ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কলকাতায় অগ্নিকাণ্ড

নামহীন ‘বিপজ্জনক’ ভবনে যা দেখা গেল

নামহীন ‘বিপজ্জনক’ ভবনে যা দেখা গেল
×

কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার এই ভবনের হোটেলে মঙ্গলবার রাতে আগুন লাগে। ছবি: সমকাল

শুভজিৎ পুততুন্ড, কলকাতা

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ | ২১:৩৩ | আপডেট: ১৯ আগস্ট ২০২৬ | ২১:৪০

বাংলাদেশিরা কলকাতায় পৌঁছে মার্কুইস স্ট্রিটের যে জায়গাটায় নামেন, সেখান থেকে কয়েক কদম দূরেই হোটেল শিখা ইন। মির্জা গালিব স্ট্রিটে পাঁচতলা একটি ভবনের তৃতীয় তলায় এই হোটেল। ভবনে দৃশ্যমান কোনো নাম নেই, ঠিকানা হিসেবে লেখা- ১৫/জি। মঙ্গলবার রাতের অগ্নিকাণ্ডের পর বুধবার এটি চিহ্নিত হয়েছে ‘বিপজ্জনক ভবন’ হিসেবে।

সন্ধ্যা পর্যন্ত আগুন লাগার সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যায়নি। প্রাথমিকভাবে ফায়ার সার্ভিসের ধারণা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ত্রুটি থেকে আগুন লাগে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় ভবনটিতে ‘বিপজ্জনক’ বার্তার নোটিশ ঝুলিয়ে দিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। সেখানেও ভবনের কোনো নাম উল্লেখ করা হয়নি।

বাইরে থেকে ভবনটি দেখতে কলকাতার পুরোনো বাড়িগুলোর মতো। স্যাঁতসেঁতে ও ধূসর বর্ণ ধারণ করা দেয়ালের কোনো কোনো ফাটল থেকে আগাছা জন্মেছে। সামনে দেড় ফুটের মতো চওড়া অংশ পেরিয়ে ওপরে উঠতে হয় সরু ও বাঁকানো লোহার সিঁড়ি দিয়ে। প্রত্যেক তলায় দুই থেকে তিনটি করে হোটেল বা গেস্ট হাউস।

মঙ্গলবার রাতে ‘শিখা ইন’ হোটেলে যখন আগুন লাগে তখন জানালা দিয়ে তৃতীয় তলার একটি কার্নিশে আশ্রয় নিয়েছিলেন ঢাকার সুমাইয়া আখতার। সঙ্গে তাঁর স্বামীও ছিলেন। সুমাইয়ার বর্ণনাতেও ভবনের জরাজীর্ণ দশা ফুটে উঠেছে। তিনি বলেন, ‘যে কার্নিশে দাঁড়িয়ে ছিলাম সেটা পর্যন্ত ভাঙা। বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে আগুনে না মরলেও কার্নিশ ভেঙে হয়তো মরে যেতাম।’

সুমাইয়ার চিৎকার শুনে মই দিয়ে নিচে নামিয়ে আনেন দমকলকর্মীরা। ভবন থেকে তাদের কার্যালয়ের দূরত্ব মাত্র ২০ মিনিট। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকলেও বছরের পর বছর ধরে ভবনটিতে হোটেল ব্যবসা চলছিল।

বাইরে থেকে ভবনটি জরাজীর্ণ মনে হলেও ভেতরের হোটেলগুলোর সাজসজ্জা বেশ আকর্ষণীয়। শিখা ইনের মালিকের নাম বীরেশ্বর মিত্র। তিনি দক্ষিণ কলকাতার বেহালার বাসিন্দা। নিউমার্কেটসহ স্থানীয় থানা-পুলিশ বেহালায় যৌথ অভিযানে গেলেও বীরেশ্বরকে পায়নি। পুলিশ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় চারটি মামলা হওয়ার কথা জানিয়েছে।

হোটেল ভবনের বাইরে দমকলকর্মীরা। বুধবার কলকাতায়। ছবি: এএফপি

অগ্নিকাণ্ডের পর পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মন্ত্রীরা জরাজীর্ণ ভবনে হোটেল গড়ে তোলার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। দমকল প্রতিমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী বলেছেন, ‘হোটেলগুলো কীভাবে ট্রেড লাইসেন্স পেল? এর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হবে। প্রত্যেক অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করা হবে।’

সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যাওয়া পশ্চিমবঙ্গের নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল, শিল্পমন্ত্রী তাপস রায়ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা জানিয়েছেন, বের হওয়ার জরুরি পথ বন্ধ থাকার কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। হোটেলটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধের নির্দেশ দিয়ে কলকাতা পুরসভার প্রশাসক স্মিতা পাণ্ডে জানান, শুধু নিউমার্কেট নয়, কলকাতায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সব হোটেলই ফায়ার অডিটের আওতায় আনা হবে। শহরের ১৬টি বরোতে পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা আগামী এক মাসের মধ্যে প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা দেবে।

কলকাতা শহরে এমন প্রায় ৩ হাজার ৭৮৮টি হোটেল আছে। এগুলোর মধ্যে মাত্র ১৫ থেকে ২০টি এর আগে পরিদর্শন করেছিলেন কর্মকর্তারা। সেই প্রতিবেদন এখনও পুরসভা বা ফায়ার সার্ভিসের কাছে জমা হয়নি।

বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় যাওয়া সিরাজগঞ্জের মোহাম্মদ শামীম হোসেন বলেন, নিউমার্কেট এলাকার আবাসিক হোটেলগুলোর বেশিরভাগের অবস্থাই শোচনীয়। ভেতরের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নিম্নমানের। অধিকাংশ হোটেলে বহু বছরের পুরোনো লিফট ব্যবহার হচ্ছে।

বুধবার বিকেল গড়াতেই নিউমার্কেটের হোটেলে হোটেলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণে যান পুলিশের সদস্যরা। তবে সন্ধ্যা পর্যন্ত সেগুলোর কোনোটি বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়নি। আগামী ২৫ আগস্ট বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার হওয়া ভবনগুলোর অগ্নিনির্বাপণসহ সুরক্ষা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখা হবে।

আরও পড়ুন

×