সৌদি ট্যাঙ্কারে ইরানের হামলায় দুই নাবিক নিহত
ছবি: গেটি ইমেজেস
বিবিসি
প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:০৮ | আপডেট: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:১৭
হরমুজ প্রণালিতে সৌদি আরবের তেলবাহী ট্যাঙ্কার ‘সিদর’-এ ইরানি হামলায় দুই ফিলিপিনো নাবিক নিহত হয়েছেন। বুধবার সৌদি আরবের জাতীয় শিপিং কোম্পানি বাহরি এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
সৌদি আরবের জাতীয় শিপিং কোম্পানি ‘বাহরি’ তাদের জাহাজ ‘সিডর’ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় এ ঘটনা ঘটে। কোম্পানির বিবৃতি অনুযায়ী, সোমবার স্থানীয় সময় রাত ১১টা ৪০ মিনিটে (গ্রিনিচ মান সময় সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিট) হামলা হয়। এতে দুই ফিলিপিনো নাবিক প্রাণ হারান। নিহতদের পরিবার, স্বজন ও সহকর্মীদের প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়েছে বাহরি।
সামুদ্রিক নিরাপত্তাবিষয়ক সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, ওমানের মুসান্দাম উপদ্বীপের উত্তরে ‘সিডর’ জাহাজটি প্রজেক্টাইল বা ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতের শিকার হয়। একই সময়ে মুসান্দামের পূর্বে দক্ষিণ কোরীয় মালিকানাধীন ‘সেনেগাল প্রসপারিটি’ নামের আরেকটি সুপারট্যাঙ্কারেও আঘাতের খবর পাওয়া যায়।
সৌদি আরবের অভিযোগের বিষয়ে ইরান কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে এর আগে ইরান জানিয়েছিল, দুটি ট্যাঙ্কার হরমুজ প্রণালির একটি অননুমোদিত পথ ব্যবহারের সময় মাইন বা বিস্ফোরকের আঘাতে অগ্নিকাণ্ডের শিকার হয়েছে।
পরবর্তীতে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় সৌদি ট্যাঙ্কার ‘সিডর’-কে লক্ষ্য করে ইরানের হামলার তীব্র নিন্দা জানায়। একই সঙ্গে জর্ডান, বাহরাইন ও কুয়েতের ওপর ইরানের সাম্প্রতিক হামলারও নিন্দা জানানো হয়। সংঘাতের বিস্তার রোধ এবং আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচলের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার ওপর জোর দেয় সৌদি আরব। পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইনের সুরক্ষার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়।
সামুদ্রিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও গোয়েন্দা সংস্থা ‘মারিস্কস’ এবং ‘কেপলার’ -এর প্রতিবেদনের একদিন পর এসব বিবৃতি দেওয়া হয়। ওই প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়, সোমবার গভীর রাতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সৌদি অপরিশোধিত তেলবাহী দুটি ট্যাঙ্কার কয়েক মিনিটের ব্যবধানে অজ্ঞাত কোনো বস্তুর আঘাতের শিকার হয়। প্রতিটি ট্যাঙ্কারে ২০ লাখ ব্যারেল তেল ছিল।
মারিস্কসের তথ্য অনুযায়ী, ওমানের খাসাব থেকে প্রায় ১৬ নটিক্যাল মাইল বা ৩০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে স্থানীয় সময় ১১টা ৫২ মিনিটে ‘সিডর’ জাহাজটি ‘অজ্ঞাত বস্তুর’ আঘাতের শিকার হয়। অন্যদিকে, খাসাবের প্রায় ১৭ নটিক্যাল মাইল পূর্বে ‘সেনেগাল প্রসপারিটি’ জাহাজটি ‘তিনটি অজ্ঞাত বস্তুর’ আঘাতের শিকার হয়।
যুক্তরাজ্যের ‘মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস’ সংস্থাও একই এলাকায় দুটি ঘটনার কথা জানিয়েছে।
বুধবার ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশন গার্ড কোর (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে জানায়, হরমুজ প্রণালিতে মাইন বিস্ফোরণের শিকার হওয়ার আগে দুটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার ‘মার্কিন সামরিক বাহিনীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে একটি অবৈধ পথ’ দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, জাহাজ দুটিতে তখনও আগুন জ্বলছিল।
মার্কিন সামরিক বাহিনী এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে তারা জানিয়েছে, ইরানের ওপর সাম্প্রতিক আঘাতের ঘটনাটি হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ ও মার্কিন সেনাসদস্যদের ওপর আইআরজিসির সাম্প্রতিক হামলার চেষ্টার পরিপ্রেক্ষিতে ঘটেছে।
এদিকে, ঘটনাটি এমন সময় ঘটেছে যখন মার্কিন সেনাবাহিনী ইরানের ওপর ধারাবাহিক বিমান হামলা চালিয়েছে এবং ইরানও পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে প্রতিবেশী আরব দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা করেছে। জুলাই মাসের পর থেকে এটি উভয় পক্ষের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংঘাতের ঘটনা।
বুধবার ইরানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, মার্কিন হামলায় ১৮ জন নিহত ও ১০৮ জন আহত হয়েছেন। দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর সিরিকে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে মার্কিন হামলায় দুই শিশুসহ চারজন নিহত হওয়ার ঘটনায় ইরান যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধাপরাধের’ অভিযোগ এনেছে। মার্কিন সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলো খতিয়ে দেখছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে সাধারণত বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ করা হয়। ফেব্রুয়ারিতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই প্রণালিটি কার্যত বন্ধ রয়েছে। বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা এবং ইরানি বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
জুন মাসে যুদ্ধের সমাপ্তি ও হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি প্রাথমিক চুক্তিতে পৌঁছেছিল। কিন্তু জাহাজ চলাচলের ওপর ইরানের হামলা পুনরায় শুরু হওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ পুনর্বহালের ফলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সেই চুক্তি ভেস্তে যায়।
ইরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ তারা পুরোপুরি ছেড়ে দেবে না। দেশটি এমন সব জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করেছে, যেগুলো ইরানের জলসীমার মধ্য দিয়ে প্রচলিত স্বাভাবিক পথের পরিবর্তে ওমানের জলসীমা হয়ে দক্ষিণ দিকের পথ ব্যবহার করছে।
ইরানি হামলা সত্ত্বেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, হরমুজ প্রণালি ‘উন্মুক্ত’ রয়েছে এবং মার্কিন সামরিক বাহিনী জাহাজগুলোকে দক্ষিণ দিকের পথ দিয়ে চলাচলে সহায়তা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট জানিয়েছেন, সোমবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজের মাধ্যমে ১ কোটি ৭০ লাখ বা ১৭ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে একদিনে এটিই সর্বোচ্চ পরিমাণ।