্যানিয়েল কিনাহানকে ইউরোপজুড়ে মাদক পাচারের সঙ্গে যুক্ত একজন আইরিশ ব্যবসায়ী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।

২০১৬ সালে কিনাহান ও প্রতিদ্বন্দ্বী হাচ গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত ভয়াবহ রূপ নেয়। ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে ডাবলিনের রিজেন্সি হোটেলে একটি বক্সিং প্রতিযোগিতার ওজন মাপার অনুষ্ঠানে ড্যানিয়েল কিনাহানকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। তিনি হামলা থেকে বেঁচে গেলেও ওই ঘটনার পর দুই পক্ষের সংঘাত আরও রক্তক্ষয়ী হয়ে ওঠে।

এরপর আয়ারল্যান্ডে তাকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। প্রথমে স্পেনের দক্ষিণাঞ্চলে এবং পরে দুবাইয়ে অবস্থান নেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের পুরস্কার ঘোষণা
কিনাহানদের ধরতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে থাকে। ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্র ড্যানিয়েল কিনাহান, তার বাবা ক্রিস্টোফার কিনাহান ও ভাই ক্রিস্টোফার জুনিয়রের তথ্যের জন্য ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার পর্যন্ত পুরস্কার ঘোষণা করে।

আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ফলে ধীরে ধীরে কিনাহান গোষ্ঠীর ওপর চাপ বাড়তে থাকে। ২০২৫ সালের মে মাসে আয়ারল্যান্ড ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি হয়। এর পরপরই কিনাহান গোষ্ঠীর আরেক সদস্য শন ম্যাকগভর্নকে ইউএই থেকে আয়ারল্যান্ডে প্রত্যর্পণ করা হয়। তাকে ২৪ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

চলতি বছরের এপ্রিলে ড্যানিয়েল কিনাহানকে ইউএইতে গ্রেপ্তার করা হয়। গত মাসে তার প্রত্যর্পণের বিরুদ্ধে করা আবেদনও খারিজ হয়ে যায়। ফলে আয়ারল্যান্ডে ফেরানোর পথ পরিষ্কার হয়।

এবার কারাগার
আয়ারল্যান্ডে ফেরার পর কিনাহানকে আদালতে নেওয়া এবং পরে কারাগারে স্থানান্তরের সময় বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পুলিশকে সহায়তা করতে দেশটির সামরিক বাহিনীর সদস্যদেরও মোতায়েন করা হতে পারে।

দুবাই থেকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কিনাহান তার দেশে ফেরাকে ঘিরে ‘তামাশা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। 

তবে আন্তর্জাতিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে তার আয়ারল্যান্ডে ফেরাকে দীর্ঘদিনের এক অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের সাবেক কর্মকর্তা গ্রেগ গ্যাটজানিসের ভাষ্য, কোনো সংগঠিত অপরাধচক্র চিরস্থায়ী হয় না। সেটি জন্ম নেয়, ধীরে ধীরে বড় হয়, একসময় শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তারপর পতন শুরু হয় এবং শেষ পর্যন্ত বিলীন হয়ে যায়।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

আরও পড়ুন

×