যাত্রাবাড়ীতে হত্যাকাণ্ড
মাদকের বিরোধে খুন, হত্যায় অংশ নেয় ৭ জন
তিনজন হেলমেট, দুজনের মুখে মাস্ক ও অপর দুজন মুখোশ পরা ছিল
ছবি-সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২০:২৩
তিনটি মোটরসাইকেলে করে সাতজনের একটি দল এসেছিল যাত্রাবাড়ীর ধলপুরের বাদল সরদার রোডের একটি রিকশার গ্যারেজে। গ্যারেজে ঢুকেই তারা টিনের বেড়া ভাঙচুর শুরু করে। এরপর সেখানে থাকা ইমরান হোসেনকে নাম ধরে ডাকতে থাকে। একপর্যায়ে তাঁকে গালিগালাজ করে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে। ঘটনাস্থলেই নিহত হন ইমরান। তাঁর সঙ্গে থাকা সাদ্দামও গুলিবিদ্ধ হন। এ সময় এক রিকশাচালককে কুপিয়ে আহত করা হয়। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে ধারণা, মাদকের ব্যবসার আধিপত্য নিয়ে বিরোধের জেরে পরিকল্পিতভাবে ইমরানকে হত্যা করা হয়েছে।
রোববার রাত ১০টার দিকে বাদল সরদার রোডের শেষ মাথায় নির্জন এলাকায় শরিফের রিকশার গ্যারেজে এ হামলা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলাকারীদের তিনজনের মাথায় হেলমেট, দুজনের মুখে মাস্ক এবং অপর দুজনের মুখে মুখোশ ছিল। তাঁদের একজনের হাতে পিস্তল এবং আরেকজনের হাতে ধারাল অস্ত্র ছিল।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, হামলাকারীরা গ্যারেজে ঢুকেই ইমরানের নাম ধরে ডাকতে থাকে। গ্যারেজের একপাশে টিনের বেড়া দিয়ে তৈরি অফিসঘরে ইমরান ও সাদ্দাম বসেছিলেন। হামলাকারীরা সেখানে গিয়ে ইমরানকে গালিগালাজের একপর্যায়ে গুলি ছুড়তে শুরু করে। এতে ইমরান ঘটনাস্থলেই মারা যান এবং সাদ্দাম গুলিবিদ্ধ হন।
প্রায় ১০ থেকে ১২ মিনিট ধরে হামলা চালানোর পর হামলাকারীরা গ্যারেজে থাকা ইমরানের মোটরসাইকেলসহ নিজেদের তিনটি মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায়। যাওয়ার সময় এক রিকশাচালকের মোবাইল ফোনও ছিনিয়ে নেয় তারা।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এক রিকশাচালক জানান, রাতে তিনি গ্যারেজে বসে ভাত খাচ্ছিলেন। হঠাৎ ভাঙচুরের শব্দ ও চিৎকার শুনে সামনে এসে দেখেন, ইমরান ও সাদ্দামকে গুলি করা হয়েছে। এ সময় আরেক রিকশাচালকের হাতে থাকা অ্যান্ড্রয়েড ফোন দেখে একজন হামলাকারী অপরজনকে বলেন, ‘এই ফোনে ঘটনার ভিডিও করেছে।’ এরপর তাঁর কাছ থেকে ফোনটি কেড়ে নেওয়া হয়।
ফোনের মালিক রিকশাচালক তাপস ফোনটি ফেরত চাইলে এক হামলাকারী তাঁর ডান পায়ের হাঁটুর ওপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপ দেন। পরে একজন হামলাকারী ইমরানের মোটরসাইকেল নিয়ে এবং অন্যরা নিজেদের মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায়।
খবর পেয়ে স্বজন ও স্থানীয় লোকজন ঘটনাস্থলে ছুটে যান। রক্তাক্ত অবস্থায় ইমরান ও সাদ্দামকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ইমরানকে মৃত ঘোষণা করেন। সাদ্দামকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
মাদকের বিরোধে হত্যাকাণ্ড
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে মাদকের ব্যবসা নিয়ে বিরোধের তথ্য পাওয়া গেছে। যাত্রাবাড়ী থানার ওসি মোহাম্মদ রাজু সমকালকে বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, মাদকের ব্যবসার আধিপত্য নিয়ে বিরোধের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন বিষয় মাথায় রেখে তদন্ত চলছে।’
পুলিশ জানিয়েছে, নিহত ইমরানের বিরুদ্ধে মাদকসহ বিভিন্ন অভিযোগে অন্তত তিনটি মামলা রয়েছে। তিনি ডাকাতি মামলায় কারাবন্দি খাঁকি বাবুর ভাই। বাবুর বিরুদ্ধেও মাদকসহ একাধিক মামলা রয়েছে। ইমরানের বাসা বাদল সরদার রোড এলাকায়।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ইমরানের স্ত্রী বাদী হয়ে সোমবার যাত্রাবাড়ী থানায় মামলা করেছেন। মামলায় এজাহারভুক্ত দুজন আসামির নাম রয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও সাত থেকে আটজনকে আসামি করা হয়েছে।
গ্যারেজে ৩০ রিকশা
ঘটনার পর সোমবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সরেজমিনে ওই গ্যারেজে গিয়ে ছয়জন রিকশাচালকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সেখানে প্রায় ৩০টি ব্যাটারিচালিত রিকশা রাখা হয়। চালকদের বেশিরভাগই রাতে গ্যারেজে থাকেন। তাঁদের থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।
ঘটনার সময় গ্যারেজে দুজন রিকশাচালক ছিলেন। তাঁদের একজন বলেন, হামলাকারীরা গ্যারেজে ঢোকার পর কয়েক মিনিটের মধ্যেই গুলি ও চিৎকারের শব্দ শোনা যায়। পুরো ঘটনাটি এত দ্রুত ঘটে যে, তাঁরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই হামলাকারীরা পালিয়ে যায়।
পুলিশ জানিয়েছে, হামলাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে তদন্ত চলছে। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের পেছনে মাদক ব্যবসার বিরোধ ছাড়াও অন্য কোনো কারণ ছিল কিনা, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
- বিষয় :
- হত্যা
- যাত্রাবাড়ী
- গুলি করে হত্যা