ট্রাম্পের কাছে গোপন ফ্লাইট চমকপ্রদ কৌশল, পুতিনের কাছে ‘ডালভাত’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: এএফপি
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬ | ১৫:৫৫ | আপডেট: ১৩ আগস্ট ২০২৬ | ১৬:২০
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উড়োজাহাজ বদলের ঘটনাটি সরকারি গোপনীয়তা বা বিভ্রান্তি ছড়ানোর এক অবিশ্বাস্য নজির ছিল। কিন্তু রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে ঘিরে থাকা গোপনীয়তার তুলনায় এটি কিছুই নয়। পুতিনের কর্মকাণ্ড এতটাই রহস্যে আচ্ছন্ন যে, তাঁর দপ্তরের গাছের পাতা কতটা শুকিয়ে গেছে, তা বিশ্লেষণ করেও গতিবিধি শনাক্তের চেষ্টা করেছেন অনুসন্ধানী সাংবাদিকরা।
পুতিনের কোনো বৈঠকের খবর যখন টেলিভিশনে প্রচার হয়, তখন ক্রেমলিন সেটির তারিখ উল্লেখ করে। কিন্তু বৈঠকটি আসলেই উল্লেখিত তারিখে হয় কি না, তা বোঝার জন্য চলতি বছর কয়েকজন সাংবাদিক গাছের পাতা বিশ্লেষণের পদ্ধতি অবলম্বন করেন। তারা দেখেছিলেন, কোনো দৃশ্যে গাছের পাতা শুকনো, আবার কোনোটিতে বেশি সতেজ। এ থেকে সিদ্ধান্তে উপনীত হন, বৈঠকের ছবি ভিন্ন ভিন্ন দিনে ধারণ করা হয়েছিল।
পুতিনের জন্য এ ধরনের কৌশল একদমই সাধারণ বা প্রাত্যহিক ঘটনা। এর সঙ্গে ট্রাম্পের উড়োজাহাজ বদলের ঘটনা তুলনা করে রাশিয়ার অনুসন্ধানী সাংবাদিক মিখাইল রুবিন বলেন, ‘এটি তো শিশুদের খেলা।’
রুবিনসহ আরও কয়েকজন সাংবাদিক পুতিনের গোপনীয়তার কৌশল বোঝার জন্য অনুসন্ধান চালিয়েছিলেন। এতে তারা দেখতে পান, রুশ প্রেসিডেন্ট তাঁর বেশ কয়েকটি বাসভবনে একইরকম অফিস কক্ষ বানিয়ে রেখেছেন। ফলে বৈঠকের ভিডিও দেখে তাঁর আসল অবস্থান বোঝার উপায় থাকে না।
বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন ও স্যাটেলাইট ছবির বরাতে জানা গেছে, নিরাপত্তা সংস্থা পুতিনের চলাচলের জন্য একটি বিশেষ ট্রেন ও রেললাইন তৈরি করেছে। গ্রামীণ এলাকায় থাকা পুতিনের অন্তত তিনটি বাসভবনের কাছে সেগুলোর গোপন স্টেশনও আছে।
রাশিয়ায় সরকারি কর্মকর্তাদেরকেও পুতিনের গোপনীয়তার কৌশলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হয়। টেলিভিশনে প্রচার না হওয়া পর্যন্ত তারা বৈঠকের কোনো তথ্য প্রকাশ করতে পারেন না। কখনো কখনো বৈঠকের খবর এক সপ্তাহ পর প্রচার করা হয়। যেদিন সেটি প্রচার হয়, কর্মকর্তারা সেদিন এমন ভান করেন, যেন বৈঠকটি ওইদিনই হয়েছে।
রুশ প্রেসিডেন্টের দপ্তরের (ক্রেমলিন) সংবাদ কভার করেন নির্বাসিত সাংবাদিক ফারিদা রুস্তামোভা। তাঁর মতে, পুতিনের অবস্থান নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে অসত্য তথ্য দেওয়ার কৌশলটি একেবারে ‘ডালভাতের’ মতো ব্যাপার। এক প্রতিবেদনে ফারিদা লিখেছেন, টেলিভিশনে প্রচারিত পুতিনের বৈঠকগুলোতে অন্য অংশগ্রহণকারীরা কখনও কখনও পুরোনো ঘটনা নিয়ে কথা বলেন। তাদের যে পোশাক ও হেয়ারকাট দেখা যায়, তা প্রকাশ্যে উপস্থিতির সঙ্গে মেলে না।
কোনো এক সময়কার বৈঠকের খবর যখন অন্য সময়ে প্রকাশ হয়, তখন সেটিকে ‘কনসার্ভি’ বলেন রুশ সাংবাদিকরা। এর অর্থ কৌটাজাত বা সংরক্ষিত খাবার। পুতিনের অবস্থান সংক্রান্ত বিভ্রান্তি সৃষ্টির অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করেছে ক্রেমলিন। নতুন করে মন্তব্যের অনুরোধ করলেও সাড়া দেয়নি।
এক সময় মস্কোতে নিউইয়র্ক টাইমসের ব্যুরো প্রধান ছিলেন আন্তন ট্রয়ানোফস্কি। ২০১১ সালে পুতিনের সংবাদ কভার করার সময় তিনি গতিবিধি আড়াল করার ব্যাপারে প্রত্যক্ষ ধারণা পেয়েছিলেন। ওই বছর পুতিনের গ্রামীণ বাসভবন লেক ভালদাইয়ে গিয়েছিলেন ট্রয়ানোফস্কি। তখন স্থানীয়দের কাছে থেকে একটি রহস্যময় রেলপথের বিষয়ে জানতে পারেন। পরে স্যাটেলাইট চিত্রে দেখতে পান, সেখানে হেলিপ্যাডসহ একটি নতুন স্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে।
রাশিয়ান সিক্রেট সার্ভিসের (এফএসও) সাবেক এক কর্মকর্তা ২০২৩ সালে দাবি করেন, ট্র্যাকিং বা নজরদারি এড়াতে পুতিন ট্রেন ব্যবহার করেন। ফাঁস হওয়া নথিপত্রেও দেখা গেছে, প্রেসিডেন্টের দপ্তরের জন্য একটি বিশেষ ট্রেন আছে। সেটি দেখতে যাত্রীবাহী মনে হলেও ভেতরে জিম, স্পা ও যোগাযোগের বিশেষ সরঞ্জাম আছে। সেগুলো পুতিন নিজে ব্যবহার করতেন।
করোনা মহামারীর সময় পুতিনের এই গোপনীয়তা ও সতর্ক থাকার প্রবণতা আরও বেড়ে যায়। তখন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চাওয়া কোনো কর্মকর্তাকে দুই সপ্তাহের কোয়ারেন্টিনে থাকতে হতো। ২০২২ সালে ইউক্রেনে হামলা শুরুর পর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নতুন উচ্চতায় নেওয়া হয়।
পুতিনের ক্ষেত্রে এই গোপনীয়তার কৌশল কেবল নিরাপত্তার স্বার্থেই নয়। বরং তিনি যে সার্বক্ষণিক কাজে সক্রিয় আছেন- সেই ভাবমূর্তিও এর মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়। এর সঙ্গে ট্রাম্পের উড়োজাহাজ বদল কৌশলের তুলনা করে মিখাইল রুবিন বলেন, ‘পুতিন ইতোমধ্যে তাঁর আশেপাশের সবকিছুকে হাস্যকর পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। ট্রাম্প সেই পথে হাঁটতে শুরু করেছেন মাত্র।’