ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

রোজমেরির লাল ভেলভেটের চেয়ার

রোজমেরির লাল ভেলভেটের চেয়ার
×

শিল্পকর্ম :: সালভাদর দালি

সালেহা চৌধুরী

প্রকাশ: ০৪ এপ্রিল ২০২৪ | ২৩:০৭

সেই কবে একটি ঝকঝকে চেয়ার কিনেছিলেন রোজমেরি। তাঁর আসল নাম রোজমেরি নেপিয়ার। স্বামী ছিলেন স্কটিশ। মিস্টার নেপিয়ার নিজের বাড়ি থেকে চলে যান। কারণ কেউ তেমন জানে না। ঝগড়াও নয় বা তেমন কিছুই নয়। এখানে কেউ কারও ব্যাপারে তেমন নাক গলায় না। তিনিও কারও হাত ধরে শুনিয়ে দেন না একা থাকার গল্প। রোজমেরির গল্প তাঁর একার। তবে সকলেই তাঁকে ডাকে রোজি বলে। এখন তাঁর বয়স উনআশি। বাড়িতে একা থাকেন। মেশেন না কারও সঙ্গে। তাঁর তিনটে মেয়ে কেউ কাছে থাকে না। একটি ছেলে ছিল সেও কাছে নেই। ব্রিটেনে এমন ঘটনা নতুন নয়। বুড়ো বয়সে একা থাকা। তিনি রান্না করেন। টুকটাক বাজার করেন। আর টেলিভিশনে এটা-সেটা দেখেন। একটু বাতের মতো আছে। হাঁটতে তাঁর কষ্ট হয়। ডাক্তার তাঁকে বড়ি দেয়। বাতের মালিশ। আর ঘুমানোর বড়ি। রাস্তার শেষ মাথায় তাঁর বাড়ি। না কেউ এসে তাঁকে তেমন বিরক্ত করে না। তিনিও কাউকে একা থাকার গল্প শোনান না। হাত ধরে বলেন না জীবনের গল্প।
আজকাল বুকেও একটু ব্যথা হয়। অনেক রাতে ঘুম ভেঙে অবাক হয়ে ভাবেন– আমি সত্যিই বড় একা। হয়তো গভীর রাত তাঁকে এমন বিপন্ন করে, ভাবায়। তারপর এপাশ ওপাশ করেন। তারপর আবার ঘুম খোঁজেন। হয়তো স্বপ্নে প্রিয়জন তাঁর একার জীবনে ছায়া হয়ে আসে।
একদিন বাড়ির নানা জিনিস বাড়ি থেকে দূর করবেন বলে ঠিক করেন। ছেলেমেয়েদের ব্যবহৃত খাট। ওদের আলমারি। সবগুলোই পুরোনো এবং ভাঙা। কেন যে এগুলো বাড়িতে রেখেছেন জানেন না। তিন মেয়ে তিন মহাদেশে। বড় মেয়ে আমেরিকায়। পরেরটা অস্ট্রেলিয়ায়। আর ছোটটা ইউরোপের ইতালিতে। ওদের জীবন ওখানে ভালোই চলছে। ক্রিসমাসে কার্ড আসে। আর তাঁর জন্মদিনে এক মেয়ে কার্ড পাঠায়। আর দু’জন নয়। ওরা যে একবারও তাঁকে দেখতে আসবে না, সে ব্যাপারে তিনি নিশ্চিন্ত। হয়তো মারা গেলে আসবে। বাড়িটা বিক্রি করে তিনজনে টাকা ভাগ করে নিয়ে চলে যাবে। ছেলে পল? তিনি জানেন না ও কোথায়। এবার আবার তাঁর বুক ব্যথা শুরু হয়। তিন বোনের সঙ্গে ঝগড়া করে ছেলেটা যে কোথায় চলে গেছে! আজও জানেন না ও কোথায়। খুব আদর করতেন ছেলেকে। তিন মেয়ের পর ছেলে হয়েছিল। মায়ের কাছেই ঘুরঘুর করত সারাদিন। মায়ের সঙ্গেই ছিল তার যত গল্প। যখন চলে যায় বয়স ছিল বিশ। ও আসবে আজ না হয় কাল। এই করতে করতে পঁচিশ বছর চলে গেছে। ও আর আসেনি। ছেলেটার ছবিটাতে বিশ বছরের ছেলের হাসিমুখ। দেয়ালে ঝুলছে। তিনি ভাবতে পারেন না ছেলের বয়স এখন আর বিশ নেই। তাঁর মনে সেইসব ছবি, পল তাঁর কোলে মাথা রেখে নানা গল্প করছে। আর তিনি গল্প শুনতে শুনতে ছেলের চুলে বিলি কাটছেন। দু’জনে প্রাণ খুলে হাসছেন।  
একদিন লোক ডেকে পুরোনো কিছু আসবাব বিদায় করেন। কিছু গদি, তোশক। ছেলের ঘরে ঢুকে কিছুই তিনি সরাতে পারেন না। দেখেন আবার চলে আসেন। দেয়ালের ছবির ধুলো ঝাড়েন। ছেলেটা হাসছে। বুক খালি করে সেই যে গেল! একজন মা কেমন বিবশ হয়ে ওঠেন।
বসার ঘরে একটা গদিআঁটা চেয়ার। ছেলেই বসত ওখানে বেশি। লাল ভেলভেট গদির ওপর। এখন রংটা বিবর্ণ। আর একটা পা কাজ করে না। ছেলের এই চেয়ার ফেলে দিতে তাঁর কষ্ট হয়। তার পরও ভাবেন পা ভাঙা এই চেয়ার দিয়ে কী করবেন তিনি? পলের নিজের ঘরেও একটা চেয়ার আছে। সেটার অবস্থা ভালো। মনে মনে বলেন– ছেলে এসে ওই চেয়ারে বসবে। এখনও ভাবছেন পল আসবে। আসলে যেই দেশেরই হোক রোজমেরি একজন মা। রোজমেরির এক চাচাতো বোন আছে। দুই বছরে তার সঙ্গে দেখা হয়। সে-ই বলেছিল একদিন– ‘ছেলেমেয়ে যখন ছোট থাকে ভেঙে দেয় তোমার হাত। আর যখন বড় হয় ভাঙে তোমার হৃদয়। ‘হোয়েন দে আর স্মল ব্রেক ইয়োর হ্যান্ড। হোয়েন দে আর বিগ ব্রেক ইয়োর হার্ট।’ ব্রিটেনের মায়েরাও মাঝে মাঝে এমন কথা বলে। হৃদয় ভাঙার কথা। চাচাতো বোন মেরিরও তাঁর মতো বাতের সমস্যা। এখন চাইলেও সে আসতে পারে না। ছেলে পল ব্রিটেনের আলো-হাওয়ায় বড় হয়েও বলত সব সময়– আমি তোমাকে ফেলে কখনোই যাব না মা। সে কথা মনে হলেই একটা খাবি খাওয়া মাছের মতো মাঝে মাঝে তিনি জোরে নিঃশ্বাস নেন। বুক ধরে কখনও বসেন ছেলের ছবির সামনে।
সেই পুরোনো জিনিসপত্র নেবার লোকটা দুটো খাট, গদি, বালিশ, লেপ, তোশক নিয়ে চলে যায়। বড় একটা ভ্যান এনেছিল। এর সঙ্গে দুটো টেবিল এবং আরও কিছু।
তুমি ওই লাল চেয়ারটা বাড়ির পেছনে রাখো। পরে নিও। লোকটা বলে পরে? এখন নিলে তো এক খরচেই হয়ে যেত।
না থাক। তিনি গদিমোড়া চেয়ারটা এই বাড়ির চৌহদ্দি থেকে দূরে চলে যাবে ভাবতে পারেন না। পেছনে একটা শেড আছে। আপাতত চেয়ারটা সেখানেই স্থান পায়। রোজমেরি জিনিস নেবার লোকটার দাম মিটিয়ে শেডে আসেন। সেখানে আরও নানা জিনিস। আহা সেই বেবি ওয়াকারটা না? যেটা ধরে পল হাঁটতে শিখেছিল। তিনি বেবি ওয়াকারে হাত বোলান। চোখে ভাসছে নতুন হাঁটতে পারা পলকে। নতুন দাঁত দেখিয়ে হাসছে পল। মাকে দেখে আনন্দের সীমা নেই। বুকটা আবার কেমন যেন মোচড় দিয়ে ওঠে। তিনি ঘরে চলে আসেন।
আরও এক বছর চলে যায়। তিনি পলের বিশ বছরের ছবিটার ধুলো ঝাড়েন। তারপর একদিন যখন শেডে আর জায়গা নেই, তিন বাড়ি আগের সেই ছেলেটা আসে তার বাড়িতে। ছেলেটা পুরোনো জিনিস সারাই করে একেবারে নতুন করে ফেলে। এবং পরে সেটা সে বিক্রি করে। ভালো দামে। এই ওর টুকটাক টাকা উপার্জন।
তোমার বাড়িতে কি পুরোনো কোনো আসবাব আছে রোজমেরি? ছেলেটার কোথায় যেন পলের সঙ্গে মিল আছে। বোধ করি চুলে আর চিবুকে। বলেন তিনি– তাহলে তুমি আমার এই ভেলভেটের চেয়ারটা নিয়ে গিয়ে ঠিক করো। আমি আবার তোমার কাছ থেকে কিনে নেব। ঠিক আছে?
ছেলেটা একটু ভাবে। তারপর বলে– ঠিক আছে। রোজমেরি পলের সঙ্গে ওর চেহারার একটু মিল পেয়েছেন। আর ও? মিল পেয়েছে তার ছয় মাস আগে মারা যাওয়া ডরোথি গ্রাডমায়ের সঙ্গে। এই পৃথিবীতে সারাক্ষণই একটা যোগ-বিয়োগের খেলা চলে। যখন রোজমেরি সেই ছেলেটার চুলটা একটু গুছিয়ে দেয় ও বাধা দেয় না। ও অবশ্য অন্য কেউ হলে মাথা সরিয়ে নিত। আর একটা ছেলেকে ডেকে এনে সেই পুরোনো লাল ভেলভেটের চেয়ারটা নিয়ে যায়। চেয়ারটা ভারী। ঘাড় ঘুরিয়ে বলে– থ্যাংক য়ু রোজমেরি। রোজমেরি একটু ম্লান হাসিতে বলেন– ইটস মাই প্লিজার মাই লাভলি। লাল ভেলভেট আবার আগের মতো লাল করে দিও। দেবে তো?
অফকোর্স। ছেলেটা বলে। আমাকে সাত দিন সময় দাও।
রোজমেরি ঘরে আসেন। দেয়ালে বিশ বছরের পল হাসছে।
দুই দিন পর ছেলেটা আসে। বলে– চেয়ারে একটা জিনিস পেয়েছি রোজমেরি।
রোজমেরি ওর বেড়াল ববকে খাবার দিয়ে একটা চেয়ারে বসে ছিলেন। বলে– কী জিনিস মাই বয়।
ছেলেটা মুঠো খুলে একটা পাঁচ শিলিংয়ের কয়েন দেখায়। বলে– এটা তোমার। চেয়ারের ভেলভেটের ভেতরে ছিল।
রোজমেরি চেয়ার থেকে ওঠেন। পঁচিশ বছর আগের একটা রুপোর শিলিং। সেখানে একটা লাল ফুটকি। ছেলেটা সেই শিলিং ওর হাতে দেয়। বলে– এটা তোমার।
রোজমেরি কথা বলতে পারে না। মনে হয় তার চার পাশের সমস্ত পৃথিবী দুলছে। তিনি একটা চেয়ারের হাতল ধরে বসে পড়েন। একটা পাঁচ শিলিংয়ের কয়েন। যেখানে এক ছিট লাল দাগ। ছেলেটা সেই শিলিং ওর হাতে দিয়ে চলে যায়। ছেলেটা সৎ এবং শোভন।
তিন বোন বাইরে যাবে বলে সেদিন বিশেষ সাজগোজ করেছিল। ওরা তখন কাজ করে। ওদের একজনের একটা পাঁচ শিলিংয়ের কয়েন নিয়ে ওরা বাইরে যাবে। ঘুরবে। তারপর ওই শিলিং দিয়ে পার্কে আইসক্রিম খেয়ে বাড়ি আসবে– এমনি ছিল ওদের পরিকল্পনা। কিংবা সিনেমা দেখবে– কয়েনটা রাখা ছিল সামনের টেবিলে! এমনই বলেছিল ওরা। আসলে যে রেখেছিল সে তো ঠিক মনে করতে পারছিল না বোধ হয়। পল কার্পেটে শুয়ে গান করছিল। সেও বাইরে থেকে ঘুরে এসে মায়ের কোলে মাথা রেখে মায়ের সঙ্গে কথা বলে, আপন মনে গান করছিল। বেশ হাসিখুশি ওর সবকিছু। মাকে সেদিনও বলেছিল– আমি তোমাকে ফেলে কোথাও যাব না মা। আমি সব সময় তোমার সঙ্গে থাকব। মায়ের মন তখন প্রশান্ত এবং ভাবনাহীন।
পল তুমি কোথায় লুকিয়ে রেখেছ আমার পাঁচ শিলিং! এখনি বল। এক বোন বলে। একবারে মূর্তিমান হায়েনার মূর্তিতে।
পল হয়তো প্রথমে ভেবেছিল বোনেরা ওকে নিয়ে একটু মজা করছে। মা যে ওকে সবচাইতে বেশি ভালোবাসে, সেটাই ছিল ওদের ঈর্ষার কারণ। পল প্রথমে এমন কথার কোনো উত্তর না দিয়ে গান গেয়েই চলেছে। এবার বড় বোন রেবেকা ধমকের সুরে বলে– এমন ঠাট্টা আমাদের পছন্দ নয়। বল কোথায় রেখেছ।
পল বুঝতে পারে ওরা সত্যিই খুব সিরিয়াস।
বলে সে– যেখানে রেখেছ সেখানেই থাকবে। কয়েনের তো আর পা নেই হাঁটতে হাঁটতে চলে যাবে। ভালো করে খুঁজে দেখ।
বেশি কথা বলবে না। মায়ের আদরে তুমি একটা শয়তান হয়েছ। বলছি কোথায় রেখেছ বলো।
পল বলে– আমি জানি না।
জানো না? এ ঘরে তুমি ছিলে আর কেউ না। আর কয়েনটা ছিল ওই লাল ভেলভেটের গদিমোড়া চেয়ারের সামনের টেবিলে। রেবেকার রাগী মুখ এবং আরও দু’জনও কেমন হিংস্র হয়ে ওকে দেখছে। জাত আলসেসিয়ানের মতো। বলে– আমাদের কয়েন লুকোতে পারবে না। ওর গায়ে একটা লাল ফুটকি আছে। ওটা আমাদের লাকি কয়েন। পল যত বলে সে জানে না, ওরাও তত বেশি রেগে হিস্র কুকুরের মতো পলকে নানা কথা বলতে থাকে। রান্নাঘর থেকে তখন রোজমেরি ফিরে এসেছেন। বলেন– ও তো বলছে ও জানে না।
বললেই হবে। তোমার আদরে আর প্রশ্রয়ে ও একটা বাঁদর হয়েছে। ও নিয়েছে আর এখন বলছে জানে না। যেখান থেকে পারো এনে দাও। তুমি লুকিয়ে রেখে আমাদের নিয়ে মজা করছ। তোমার সাহস তো কম নয় পল।
পল তেমনি শুয়ে আছে। গান আর করছে না তবে এমন করে হাসছে দেখে ওদের রাগ আরও বেড়ে পায়। বলে– তোমার চেহারাই বলছে তুমি লুকিয়ে রেখেছ। দাও বলছি।
তিন বোন তখন ভয়ানক হিংস্র কুকুরের মতো ওকে প্রায় আক্রমণ করে। রেবেকা বলে– তোমার চুল ছিঁড়ে দেব এমন বাঁদরামির জন্য।
বেশ কিছুক্ষণ এমন ঝগড়া। পল বলে– ও জানে না। আর ওরা বলে– তুমি লুকিয়ে রেখেছ। ঝগড়া একসময় তুঙ্গে। পল হাসছে না, গানও করছে না। শান্তিপ্রিয় এই ছেলেটা একসময় বলে– কেন মিথ্যা আমাকে দোষ দাও তোমরা।
মিথ্যা। তুমিই নাম্বার ওয়ান মিথ্যাবাদী। তুমি মিথ্যাবাদী আর নাম্বার ওয়ান বাঁদর। ওটা না পেলে তোমার ভালো হবে না।
পল বলে শান্ত স্বরে– ওটা আমি নেইনি। আমি কোথাও লুকিয়ে রাখিনি। আমি কখনও মিথ্যা বলি না।
মিথ্যা বলি না। তুমি মিথ্যার জাহাজ।
ওরা সমবেতভাবে আবার কিছু বলতে চাইলে মা বলেন– থামো তোমরা। তারপর পলের চুলে একটু হাত বুলিয়ে বলেন– বাবা পল তুমি ছাড়া আর কেউ এ ঘরে ছিল না। একটু দুষ্টুমি করে লুকিয়ে রেখেছ এই তো। তুমি কয়েনটা ওদের দিয়ে দাও। দাও বাবা।
পল উঠে বসে। মায়ের মুখের দিকে তাকায়। তারপর বলে– তুমিও আমাকে বিশ্বাস করো না। তুমি মনে করো আমি মিথ্যাবাদী!
দাও না কয়েনটা ওদের। মা আবার নরম সুরে মিনতি করে বলেন।
পল উঠে দাঁড়ায়।  বলে– তুমি মনে করো আমি মিথ্যাবাদী! তুমি আমাকে বিশ্বাস করো না? তুমি আমাকে …। পল কথা শেষ না করে দরজা দিয়ে বাইরে চলে যায়। তারপর নিজের ঘরে। গায়ে একটা কোট চাপিয়ে দরজা খুলে চলে যায় বাইরের পৃথিবীতে। কেবল একটি কোট। আর কিছু নয়। এ বাড়ির কোনো কিছু সে নেয় না।
ওরা চিৎকার করে বলে– একটা পাঁচ শিলিংয়ের কয়েন। খরচ করে তারপর তো বাসায় আসবে। নাম্বার ওয়ান মিথ্যাবাদী। মা তুমি ওকে নষ্ট করেছ।
পল এরপর আর কোনোদিন ফিরে আসেনি। কেউ জানে না ও কোথায়। দিন পার হয়ে যায়। তিন মেয়ে একজন একজন করে যে যার পছন্দের জীবন বেছে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। ওরা তো কোনোদিন বলেনি– মা তোমাকে ফেলে আমরা কোথাও যাব না। ওরা কেউ পল নয়। এক বছর, দুই বছর, তিন বছর! এই করতে করতে মহাকালের নিজের নিয়মে চলে যায় পঁচিশটি বছর। একজন বৃদ্ধা করুণ রমণী এখনও দিন গোনে। এখনও আশা করে।
রোজমেরি সেই লাল ছিট লাগা কয়েন হাতে পাথরের মূর্তির মতো বসে থাকেন। তারপর ধীরপায়ে হেঁটে এসে পলের ঘরের সামনের সেই ছবিটার দিকে তাকান। পল হাসছে। তারপর আস্তে আস্তে মেঝেতে বসে পড়েন। দুই হাতে চোখ ঢেকে বলেন– পল আমি তোমাকে বিশ্বাস করি। তার কান্না কেউ জানতে পারে না। তার হৃদয় চূর্ণ হবার খবর কেউ রাখে না। বলেন কান্নাভেজা স্বরে– হে আমার ঈশ্বর, ও যেখানেই থাক তুমি পলকে বলো ওকে আমি বিশ্বাস করি। ও কোনোদিনই মিথ্যাবাদী নয়। হে আমার ঈশ্বর, তুমি ওকে বলে দিও। বলে দিও বলে দিও। বলতে বলতে মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন।
একজন বৃদ্ধা কাঁপছেন আর কাঁদছেন। তারপর একসময় তাঁর শরীর নিথর। মাথা মেঝেতে।   
বাইরের পৃথিবী নিজ নিয়মে সেকেন্ড থেকে ঘণ্টায়, ঘণ্টা থেকে দিনে, তারপর আর এক দিনে। জানালাটা সেই সময় একটা ঝড়ের মতো খুলে যায়। তারপর সব শান্ত।

 

আরও পড়ুন

×