ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

বিশ্লেষণ

নদী থেকে সাগর নীতি: নেতানিয়াহুর পতনেও যা বদলাবে না

নদী থেকে সাগর নীতি: নেতানিয়াহুর পতনেও যা বদলাবে না
×
×

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও চেঞ্জ ব্লকের নেতা গাদি আইজেনকোট। ছবি: এএফপি

সাদিকুর রহমান

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ | ১৮:৩৭ | আপডেট: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ | ১৯:০৭

ইসরায়েলে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে পরিবর্তন আনতে চায় বিরোধী জোট ‘চেঞ্জ ব্লক’। তবে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত পাওয়া প্রাথমিক ফলাফলে জোটটি সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। তা সত্ত্বেও জোট গঠনের আলোচনা নিয়ে আশাবাদী বিরোধী নেতারা।

চেঞ্জ ব্লকের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রে আছে জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশ্ন। ইসরায়েলের নিরাপত্তা ভাবনায় শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ সুরক্ষা নয়, আঞ্চলিক হুমকিও গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে জর্ডান নদী থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ভূখণ্ডের ওপর সামরিক নিয়ন্ত্রণকে দেশটির নিরাপত্তানীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এই ভৌগোলিক অঞ্চলটি ‘ফ্রম দ্য রিভার টু দ্য সি’ নামেও পরিচিত। যেটির মধ্যে ইসরায়েলের মূল ভূখণ্ডের পাশাপাশি গাজা উপত্যকা, পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম, গোলান মালভূমি ও সিনাই উপদ্বীপ আছে। ইহুদি ধর্মীয় ঐতিহ্যে এই অঞ্চলের কিছু অংশ ‘প্রমিজড ল্যান্ড’ বা প্রতিশ্রুত ভূমির ধারণার সঙ্গে যুক্ত। তানাখে বর্ণিত ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, আব্রাহাম ও তাঁর বংশধরদের এই ভূমি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ঈশ্বর।

নেতানিয়াহু তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ইসরায়েলের আঞ্চলিক স্বার্থ রক্ষায় কঠোর নিরাপত্তানীতি, পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণ এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতায় গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকারের সামরিক অভিযানে গাজায় ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে। একই সময়ে লেবানন সীমান্তে সংঘাত এবং পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণও অব্যাহত আছে।

এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, চেঞ্জ ব্লক ক্ষমতায় গেলেও কি একই ধরনের নীতি চলবে? নেতানিয়াহুর সঙ্গে এই জোটের রাজনৈতিক আদর্শে আসলে কতটা পার্থক্য আছে?

চেঞ্জ ব্লকের নীতি কী?
চার দলের এই নির্বাচনী জোটের প্রধান লক্ষ্য নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানো। তবে দলগুলোর রাজনৈতিক দর্শন এক নয়। এগুলো হলো ইয়াশার, ইয়াচাদ বা টুগেদার, ইসরায়েল বেইতেনু ও ডেমোক্র্যাটস।

জোটটি সরকার গঠন করলে ইসরায়েলের নীতিতে কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে, তা বোঝার জন্য দলগুলোর অবস্থান দেখা জরুরি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অলাভজনক গবেষণা সংস্থা ইসরায়েল পলিসি ফোরাম (আইপিএফ) ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধান ও দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে কাজ করে। সংস্থাটির ওয়েবসাইটে পৃথকভাবে দলগুলোর নীতি তুলে ধরা হয়েছে।

জোটের নেতৃত্বে আছেন ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) সাবেক প্রধান গাদি আইজেনকোট। তাঁর দল ইয়াশার রাজনৈতিকভাবে মধ্যপন্থি। দলটি জাতীয় নিরাপত্তা, রাষ্ট্র পরিচালনা এবং ইসরায়েলের ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচয় বজায় রাখার পক্ষে।

আইজেনকোটের কাছে নিরাপত্তা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। তাঁর নীতির অন্যতম লক্ষ্য গাজায় হামাসের অবশিষ্ট সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করা এবং ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সমন্বয় বজায় রাখতে চান।

ফিলিস্তিন প্রশ্নে আইজেনকোট অদূর ভবিষ্যতে পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে নন। তবে তিনি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ) বিলুপ্ত করা কিংবা পশ্চিম তীরের লাখ লাখ ফিলিস্তিনির ওপর সরাসরি ইসরায়েলি শাসন প্রতিষ্ঠার বিরোধী। তাঁর মতে, জর্ডান নদী থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত এলাকায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা প্রয়োজন।

অর্থাৎ, আইজেনকোটের প্রস্তাবে ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক প্রশাসনের সুযোগ থাকলেও সামরিক নিরাপত্তার নিয়ন্ত্রণ থাকবে ইসরায়েলের হাতে। এই অবস্থানের সমালোচকেরা মনে করেন, ফিলিস্তিনিদের পূর্ণ সার্বভৌমত্ব ছাড়া এমন ব্যবস্থা স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা পূরণ করবে না।

জোটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দল ইয়াচাদ বা টুগেদার। দলটির নেতৃত্বে আছেন নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদ। ২০২১ সালে তাঁদের নেতৃত্বাধীন জোট নেতানিয়াহুকে সাময়িকভাবে ক্ষমতা থেকে সরিয়েছিল। দুজনই বিভিন্ন সময়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন।

আইপিএফের তথ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তার প্রশ্নে টুগেদারও কঠোর অবস্থানের পক্ষে। দলটি গাজার ‘ইয়েলো লাইন’ বরাবর ইসরায়েলের অবস্থান বজায় রাখা, হামাস নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত সামরিক চাপ অব্যাহত রাখা, ইরানের পারমাণবিক হুমকি ঠেকানো এবং সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পক্ষে।

কাতার ও তুরস্কের ভূমিকা নিয়েও বেনেট ও লাপিদের অবস্থানে পার্থক্য আছে। বেনেট গাজায় কাতার ও তুরস্কের প্রভাব সীমিত করতে চান। অন্যদিকে, লাপিদ তুরস্কের সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর পক্ষে। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধী বেনেট পশ্চিম তীরের ‘এরিয়া সি’ অঞ্চলে ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ ও ইহুদি বসতি সম্প্রসারণের পক্ষে।

ইসরায়েল বেইতেনু ধর্মনিরপেক্ষ দল হলেও নিরাপত্তা ও ভূখণ্ডের প্রশ্নে ডানপন্থি। অন্যদিকে, বামপন্থি ডেমোক্র্যাটস দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার জন্য কূটনৈতিক সমঝোতার পক্ষে। দলটি পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলের সঙ্গে একীভূত করার বিরোধী এবং ভবিষ্যতে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনিদের পৃথক রাষ্ট্রে বসবাসের সম্ভাবনা বজায় রাখতে চায়।

নেতানিয়াহু ব্লকের নীতি কী?
এই জোটে আছে লিকুদ পার্টি, ওতজমা ইয়েহুদিত, রিলিজিয়াস জায়োনিস্ট পার্টি, ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম ও শাস। এসব দলের মধ্যে জাতীয়তাবাদী, ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে রক্ষণশীল অবস্থানের মিল আছে।

লিকুদ পার্টির আদর্শের ভিত্তি সংশোধনবাদী জায়নবাদ। দলটি ইসরায়েলকে ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে বজায় রাখা, ইহুদি জনগণের ভূখণ্ডগত অধিকার এবং জাতীয় নিরাপত্তায় কঠোর অবস্থানের পক্ষে। ১৯৭৭ সালে প্রথমবারের মতো পার্লামেন্টে জয়ী হওয়ার পর থেকে লিকুদ ইসরায়েলের রাজনীতিতে অন্যতম প্রধান শক্তি। নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে দলটি ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে রক্ষণশীল দলগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ জোট গড়ে তুলেছে।

নিরাপত্তা প্রশ্নে লিকুদ গাজায় সামরিক অভিযান চালানোর স্বাধীনতা বজায় রাখতে চায়। হামাসের নিরস্ত্রীকরণ ও গাজাকে সামরিকীকরণমুক্ত করার শর্তে ‘ইয়েলো লাইন’ থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের বিষয়েও দলটি অবস্থান নিয়েছে। লিকুদ ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধী এবং পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার পক্ষে। যুদ্ধ-পরবর্তী গাজার নিয়ন্ত্রণ ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়ারও বিরোধিতা করেছে নেতানিয়াহু সরকার।

জোটের কট্টর ডানপন্থি দল ওতজমা ইয়েহুদিত ইহুদি জাতীয়তাবাদ, ভূখণ্ডগত নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় কঠোর অবস্থানের পক্ষে। দলটির নেতা ইতামার বেন-গভির পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ বিলুপ্ত করার পক্ষে।

রিলিজিয়াস জায়োনিস্ট পার্টিও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা ও ইহুদি বসতি সম্প্রসারণ সমর্থন করে। দলটির নেতা বেজালেল স্মোট্রিচ ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধী। অন্যদিকে, ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম ও শাস মূলত ধর্মীয় ও সামাজিক রক্ষণশীল অবস্থানের প্রতিনিধিত্ব করে এবং নেতানিয়াহুর সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সরকার বদলালে নীতিও বদলাবে?
সরকার পরিবর্তন হলেই ইসরায়েলের ফিলিস্তিননীতি বদলে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। নিরাপত্তা ও সামরিক নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে আইজেনকোটের অবস্থানের সঙ্গে নেতানিয়াহুর নীতির উল্লেখযোগ্য মিল আছে। তবে পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের ভবিষ্যৎ এবং কূটনৈতিক সমঝোতার ক্ষেত্রে দুই পক্ষের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হতে পারে।

প্রাথমিক নির্বাচনী ফলাফল অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর জোট ৫৩টি, আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন জোট ৪৮ এবং আরব দলগুলো সম্মিলিতভাবে ১৯টি আসন পেতে পারে। ১২০ আসনের পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১ আসন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পর্যন্ত কোনো জোটই এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি।

সরকার গঠনের হিসাব-নিকাশে আরব দলগুলোর সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে চেঞ্জ ব্লকের অধিকাংশ দলই আরব দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে। ডেমোক্র্যাটস এ ক্ষেত্রে সমঝোতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

জয়েন্ট লিস্টের নেতা ইউসুফ জাবারিনের বক্তব্য অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর সরকার পরিবর্তন করতে চাইলে বিরোধীদের আরব দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। তাঁর মতে, ইসরায়েলের সামনে দুটি পথ- বর্ণবাদ, বঞ্চনা ও আধিপত্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, অথবা ইহুদি ও আরবদের মধ্যে অংশীদারত্ব গড়ে তোলা।

শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহুর পরিবর্তে ইসরায়েলে নতুন সরকার গঠন হলে, নীতি বদলের বিষয়টি শুধু প্রধানমন্ত্রীর ওপর নির্ভর করবে না। বরং সরকারের জোট সঙ্গী ও তাদের মধ্যকার নীতিগত সমঝোতাগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

আরও পড়ুন

×