ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় চাপে ইরানের অর্থনীতি

মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় চাপে ইরানের অর্থনীতি
×

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কোলাজ

রয়টার্স

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ | ১১:৫৪ | আপডেট: ২৯ আগস্ট ২০২৬ | ১২:০৩

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের কারণে ইরানের অর্থনীতিতে ক্ষতির মাত্রা বাড়ছে। দেশটির নেতারাও অর্থনৈতিক সংকটের বিষয়টি স্বীকার করছেন। সর্বোচ্চ নেতা সরকারকে জনগণের দুর্দশা লাঘবে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধের কারণে ইরানের বৈদেশিক বাণিজ্য প্রায় ৩৫ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে।

এর মধ্যেই ইরানের অন্য নেতারা যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক পাল্টা পদক্ষেপের হুমকি দিচ্ছেন এবং দাবি করছেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে চলাচল বাধাগ্রস্ত করার সক্ষমতা ইরানকে কৌশলগত সুবিধা দিচ্ছে।

যুদ্ধের ছয় মাস পেরিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আলোচনা অচলাবস্থায় পড়ার মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা এ পদক্ষেপকে ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

ওয়াশিংটন বিভিন্ন দেশকে ইরানের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিন্ন করার আহ্বান জানিয়েছে। অন্যথায় তাদের ‘সেকেন্ডারি স্যাংশন’ বা পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। তবে ইরানের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার চীন ও ভারতের বিরুদ্ধে সরাসরি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া থেকে বিরত রয়েছে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ। এমন পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ব অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

এরই মধ্যে ইরানের সঙ্গে ব্যবসায়িক লেনদেনের অভিযোগে মিশরের ‘ব্যাংক মিসর’-এর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ। একই সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ব্যাংকটির শাখাগুলোকে ডলারভিত্তিক লেনদেন থেকে বিচ্ছিন্ন করার একটি নিয়ম প্রস্তাব করা হয়েছে।

মিশরের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, তারা ও দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। তবে এ পদক্ষেপ শুধু ‘ব্যাংক মিসর ইউএই’-এর করসপন্ডেন্ট ব্যাংকগুলোর সঙ্গে মার্কিন ডলারের লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলে জানিয়েছে তারা।

মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত পৃথক এক বিজ্ঞপ্তিতে হংকংভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান এবং ইরানের ‘ব্যাংক মেলি’র সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন ব্যক্তির ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা জানানো হয়েছে।

নিষেধাজ্ঞার ধারাবাহিকতার মধ্যে ইরানের অর্থনীতিতে যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব আরও বেড়েছে। দেশটিতে গত মাসে বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতির হার ৬৬ শতাংশে পৌঁছেছিল।

সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি, যিনি ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলায় আহত হওয়ার পর থেকে জনসমক্ষে আসেননি, সরকারকে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ওই হামলায় তাঁর বাবা ও সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি নিহত হন।

খামেনির নামে প্রকাশিত এক লিখিত বিবৃতিতে মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব এবং পণ্য ও সেবার বাজার ও মূল্য ব্যবস্থাপনার মতো অর্থনৈতিক ও জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্যাগুলো মোকাবিলায় গুরুত্ব দিয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বলেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধের কারণে দেশটির আমদানি ও রপ্তানি প্রায় ৩৫ শতাংশ কমেছে। তবে জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত স্বল্পমেয়াদি সমঝোতা স্মারকের আওতায় ইরান প্রায় ৯০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বিক্রি করতে পেরেছিল। ওই সময় ওয়াশিংটন ইরানের তেল বিক্রির অনুমতি দিয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্র যখন অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর কৌশলে এগোচ্ছে, তখন যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে অন্য পক্ষগুলো। কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুলরহমান আল থানি বৃহস্পতিবার তেহরানে ইরানি নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে তিনি হরমুজ প্রণালী দিয়ে অবাধ জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে যুদ্ধের আগের পরিস্থিতিতে ফিরে যাওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরেন।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি শুক্রবার আল থানির সঙ্গে আলোচনাকে ‘গঠনমূলক’ বলে অভিহিত করেছেন।

ইরানের উপসাগরীয় প্রতিবেশী ও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র কাতার এবং পাকিস্তান জুনে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটি চূড়ান্ত করতে মধ্যস্থতা করেছিল। এর ফলে সাময়িকভাবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও পরবর্তীতে হরমুজ প্রণালী নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে তা ভেস্তে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কমান্ডাররা জানিয়েছেন, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) কয়েক মাস আগে হরমুজ প্রণালীতে যেসব সামুদ্রিক মাইন পেতে রেখেছিল, মার্কিন বাহিনী সেগুলো অপসারণ করেছে।

ট্রাম্প বারবার দাবি করে আসছেন, হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত রয়েছে। তবে আইআরজিসির নৌ-শাখা এক বিবৃতিতে এই দাবিকে ‘ডাহা মিথ্যা’ বলে অভিহিত করেছে। তারা বলেছে, ইরানের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজের জন্য এই জলপথ উন্মুক্ত নয়।

শুক্রবার প্রকাশিত প্রাথমিক নৌ-চলাচল সংক্রান্ত তথ্যে দেখা গেছে, বৃহস্পতিবার হরমুজ প্রণালী দিয়ে মাত্র সাতটি পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করেছে। আগের দিন এ সংখ্যা ছিল ১৭টি এবং গত ১০ দিনের গড় ছিল ১৫টি। অর্থাৎ সাম্প্রতিক সময়ে জাহাজ চলাচলের হার ওই গড়ের চেয়েও কম।

আরও পড়ুন

×