ঢাকা সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিশ্লেষণ

জার্মানির রাজ্যে ডানপন্থিদের জয়ে ইউরোপে কেন মসনদ কাঁপছে

জার্মানির রাজ্যে ডানপন্থিদের জয়ে ইউরোপে কেন মসনদ কাঁপছে
×

জার্মানির কট্টর ডানপন্থি দল এএফডির নেতারা। ছবি: এএফপি

দ্য নিউইয়র্ক টাইমস

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২০:২০ | আপডেট: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২০:২৬

পূর্ব জার্মানির ছোট একটি রাজ্যের নির্বাচনে রোববার বড় ব্যবধানে জিতেছে কট্টর ডানপন্থি দল এএফডি। এর প্রভাব লন্ডনের ডাউনিং স্ট্রিট থেকে শুরু করে প্যারিসের এলিসি প্রাসাদ পর্যন্ত অনুভূত হয়েছে। ইউরোপে গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের জন্য কোনো আঞ্চলিক নির্বাচনের ফলাফলকে এর আগে এতটা গুরুত্ব দিতে দেখা যায়নি।

ফলাফলের খবরটি এমন এক দেশ থেকে এসেছে, যেখানে নাৎসিবাদের বিপর্যয়ের পর কট্টর ডানপন্থি দলগুলো প্রায় কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল। এই ফলাফল দেখাচ্ছে, প্রায় এক দশক ধরে ধারাবাহিক অগ্রযাত্রার পর কট্টর ডানপন্থিরা আবার ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি চলে এসেছে।

আগামী বছর ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নির্বাচন হওয়ার কথা। তাই এএফডির সাফল্যকে কট্টর ডানপন্থা উত্থানের পূর্বাভাস হিসেবে দেখা হচ্ছে। একইসঙ্গে অন্য দেশের ডানপন্থিরা এএফডির কাছে থেকে নির্বাচনী কৌশলের ধারণা পাবে বলেও আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। 

কারণ, দলটির জনতুষ্টিবাদী ও অভিবাসনবিরোধী বার্তা ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইতালি ও স্পেনের জাতীয়তাবাদী নেতাদের বক্তব্যের সঙ্গে মিলে যায়। এসব দেশের ভোটারদের মধ্যেও জার্মানির ভোটারদের মতোই ক্ষোভ ও অসন্তোষ আছে।

ফরাসিরা আগামী বছর নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট দেবেন। এছাড়া, স্পেনে ও ইতালিতে বছরের শেষ নাগাদ নির্বাচন হওয়ার কথা। তিন দেশেই কট্টর ডানপন্থি প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে। তারা অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে চলা কাঠামোগত সমস্যার জন্য ক্ষমতাসীনদের দায়ী করছেন।

রাজনৈতিক ঝুঁকি বিশ্লেষণের প্রতিষ্ঠান ইউরেশিয়া গ্রুপের ইউরোপবিষয়ক বিশ্লেষক মুজতবা রহমান বলছেন, উন্নত ইউরোপ এক ধরনের জটিল রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সরকারগুলো জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে মানুষের উদ্বেগ মোকাবিলা করতে পারছে না। তারা ভোটারদের প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজও করতে পারছে না।

জার্মানিতে মূল্যবৃদ্ধি ও উচ্চ বেকারত্ব চলছে। এমন অবস্থায় স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যের নির্বাচনে চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎসের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন দলের চেয়ে এএফডি দ্বিগুণের বেশি ভোট পেয়েছে। এই ফলাফল ইউরোপীয়দের মধ্যে একটি স্পষ্ট বিভাজন সামনে এনেছে।

একপক্ষ কট্টর ডানপন্থিদেরকে গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হিসেবে দেখে। দ্বিতীয় পক্ষ নিজেদেরকে গণতন্ত্রের রক্ষাকর্তা হিসেবে বিবেচনা করে। প্রথম পক্ষের আশঙ্কা, উগ্র ডানপন্থিরা ক্ষমতার ভারসাম্য ও জবাবদিহির ব্যবস্থাগুলো ভেঙে দেবে এবং সংখ্যালঘুদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করবে। আর দ্বিতীয় পক্ষের মতে, জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন অভিজাত শ্রেণির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের শক্তি হলো কট্টর ডানপন্থিরা। অভিজাতরা ইতোমধ্যে মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে ফেলেছে।

স্যাক্সনি-আনহাল্ট নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী, এএফডি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে অল্পের জন্য পিছিয়ে আছে। ফলে তারা এককভাবে সরকার গঠন করতে পারবে না। প্রতিদ্বন্দ্বি দলগুলো এএফডির সঙ্গে জোট না করার বিষয়ে অঙ্গীকার করেছে। একইসঙ্গে দলটির বিরুদ্ধে নাৎসি স্লোগান ব্যবহার এবং হলোকাস্টের গুরুত্ব খাটো করে দেখার অভিযোগ এনেছে। জার্মানির অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থাও এএফডিকে সন্দেহভাজন চরমপন্থি গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর কারণ, দলটির বিরুদ্ধে অভিবাসী জার্মানদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে উপস্থাপনের অভিযোগ আছে।

বার্লিনের বর্তমান নেতৃত্ব আগে থেকেই নিজেদের দুর্বল অবস্থানের কারণে ইউরোপে সমালোচিত। এখন নিজ দলের ভেতর থেকে ব্যর্থতার দায় চাপানো হলে চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎস আরও দুর্বল হয়ে যেতে পারেন। তাঁর অবস্থান এতটাই নড়বড়ে হয়ে গেছে যে, রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা প্রকাশ্যেই তাঁকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছেন। এক সময় জার্মান রাজনীতিতে এ ধরনের আলোচনা প্রায় অকল্পনীয় ছিল।

ইউরেশিয়া গ্রুপের বিশ্লেষক মুজতবা রহমান বলেন, জার্মানি দুর্বল হয়ে পড়াটা ইউরোপের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। দেশটির চ্যান্সেলর ক্রমেই নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন। অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো সামলাতেও হিমশিম অবস্থা। এটি ভালো লক্ষণ নয়। এটি ইউরোপের সামনে থাকা বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সক্ষমতা কমিয়ে দেবে।

ফ্রান্সকে নিয়েও মধ্যমপন্থিদের উদ্বেগ কম নয়। আগামী বছর প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ পদ ছাড়বেন। দেশটির প্রধান কট্টর ডানপন্থি দল ন্যাশনাল র‌্যালির প্রার্থী মারিন ল্যঁ পেন প্রথম দফার জনমত জরিপে এগিয়ে আছেন। তিনি গত ১৪ বছর ধরে প্রেসিডেন্ট হওয়ার চেষ্টা করছেন। এখন ক্ষমতার বেশ কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন।

ফ্রান্স ইউরোপীয় প্রকল্পের প্রতিষ্ঠাতা দেশ। তাদের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার আছে। এমন একটি দেশে কট্টর ডানপন্থি দল ক্ষমতায় গেলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন অস্থিতিশীল হতে পারে বলে মনে করছেন মুজতবা রহমান। এতে তথাকথিত ‘কর্ডন স্যানিতেয়ার’ নীতির অবসান ঘটতে পারে। এই নীতির আওতায় জার্মানির মতো ফ্রান্সের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো কট্টর ডানপন্থিদের সঙ্গে জোট গঠনে অস্বীকৃতি জানিয়ে এসেছে।

ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ফ্রান্স ও ইউরোপীয় রাজনীতির অধ্যাপক ফিলিপ মার্লিয়ের বলছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে দেশ দুটিতে ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক ঐক্য বজায় ছিল। সেটি এখন ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে বলে মনে হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা বলেছেন, স্পেনেও কট্টর ডানপন্থি ভক্স পার্টি আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারে জায়গা করে নিতে পারে। দুর্নীতি ও অভিবাসন সংকটের কারণে ইতোমধ্যে পেদ্রো সানচেজের সমাজতান্ত্রিক সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ব্রিটেনেও ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির বিপরীতে কট্টর ডানপন্থি দল রিফর্ম ইউকে অবস্থান শক্ত করেছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তাদের কাছে হারের দায় নিয়ে কিয়ার স্টারমার সম্প্রতি পদত্যাগ করেছেন।

হাঙ্গেরিতে প্রায় ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকার পর কট্টর ডানপন্থি নেতা ভিক্টর অরবান গত এপ্রিলের নির্বাচনে হেরে গেছেন। এরপর ইউরোপের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে উগ্র ডানপন্থা অবসানের আশা জেগেছিল। কিন্তু জার্মানিতে এএফডির জয় আবার উদ্বেগ তৈরি করেছে। 

লন্ডনের কুইন মেরি ইউনিভার্সিটির রাজনীতির অধ্যাপক টিমোথি বেল বলছেন, এএফডির সাফল্য নিয়ে উদ্বেগের মাত্রা নির্ভর করছে তাদের আচরণের ওপর। ক্ষমতায় বসার পর তাদের আচরণ ও সরকার পরিচালনার নীতিগুলো দেখতে হবে। এরপর উদ্বেগের মাত্রা ওঠানামা করবে।

ইতালির নেতারাও আগামী বছর ভোটারদের মুখোমুখি হবেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির দল ‘ব্রাদার্স অব ইতালির’ শেকড় নব্য-ফ্যাসিবাদের সঙ্গে যুক্ত। মেলোনির সরকার সম্প্রতি দেশটির ইতিহাসে একটানা ক্ষমতায় থাকার রেকর্ড গড়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী নির্বাচনেও তিনি ভালো অবস্থানে থাকবেন। কিন্তু ডানপন্থি প্রতিদ্বন্দ্বি রবার্তো ভান্নাচ্চির ক্রমবর্ধমান প্রভাব মেলোনিকে অভিবাসনের মতো বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিতে বাধ্য করেছে।

মুজতবা রহমানের মতে, ইউরোপের বিপর্যস্ত মধ্যমপন্থি রাজনীতিকেরা বর্তমানে আমেরিকার অস্থিরতাকে ভোটারদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। তারা বোঝাতে চাইছেন, মূলধারার বাইরের রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলে ভুল হওয়ার ঝুঁকি আছে।

আরও পড়ুন

×