যুক্তরাষ্ট্রে আর ‘১৪ দিনের তেল অবশিষ্ট’—দাবিটি কতটা সত্য
গালফ নিউজের বিশ্লেষণ
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ফ্রিপোর্টে স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভে অপরিশোধিত তেলের পাইপলাইন (ছবি-রয়টার্স)
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৩:১৬ | আপডেট: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৫:০৮
যুক্তরাষ্ট্রের হাতে মাত্র ১৪ দিনের তেল অবশিষ্ট রয়েছে—সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন দাবি ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এই হিসাবটি দেশটির কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত (এসপিআর) এবং মোট পেট্রোলিয়াম ব্যবহারের পরিমাণকে একসঙ্গে ধরে করা হয়েছে। ফলে এতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত তেল সরবরাহ পরিস্থিতি সঠিকভাবে উঠে আসে না।
মার্কিন জ্বালানি বিভাগের (ডিওই) তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ (এসপিআর) বিশ্বের সবচেয়ে বড় জরুরি অপরিশোধিত তেলের মজুত। মেক্সিকো উপসাগরীয় উপকূলের চারটি ভূগর্ভস্থ লবণের গুহায় এই তেল সংরক্ষণ করা হয়। এসব স্থাপনার মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ৭১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল।
অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া হিসাব অনুযায়ী, এসপিআরে রয়েছে প্রায় ২৮ কোটি ৬৬ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ৭ লাখ ব্যারেল পেট্রোলিয়াম পণ্য সরবরাহ ও ব্যবহার হয়। এই দুটি সংখ্যা ভাগ করে প্রায় ১৪ দিনের হিসাব পাওয়া যায়। কিন্তু এই হিসাবের সমস্যা হলো, এসপিআরে থাকা অপরিশোধিত তেলকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদিনের মোট পেট্রোলিয়াম ব্যবহারের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। প্রতিদিনের ২ কোটি ৭ লাখ ব্যারেলের হিসাবের মধ্যে গ্যাসোলিন, ডিজেল, জেট ফুয়েলসহ বিভিন্ন পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য রয়েছে। এগুলো সরাসরি এসপিআরের অপরিশোধিত তেলের সঙ্গে তুলনাযোগ্য নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি সরবরাহ কেবল কৌশলগত মজুতের ওপর নির্ভর করে না। দেশটির নিজস্ব অপরিশোধিত তেল উৎপাদন, বাণিজ্যিক মজুত, আমদানি, শোধনাগার এবং পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের মজুত—সব মিলিয়ে একটি বড় সরবরাহ ব্যবস্থা রয়েছে। এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইআইএ) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৩৯ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উৎপাদন করে। দেশটির বাণিজ্যিক মজুতে রয়েছে প্রায় ৪২ কোটি ৪৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল।
একই সময়ে শোধনাগারগুলো প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৭৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করছে। এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য আমদানি ও রপ্তানি করে। অর্থাৎ দেশটির তেল সরবরাহ একটি চলমান ব্যবস্থা, যেখানে উৎপাদন, আমদানি, বাণিজ্যিক মজুত, শোধন ও রপ্তানি—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে কাজ করে।
এসপিআর যুক্তরাষ্ট্রের তেলের প্রধান ভাণ্ডার নয়; এটি জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যবহারের জন্য একটি ব্যাকআপ ব্যবস্থা। যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অবরোধ বা আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে বাজারে অতিরিক্ত তেল সরবরাহ করতে এই মজুত ব্যবহার করা হয়।
১৯৭৩-৭৪ সালের আরব তেল নিষেধাজ্ঞার পর যুক্তরাষ্ট্র এই ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়। ১৯৭৫ সালে কংগ্রেস এসপিআর প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেয়। দেশের তেল শোধনাগার, পাইপলাইন ও পরিবহন অবকাঠামোর কাছাকাছি মেক্সিকো উপসাগরীয় উপকূলে লবণের গুহায় এই মজুত গড়ে তোলা হয়।
২০২০ সালের শেষ নাগাদ এসপিআরে প্রায় ৬৩ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেল তেল জমা ছিল। তবে ২০২৬ সালের ২৮ আগস্ট নাগাদ এই পরিমাণ কমে প্রায় ২৮ কোটি ৬৬ লাখ ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে, যা ১৯৮২ সালের নভেম্বরের পর সর্বনিম্ন। বাইডেন ও ট্রাম্প—দুই প্রশাসনের সময়ই বিভিন্ন জরুরি পরিস্থিতিতে এসপিআর থেকে বিপুল পরিমাণ তেল বাজারে ছাড়া হয়েছে।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালানোর পর বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। এ সময় বাইডেন প্রশাসন এসপিআর থেকে ১৮ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়ার ঘোষণা দেয়। প্রায় ছয় মাস ধরে প্রতিদিন গড়ে ১০ লাখ ব্যারেল তেল বাজারে সরবরাহ করা হয়।
পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, এই সমন্বিত তেল ছাড়ার ফলে গ্যাসোলিনের দাম প্রতি গ্যালনে প্রায় ১৭ থেকে ৪২ সেন্ট পর্যন্ত কমতে সহায়তা করেছিল। তবে এর ফলে কৌশলগত মজুতের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এরপর মজুত পুনরায় পূরণের কাজ শুরু হয়। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ এসপিআরে তেলের পরিমাণ প্রায় ৪১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছিল।
২০২৬ সালে ইরানকে কেন্দ্র করে সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহনে বিঘ্নের আশঙ্কার মধ্যে আবারও কৌশলগত মজুত ব্যবহার করা হচ্ছে। গত মার্চে ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির (আইইএ) ৩২টি সদস্য দেশ জরুরি মজুত থেকে মোট ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার বিষয়ে সম্মত হয়। আইইএর ইতিহাসে এটি ছিল এ ধরনের সবচেয়ে বড় সমন্বিত পদক্ষেপ। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র এসপিআর থেকে ১৭ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।
ইআইএর তথ্য অনুযায়ী, ৩ এপ্রিল ২০২৬ এসপিআরে ৪১ কোটি ৩৩ লাখ ব্যারেল তেল ছিল। ২৮ আগস্ট তা কমে দাঁড়ায় ২৮ কোটি ৬৬ লাখ ব্যারেলে। অর্থাৎ পাঁচ মাসেরও কম সময়ে এসপিআরের মজুত প্রায় ১২ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেল কমেছে। তবে এই কমে যাওয়া মানে যুক্তরাষ্ট্রের মোট তেল সরবরাহ থেকে একই পরিমাণ তেল শেষ হয়ে গেছে—এমন নয়। একই সময়ে দেশটিতে তেল উৎপাদন, আমদানি, রপ্তানি, বাণিজ্যিক মজুত ও শোধনাগারের কার্যক্রম চলমান ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেল সরবরাহের প্রধান উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে দেশীয় উৎপাদন, আমদানি ও বাণিজ্যিক মজুত। দেশটির শোধনাগারগুলো অপরিশোধিত তেলকে গ্যাসোলিন, ডিজেল, জেট ফুয়েলসহ বিভিন্ন পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যে রূপান্তর করে।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৩৯ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উৎপাদিত হচ্ছে। বাণিজ্যিক মজুতে রয়েছে প্রায় ৪২ কোটি ৪৫ লাখ ব্যারেল। শোধনাগারগুলো প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৭৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তেল আমদানি এবং অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য রপ্তানিও করছে যুক্তরাষ্ট্র।
গত চার সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে বাণিজ্যিক অপরিশোধিত তেলের মজুত গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৬ লাখ ২৪ হাজার ব্যারেল বেড়েছে। অন্যদিকে এসপিআর থেকে প্রতিদিন প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল তেল প্রত্যাহার করা হয়েছে। এর অর্থ, এসপিআর থেকে তেল ছাড়ার বিষয়টি সামগ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতে সহায়তা করছে। তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের পুরো পেট্রোলিয়াম ব্যবস্থার বিকল্প নয়।
এসপিআরের মজুত কমে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়। কারণ বড় কোনো সরবরাহ সংকট দেখা দিলে সরকারের হাতে বাজারে দ্রুত তেল ছাড়ার সক্ষমতা আগের তুলনায় কমে গেছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, দুই সপ্তাহ পর যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোল বা অন্যান্য জ্বালানি শেষ হয়ে যাবে। বরং কোনো বড় আন্তর্জাতিক সংকট দেখা দিলে সরকার আগের মতো বড় পরিমাণে জরুরি তেল বাজারে ছাড়তে পারবে না—এটাই মূল ঝুঁকি।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি বা বাব আল-মান্দাব প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা দিলে এর প্রভাব বিশ্ববাজারে পড়তে পারে। তেলের আন্তর্জাতিক দাম বেড়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্রেও অপরিশোধিত তেল, গ্যাসোলিন, ডিজেল ও জেট ফুয়েলের দাম বাড়তে পারে। কারণ তেলের বাজার বৈশ্বিক। যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব উৎপাদন থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ কমে গেলে দেশটির জ্বালানি দামের ওপর তার প্রভাব পড়ে।
জরুরি মজুত থেকে তেল ছাড়ার প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। একপর্যায়ে এসপিআর থেকে অতিরিক্ত তেল সরবরাহ বন্ধ করতে হবে। তখন বাজারকে উৎপাদন ও আমদানি বাড়ানো, রপ্তানি কমানো, বাণিজ্যিক মজুত ব্যবহার, শোধনাগারের কার্যক্রম পরিবর্তন অথবা জ্বালানির চাহিদা কমানোর মাধ্যমে ভারসাম্য তৈরি করতে হবে।
এ ছাড়া বর্তমান এসপিআর কর্মসূচির একটি অংশ তেল বিনিময় ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো এসপিআর থেকে অপরিশোধিত তেল নেয় এবং পরে সমপরিমাণ তেলের সঙ্গে অতিরিক্ত কিছু ব্যারেল ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। ফলে বর্তমানে নেওয়া কিছু তেল ভবিষ্যতে সরকারি মজুতে ফেরত আসতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কত দিনের তেল রয়েছে—এর একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা বের করা সম্ভব নয়। কারণ অপরিশোধিত তেল, গ্যাসোলিন, ডিজেল ও অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্য এক জিনিস নয়। এগুলোর উৎপাদন, মজুত, আমদানি, রপ্তানি ও ব্যবহারের হিসাবও আলাদা।
শুধু এসপিআরের ২৮ কোটি ৬৬ লাখ ব্যারেলকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদিনের মোট ২ কোটি ৭ লাখ ব্যারেল পেট্রোলিয়াম পণ্যের ব্যবহারের সঙ্গে ভাগ করে ১৪ দিনের হিসাব করা তাই বাস্তব পরিস্থিতির সঠিক চিত্র দেয় না।
যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে প্রায় ২৮ কোটি ৬৬ লাখ ব্যারেল এসপিআর মজুতের পাশাপাশি প্রায় ৪২ কোটি ৪৫ লাখ ব্যারেল বাণিজ্যিক অপরিশোধিত তেলের মজুত রয়েছে। প্রতিদিন দেশটি প্রায় ১ কোটি ৩৯ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উৎপাদন করছে এবং বিপুল পরিমাণ তেল আমদানি করছে।
তবে এসপিআরের মজুত ঐতিহাসিকভাবে কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে বড় কোনো সরবরাহ সংকট দেখা দিলে তা মোকাবিলায় সরকারের হাতে জরুরি তেলের মজুত আগের তুলনায় কম থাকবে। তাই যুক্তরাষ্ট্রে ‘১৪ দিনের তেল’ অবশিষ্ট থাকার দাবিটি সঠিক না হলেও, এসপিআরের মজুত কমে যাওয়ার বিষয়টি দেশটির জন্য বাস্তব উদ্বেগের কারণ।
- বিষয় :
- ইরান
- যুক্তরাষ্ট্র
- জ্বালানি তেল
- যুদ্ধ