শিল্পকলা
সূক্ষ্ম জীবনের ছায়াপথ
শিল্পকর্ম: কনক চাঁপা চাকমা
হামিম কামাল
প্রকাশ: ০১ মার্চ ২০২৪ | ০০:২১ | আপডেট: ০৭ মার্চ ২০২৪ | ১৫:৫৭
এজ গ্যালারিতে চলছে প্রদর্শনী ‘ইনফ্রাথিন’। এর উপশিরোনাম ‘মানব অস্তিত্বের ওপর বিবিধ দৃষ্টি।’
শিল্পের সঙ্গে আজকাল সাধারণ মানুষের সম্পর্ক বিশ শতকের মতোও এমনকি নেই। উনিশ শতক তো দূরস্থান। তাই বলে শিল্পীরা দমে যাননি। মানসিকভাবে পিছিয়ে পড়ার যথেষ্ট কারণ থাকা সত্ত্বেও, প্রতিনিয়ত বীণাপাণিকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে যাচ্ছেন। কারণ, এটা অবধারিত– শিল্পের দিন ফিরবে।
কভিড-পরবর্তী মানসিক খরাও অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছেন জ্যেষ্ঠ শিল্পীরা। সঙ্গে তরুণরাও হতাশাকে শক্তিকে রূপান্তরিত করেছেন। প্রমাণ, ইনফ্রাথিন। ইনফ্রাথিন এটা একটা বিশেষ অর্থবোধক শব্দ, চমকে দেয়; সে আলাপে ক্রমে আসছি।
যাদের অংশগ্রহণে এ প্রদর্শনী : ইনফ্রাথিনে যোগ দেওয়া শিল্পীদের নাম করে নেওয়া যাক। তাতে কতটা বিভা এই প্রদর্শনী ধরে তার আঁচ মিলবে।
শিল্পী আব্দুস শাকুর শাহ, মোহাম্মদ ইউনুস, তাজউদ্দিন আহমেদ, রোকেয়া সুলতানা, গোলাম ফারুক বেবুল, শম্ভু আচার্য্য, কনক চাঁপা চাকমা, মোহাম্মদ ইকবাল, আনিসুজ্জামান আনিস, অনুকূল চন্দ্র মজুমদার, মাকসুদা ইকবাল নিপা, আজমীর হোসেন, এমডি টোকন ও তেজস হালদার জস।
শিল্পী মোস্তফা জামান রয়েছেন গোটা প্রদর্শনীর তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে।
‘ইনফ্রাথিন’ শব্দ নিয়ে আলাপ : ইনফ্রাথিন শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন ফরাসি চিত্রশিল্পী মার্সেল দুশাম্প। আমরা শিল্পকর্মগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখতে পাই, আমাদের চেনা বস্তু, চরিত্ররাই শিল্প হয়ে উঠেছে। এখন প্রশ্ন, বাস্তব থেকে তাদের পার্থক্যটা কতটুকু? কতটুকু পার্থক্য রচিত হলে বাস্তব বিবর্তিত হয়ে শিল্পে পরিণত হয়? পিকাসো কী করলেন? বাইসিকলের চেনা সিটটায় সাইকেলেরই হাতল জুড়ে দিলেন; তবে উল্টো করে। হয়ে গেল ষাঁড়ের মাথা। দেখুন, বস্তুগুলো সব চেনা, সজ্জাটাও চেনা। তাহলে কী পার্থক্য ঘটে গেল যে শিল্প হয়ে উঠল তা, যা শিল্প ছিল না?
ফরাসি চিত্রশিল্পী ভাবটাকে ভাষায় ধরে দিয়ে বলেছেন, পার্থক্যটা খুব সামান্য। তবে গোল বেধেছে ‘খুব’ তা আল্ট্রা না হয়ে ‘ইনফ্রা’ হওয়ায়। এখানেই হয়তো মজার কোনো আলাপ অপেক্ষা করে আছে। লাল যখন কাজ করে সাধারণ তলে, তখন অবলাল (ইনফ্রারেড) সাধারণ তল ভেদ করে চলে যায়। অবনীলের (ইনফ্রাব্লু) স্পর্ধা তো আরও বেশি। সুতরাং যে ‘থিন’ কিনা ‘ইনফ্রাথিন’, তার নিশ্চয়ই ক্ষমতা কেবল বাইরের রং বদলে দেওয়ার নয়। বরং রয়েছে ভেতরটাসহ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা।
শিল্পীদের বিশেষায়িত ক্ষমতা : আব্দুস শাকুর শাহ, শম্ভু আচার্য্য তাদের ছবিতে গ্রাম ও আদি বাংলার রূপটা অক্ষরসহ উঠে আসে। এ অক্ষর প্রকৃতি-অক্ষর ও মনের অক্ষর। শাকুর শাহের ছবিগুলো তো বহন করে পূর্ববঙ্গ গীতিকা বা চর্যাপদের পুঁথির পেলব সব গল্পের মেজাজ! আর শম্ভু আচার্য্য তাঁর পূর্বপুরুষদের অনুক্রম মেনে পটচিত্রের কাজে যে স্বারস্বত দক্ষতা দেখাচ্ছেন, তা বিশ্বমানের। ছবিগুলোর সামনে থেকে সরা যায় না।
জামাল আহমেদের বাস্তবের শিল্পী। তবে যা আঁকেন, তার ওপর কুয়াশার ‘ইনফ্রাথিন’ পর্দা এসে তাকে পরাবস্তব করে তোলে। একটা ছবিতে একদল নদীজীবী নারী ছন্দে ছন্দে চলেছেন। হঠাৎ এক নারীর চোখে চোখ চলে যায়। সেই নারী দর্শকের দিকে তাকিয়ে আছেন, কী বিস্ময়! ওখানেই যেন হঠাৎ ছবিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা হলো।
মোহাম্মদ ইউনুস বলছেন, চোখ খুলে দেখেছো ঢের। এবার চোখ বোজো। চোখ বুজে চলে যাই যে প্রাকৃত শিল্পকর্মগুলোর পাশ দিয়ে, সেগুলোই কি মোহাম্মদ ইউনুসের আদরের? পুরোনো দেয়ালের শ্যাওলা, লোহার গায়ে মরচে, পাথরে খনিজের দাগ, জলের চিহ্ন। এদের ‘সামান্য’ থেকে তুলে এনে মোহাম্মদ ইউনুস ‘অসামান্যে’ অধিষ্ঠান ঘটান। ‘ইনফ্রাথিন’-এর মাহাত্ম্য এখানেও ধরা পড়ে।
রোকেয়া সুলতানা ও কনক চাঁপা চাকমা দু’জন আলাদা আলাদা পথে বাস্তবকে পরাবাস্তব রূপ দান করেন। ওই জায়গায় তাদের ঐক্য। রোকেয়া সুলতানা মানবিক সম্পর্ক ও প্রকৃতির রহস্যগুলোকে কেমন স্পষ্ট করে দেন। তাঁর নজরকাড়া রং চিন্তাকে অবধি রাঙায়। কনকচাঁপা চাকমার ছবিতে ধরা থাকে জাতিতাত্ত্বিক ইতিহাস, পাহাড়বাসী প্রেয়সীর ঋতুযাপন, প্রেমিকের দর্শন-অভিযাত্রা। সেই যে সূর্যসারথি বৌদ্ধভিক্ষুদের ছবি, তার সামনে দাঁড়িয়ে কেমন বিহ্বল বোধ হয়েছে আমার।
আজমীর হোসেনের কাজ বিশেষভাবে চোখে পড়ার একটা কারণ, ছবিগুলোকে অনেক বেশি সাম্প্রতিক মনে হয়। বাকি ছবি দেখে এসে তাঁর ছবির সামনে দাঁড়ালে মনে হয়, যুগ বদলেছে। লো পিকচার-ডটের ডিজিটাল ছবি, বিশ্লিষ্ট নানান আভার রং আমার এতটাক্ষণের ভাববিস্তারকে হাত তুলে থামিয়ে দেয়। এমডি টোকনের ছবিগুলো সামনে দাঁড়ালে হঠাৎ মনে হয় সেই ধ্রুপদি যুগের ইউরোপ যেন হেসে কুশল জিজ্ঞেস করল, অথচ খাঁটি দেশীয় ছবি। তেজস হালদার জস কি নিরেটকে তরলে রূপ দেন?
তাঁর ভাস্কর্য একদিন বিশ্বে আদরণীয় হবে এমন আশা জাগে। অনুকূল চন্দ্রের ছবিগুলোয় প্রথম দেখায় অনেক কিছুই চোখ এড়িয়ে যায়। তিনি মূলত আবহ আঁকেন মনে হলো, অবয়বগুলো ছদ্মবেশ। অর্থাৎ ক্রমে ছবির চন্দ্রগুলো ধরা পড়ে।
যাদের কথা বললাম তারাসহ জ্যেষ্ঠ তাজউদ্দিন আহমেদ, গোলাম ফারুক বেবুল, মোহাম্মদ ইকবাল, আনিসুজ্জামান আনিস, মাকসুদা ইকবাল নিপা প্রত্যেককে নিয়ে পাতার পর পাতা লিখলে তবেই সুবিচার হয়। প্রদর্শনীর তত্ত্বাবধায়ক মোস্তফা জামান নিজে বড় শিল্পী। তাঁর তত্ত্বাবধায়ন ইনফ্রাথিনে ধ্রুপদি মাত্রা যোগ করেছে।
কতদিন চলছে : এ প্রদর্শনীতে শিল্পী, শিল্পপ্রেমী সবার না গেলেই নয়। অরিজিনাল মাস্টারপিসগুলোর সামনে দাঁড়ানো তো স্বর্গীয় অভিজ্ঞতা। কেবল মূল্যবান ছবিই নয়। এজ গ্যালারি নিজেও জ্বাজ্বল্যমতি শিল্প। ‘ইনফ্রাথিন’ শুরু হয়েছে ২৪ এপ্রিল, শেষ হবে ৬ এপ্রিল। ছবিগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে থাকার মতো পর্যাপ্ত সময় নিয়ে যেতে হবে।
- বিষয় :
- শিল্প প্রদর্শনী
