ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

শ্রমিক অধিকার নিশ্চিত না হলে বিদেশে কর্মী পাঠানো বন্ধের আহ্বান সাইফুল হকের

শ্রমিক অধিকার নিশ্চিত না হলে বিদেশে কর্মী পাঠানো বন্ধের আহ্বান সাইফুল হকের
×
×

ছবি-সংগৃহীত

সমকাল প্রতিবেদক 

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ | ১৯:৩২

সৌদি আরবে বাংলাদেশিসহ প্রবাসী শ্রমিকদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন, মৃত্যুদণ্ড ও শিরশ্ছেদ এবং নারী শ্রমিকদের ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন বন্ধে বাংলাদেশ সরকারকে কঠোর কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। শ্রমিকদের ন্যূনতম মানবিক ও শ্রম অধিকার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ দেশগুলোতে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রয়োজনে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিপ্লবী শ্রমিক সংহতি আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন। সৌদি আরবে সম্প্রতি দুই বাংলাদেশির শিরশ্ছেদের প্রতিবাদ এবং প্রবাসী শ্রমিকদের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।

সমাবেশে সাইফুল হক বলেন, সৌদি আরবের বিভিন্ন কারাগারে এখনও সাত হাজারের বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক বন্দি রয়েছেন। তাঁদের আইনি সহায়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অথচ শ্রমিকদের বিদেশে পাঠাতে পারলেই সরকার ও সংশ্লিষ্টরা নিজেদের দায়িত্ব শেষ বলে মনে করছেন। প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ, আইনি সুরক্ষা ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দূতাবাসগুলোর কার্যকর ভূমিকা নেই।

তিনি বলেন, যেসব শ্রমিকের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখছে, তাঁদের অমানবিক ও বিভীষিকাময় জীবন কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। প্রবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

প্রবাসী নারী শ্রমিকদের ওপর যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের ঘটনা তুলে ধরে সাইফুল হক বলেন, বিদেশে নারী শ্রমিকদের জীবন ও সম্ভ্রম সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে যাওয়া অনেক নারী নিয়োগকর্তার পরিবারের সদস্যদের দ্বারাও নির্যাতনের শিকার হন। কেউ কেউ অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় দেশে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন। এসব নারীর জীবন, ভবিষ্যৎ ও অনাগত সন্তানের দায়িত্ব কে নেবে, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে শ্রমিকদের ন্যূনতম অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে কর্মী পাঠানো সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার বিষয়টি বিবেচনার আহ্বান জানান তিনি। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা করে শ্রমিকদের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও শ্রম অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানান।

বিদেশে কর্মী পাঠানোর নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সিন্ডিকেটের সমালোচনা করে সাইফুল হক বলেন, মালয়েশিয়ায় যেতে শ্রমিকদের কাছ থেকে ছয় থেকে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকার কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না। নির্বাচিত সরকারের আমলে বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে কোনো সিন্ডিকেট বা বাণিজ্য দেখতে চান না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বিদেশে কর্মী পাঠানোর প্রকৃত ব্যয় নির্ধারণ, অতিরিক্ত অর্থ আদায় বন্ধ এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে নতুন শ্রমবাজারে প্রবেশের উপযোগী প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

সরকারের উদ্দেশে সাইফুল হক বলেন, নির্বাচিত সরকারের জবাবদিহি দেশের জনগণ ও ভোটারদের কাছে, কোনো পরাশক্তি বা রাজতন্ত্রের কাছে নয়। প্রবাসী শ্রমিকদের জীবন ও নিরাপত্তার প্রশ্নে সরকারকে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নীরবতাও গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

দেশের অভ্যন্তরে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার সংকট তুলে ধরে তিনি গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানান। শ্রমিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে ৩০ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি রয়েছে উল্লেখ করে জীবনধারণের উপযোগী মজুরি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

এ ছাড়া হকার, রিকশাচালক, দিনমজুর ও নিম্ন আয়ের মানুষকে উচ্ছেদের আগে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার দাবি জানান সাইফুল হক। বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা না করে পুলিশ দিয়ে শ্রমজীবী মানুষের ওপর উচ্ছেদ ও ভাঙচুর চালানো যাবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। বেকারত্ব বাড়তে থাকলে অপরাধপ্রবণতাও বাড়বে উল্লেখ করে দ্রুত বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির আহ্বান জানান।

সমাবেশে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য বহ্নিশিখা জামালী বলেন, প্রবাসী নারী শ্রমিকদের জীবন ও সম্ভ্রম সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তাহীন। অনেক নারী শ্রমিককে বিদেশে যৌন দাসত্বের মতো অসহনীয় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তাঁদের ন্যূনতম অধিকারেরও নিশ্চয়তা নেই। প্রতিদিন দেশে ১৬ জন শ্রমিকের মরদেহ আসে উল্লেখ করে তিনি এ পরিস্থিতি বন্ধে দ্রুত সরকারি উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।

সংগঠনের সভাপতি মীর মোফাজ্জল হোসেন মোশতাকের সভাপতিত্বে এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. ফিরোজ আলীর সঞ্চালনায় সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন বিপ্লবী গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভাপতি মাহমুদ হোসেন, বিপ্লবী শ্রমিক সংহতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম, বিপ্লবী যুব সংহতির সদস্য সচিব মীর রেজাউল আলম, শ্রমজীবী নারী মৈত্রীর সহসভাপতি রাশিদা আক্তার ও নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আনিসুর রহমান মাস্টার।

সমাবেশ শেষে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে সেগুনবাগিচায় সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়ে শেষ হয়।

আরও পড়ুন

×