অভিবাসন নীতিতে আরও কঠোর হবেন ট্রাম্প
রাসেল পারভেজ
প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ০২ নভেম্বর ২০২০ | ১৫:৪৫
চার বছর আগে একগুচ্ছ প্রতিশ্রুতি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে বিস্ময়কর জয় পান ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্য উল্লেখযোগ্য ৯৬টি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি, যার মূলে ছিল জাতীয়তাবাদ। এটি কায়েম করতে ট্রাম্প যেসব উদ্যোগ নিয়েছেন, তাতে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন অভিবাসীরা। পুনর্নির্বাচিত হলে অভিবাসন নীতি আরও কঠোর করার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। সেই সঙ্গে প্রথম মেয়াদের পররাষ্ট্রনীতিও বহাল রাখার ঘোষণা দিয়েছেন।
২০১৬ সালে ধনকুবের থেকে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের স্টাইলে যুক্তরাষ্ট্রকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, যেখানে প্রতিশ্রুতি পূরণের বিষয়টি উপেক্ষিত রয়ে গেছে। রিপাবলিকান পার্টির এই প্রেসিডেন্ট এবার দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য লড়াই করছেন। নতুন করে ইশতেহার দেননি তিনি। আগের চার বছরের ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্রকে এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। তবে সম্প্রতি নির্বাচনী প্রচারের সময় ছয়টি নতুন ওয়াদা করেছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য লাইবেল ল (বিদ্বেষ আইন), প্রেসিডেন্ট হিসেবে ছুটি না নেওয়া ও আইএস জঙ্গিদের এলাকায় ইন্টারনেট বন্ধ করা।
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডাভিত্তিক অলাভজন সংবাদমাধ্যম পলিটিফ্যাক্ট ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের ইশতেহারের কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে, তা বিশদভাবে বিশ্নেষণ করে দেখিয়েছে। গতকাল তাদের এক বিশ্নেষণে দেখা যায়, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথম মেয়াদের ৯৬টি প্রতিশ্রুতির মধ্যে বাস্তবায়ন করতে পেরেছেন মাত্র ২৫টি। বাস্তবায়ন করতে পারেননি ৫০টি, যা ৪৯ শতাংশ।
ট্রাম্পের বাস্তবায়ন করা উল্লেখযোগ্য কয়েকটি প্রতিশ্রুতি হলো- অভিবাসন কঠোর করা, প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনের জন্য বেতন না নেওয়া, সন্ত্রাসপ্রবণ অঞ্চল থেকে অভিবাসন বন্ধ করা, প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেওয়া, গুয়ানতানামো বে কারাগার খোলা রাখা, নাফটা চুক্তি নিয়ে নতুন সমঝোতার চেস্টা করা, পূর্বসূরি বারাক ওবামার কিউবা নীতি বাতিল করা।
ট্রাম্পের যেসব বিষয় বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিদেশ থেকে ভাড়া না করে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য থেকেই যোগ্য কর্মী নিয়োগ, মেক্সিকো সীমান্তে প্রাচীর নির্মাণ, ইরানের সঙ্গে নতুন সমঝোতার চেষ্টা করা, পুলিশ সদস্যদের হত্যা করলে মৃত্যুদণ্ডের বিধান, নাফটা চুক্তি নিয়ে নতুন সমঝোতার চেষ্টা, ভিসা ফি বৃদ্ধি, দুর্ধর্ষ আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে ওয়াটারবোর্ডিং পদ্ধতি ফিরিয়ে আনা এবং আফগানিস্তান ও ইরাক থেকে সব সেনা ফিরিয়ে নেওয়া, চীনের মুদ্রাকে অবমূল্যায়নকারী মুদ্রা হিসেবে চিহ্নিত করা।
ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ প্রতিশ্রুতিগুলোর বাইরে বাকি বিশ্বের জন্য যেসব নীতি তিনি গ্রহণ করেছেন, তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অভিবাসীরা। অভিবাসন নীতির কড়াকড়ির কারণে বহু মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী তাদের আত্মীয়স্বজনকে দেখতে পর্যন্ত যেতে পারেননি।
চলতি বছরের ২৬ আগস্ট ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির ওপর গবেষণাধর্মী একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত সাময়িকী ফোর্বস। ওই সময় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির জাতীয় সম্মেলনের তোড়জোড় চলছিল। ন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর আমেরিকান পলিসির গবেষণা উদ্ধৃত করে ফোর্বসের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্ষমতায় বসার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতির ফলে বৈধ অভিবাসনও অর্ধেকে নেমে এসেছে। ২০১৭ সালের ২০ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের অভিষেকের পর থেকে চলতি বছরের আগস্ট মাস পর্যন্ত ভিসা পাওয়ার সব ক্যাটাগরিতেই যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ অভিবাসন কমেছে ৪৯ শতাংশ। ট্রাম্পের এই নীতির ফলে মানবিক বিপর্যয় নেমে আসে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী শরণার্থী, দক্ষ বিদেশি কর্মী এবং বৈধ অভিবাসীদের পরিবারে। চাইলে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে পারেননি বিদেশিরা।
আরেকটি জায়গায়ও বড় ধাক্কা দিয়েছেন ট্রাম্প। আধা প্রশিক্ষিত বিদেশি কর্মী নিয়োগ এবং ডাইভারসিটি ভিসায় (ডিভি) সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন বন্ধ করায় দেশটির শ্রমবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর আমেরিকান পলিসিরি আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি নিম্ন আয়ের শ্রমিকের সংখ্যা ৫৯ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
ফোর্বসের ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন বিদেশিদের নিয়োগে যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় কোম্পানি চুক্তি করলেও অনেক ক্ষেত্রে তাদের ভিসা দেওয়া হয়নি। উচ্চ শিক্ষিত ও দক্ষ বিদেশির জন্য যুক্তরাষ্ট্র এইস-১বি ভিসা দেয়। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে এই ক্যাটাগরির ভিসা প্রত্যাখ্যান হয়েছে ৩০ শতাংশ। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে এশীয়রাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সম্প্রতি নয়াদিল্লিভিত্তিক গণমাধ্যম এনডিটিভির এক খবরে ভারতীয় এইচ-১বি ভিসা প্রত্যাখ্যান নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যাতে দেখা যায় সব যোগ্যতা ও চুক্তিপত্র থাকার পরও প্রযুক্তি খাতে দক্ষ ভারতীয়দের ভিসা দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। এই চিত্র বাংলাদেশি উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে। একই সঙ্গে কোম্পানি থেকে কোম্পানিতে স্থানান্তরের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের এল-১ ভিসা প্রত্যাখ্যানও বেড়েছে বহু গুণ। বিশ্বের কয়েকটি অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থায় কর্মরত বিদেশি কর্মীদের প্রয়োজনবোধে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েই কাজে সুযোগ দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে দেওয়া হয় এল-১ ভিসা। তবে ট্রাম্পের আমলে এই ক্যাটাগরির বহু ভিসা প্রত্যাখ্যান করেছে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস ও কনস্যুলারগুলো। আবার 'বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন' ব্যক্তিদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র কিউ-১ ভিসা দিলেও ট্রাম্পের আমলে তা কমেছে।
ভিসা কড়াকড়িতে অভিবাসন ও শ্রমবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ট্রাম্প তার দেশে ভোটব্যাংক ঠিক রাখতে পেরেছেন। ট্রাম্পের জাতীয়তাবাদী দর্শনের উজ্জীবিত যুক্তরাষ্ট্রের কোটি কোটি মানুষ এই কারণে এবারও তাকে ভোট দেবেন বলে নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ চীন ও রাশিয়াকে মোকাবিলা করা। করোনা মহামারির কারণে সেই চ্যালেঞ্জ আরও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এশিয়ার রাজনীতিতে ক্রমেই প্রভাব বিস্তার করতে থাকা চীনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে যুক্তরাষ্ট্র বেছে নিয়েছে ভারতকে। আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্র বলয়ে আছে এশিয়ার দুই অর্থনৈতিক শক্তি জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। তবে করোনা পরবর্তী বিশ্বে ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যে কৌশলগত শক্তিশালী অবস্থানের জন্য যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে ভারতকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে সম্প্রতি দেশটির সঙ্গে বিশাল প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে। বাংলাদেশকেও এই রাজনীতিতে গুরুত্ব দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
এ ছাড়া ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়াও ওই অঞ্চলের ভূরাজনীতির মাত্রচিত্র পাল্টে দিচ্ছে। ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যকার সমস্যার সমাধান না করেই আরব দেশগুলোর সঙ্গে তেলআবিবের শান্তিচুক্তি করার জন্য দূতিয়ালি করছে ট্রাম্প প্রশাসন। অবশ্য এর আগেই জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণা করে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস স্থানান্তরের মধ্য দিয়ে ট্রাম্প তার একটি প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছেন। তবে তার এই একতরফা পদক্ষেপের বিরুদ্ধে বলতে গেলে পুরো বিশ্বই দ্বিতম পোষণ করে এর প্রতিবাদ জানিয়েছে। এসব কারণে ইউরোপের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছে ট্রাম্পের। তার বৈশ্বিক বিভিন্ন পদক্ষেপের বিপক্ষে কথা বলে জার্মানি। তা ছাড়া ইরানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধ মেটাতে পারেননি ট্রাম্প। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উনের সঙ্গে দুইবার বৈঠক করেও দেশটির সঙ্গে কোনো চুক্তিতে আসতে পারেননি ট্রাম্প।
আরেকটি বিষয় বলতে হয়। ক্ষমতায় আসার পর আফগানিস্তান ও ইরাক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সব সেনা সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিলেও তা বাস্তবায়ন পর্যায়ে রেখেছেন ট্রাম্প। গত বছর জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি গুটিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি। তার এসব উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রের পরীক্ষিত বন্ধু দেশগুলো পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যায়। ভূরাজনীতিতে টিকে থাকার প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা না পেলে বন্ধু দেশগুলোও যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেবে, সেটাই স্বাভাবিক। পুনর্নির্বাচিত হলে ট্রাম্পকে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। আর যদি তিনি পরাজিত হন, তাহলে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেনের হাত ধরে নতুন পররাষ্ট্রনীতিতে এগোবে যুক্তরাষ্ট্র। এখন দেখার বিষয়, কে হচ্ছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট।
