ব্যক্তিগত
আমার ফুল বাগান
প্রতীকী ছবি
সালেহা চৌধুরী
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ | ১৫:০১
আমার বাড়ির পেছনে একটি ফুল বাগান আছে। গোলাপ ফোটে, আবার কখনও অন্য ফুল। ফোটে সামারে। আর শীতে ঘুমিয়ে যায়। সেখানে একটি গোল টেবিল আছে। আর দুটো চেয়ার। গোল টেবিলে কখনও শোভা পায় গানের যন্ত্র। কখনও নিটিংয়ের কিছু। আবার কখনও বই। আবার কখনও নোটবুক। মাসে একজন মালী এসে বাগানটা পরিষ্কার করে। গল্প হয়। ক্রিস ছিল। দুই বছর পর ও চলে গেছে। দুজনে এন্তার সাহিত্যের গল্প হতো। যাবার সময় ওর কিছু জমানো বই আমাকে দিয়ে চলে গেছে। কোনো এক ওয়েলসের কবির অমনিবাস। মানে ডিলোন টমাসের সমগ্র। আমি ওকে আমার বই দিয়েছিলাম। এরপর এসেছে আরও একজন। ও ভালোই। নাম প্যাট্রিক। ও ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। বাড়ি থেকে সেদিন মেয়ে ফোন করে বলেছে বাগানের পার্টিশন ওয়াল পড়ে গেছে। খুব একটা বড় ঝড় হয়েছিল। আমি কী করব? আমি মালীটাকে ফোন করে সেই ভাঙা ওয়ালের ব্যবস্থা করতে বলি। ও করেছে।
গোলাপের গাছ পনেরোটার মতো। অন্য ফুলগাছ কয়েকটা। কখনও দূরদেশ থেকে সব পাখি উড়ে আসে; সব জামা গায়ে। দেয়ালে বসে থাকে। আমাকে দেখে। তারপর উড়ে চলে যায়। ভালো লাগে। একদিন লাল গলার একটা পাখি এসেছিল। মনে হয়েছিল আমার কোনো কালের আত্মীয়। পাখির খাবার দেওয়া হয়। সুধা আমাকে একটি গোলাপ গাছ দিয়েছিল। যে গোলাপের রংটা সবুজ মতো। আমার ভালো লেগেছিল গোলাপ গাছটা। ও তখন ওর প্রেমের গল্প করছিল।
বাগানে বসলেই পাশের দুই বাড়ি থেকে হ্যালো শোনা যায়। গল্প। কখনও আমি একা। তারপর আবার ঘর থেকে চা আর এটা-সেটা খাবার। একদিন সুধা এসে ওর জীবনের গল্প করেছিল। প্রেম আর ভবিষ্যতের কথা। ওর স্বামী খুব বেশিদিন বাঁচবে বলে মনে হয় না। ও আর একজনকে ঠিক করেছে জীবন ভাগ করে নিতে। বলেছিল– কী আর করব। ও তো দারু আর সিগিতে জীবন শেষ করেছে। দেখি বাকি জীবন যদি সুস্থ হার্ট ও লাঙের কাউকে পাই। জীবন পিপাসায় কাতর সুধা। আমাকে বলেছিল– বারো বছর একা। খারাপ লাগে না।
না। আমি লিখি। সব চরিত্র নিয়ে আমার সময় কাটে। ভালোই আছি। ওরাই আমার বন্ধু আর সুহৃদ।
যখন এপ্রিলে নতুন ফুল ফোটে মনটা উল্লসিত হয়ে যায়। তারপর সে ফুল গাছ একটু একটু করে বড় হয়। কখনও ওদের সঙ্গে কথা বলি। ওরা উত্তর দেয়। আমার ভালো লাগে। এরপর জুন, জুলাই, এপ্রিল আর আগস্ট– ফুল আর ফুল। আমি তখন সত্যিই আনন্দিত একজন। ফুল গাছগুলোর নাম আছে। একজন হরিয়ালি, একজন বিয়াসা, একজন বরখা। নামগুলোর কয়েকটা সুধার দেওয়া। আমার একটার নাম আনন্দি। আর পারিজাত। আর একটি গুলমোহর। সুধা কখনও এসে কথা বলে যায়। তারপর রেডিওতে এটা-সেটা শোনা। বাগানটা আমার আনন্দময় সময়ের সেই ভালো লাগা; যা টাকা দিয়ে কেনা যায় না। বেড়াল পেনি এসে মাঝে মাঝে কাছে আসে। ফুল গাছ ছুঁয়ে একবার এখানে একবার ওখানে যায়। তারপর কখনও পায়ে মাথা ঘসে। পেনির আগে যিনি ছিলেন, বিশ বছর পর মারা যান। মেয়ে বলে মেসেঞ্জারে– পেনি রাতে তোমার লেপে মাথা রেখে ঘুমায়। ও ওই ঘর থেকে কোথাও যেতে চায় না। মেয়ে লন্ডনের খবর পাঠায়। আমি ঢাকার।
লাল ঝুঁটিওয়ালা পাখিটা কয়েকবার এসেছে। ওর লাল স্কার্ফটা চেনা কোনো একজনের মতো। ও কি সেই ছেলেটা, পান্নার মতো? যে চিঠির পর চিঠি লিখে উত্তর না পেয়ে কোথায় যেন চলে যায়। সকলে বলে বোনের কাছে চলে গিয়েছিল। শহরটা ছেড়ে আসতে একসুচ কষ্ট পেয়েছিলাম। ওরও তো লাল একটা মাফলার ছিল। ওর বোনের বানানো।
আয়না বলে– তুমি এখনও এসব ভাবো? আমি বলি– ভাবতে ভাবতে, বাগান আর ফুলেরা আর ওই লাল মাফলারের পাখিটা আমাকে একটা গল্প দিয়ে যায়। তারপর আর একটা। তারপর আর একটা। একটা উপন্যাসের ব্লুপ্রিন্ট করছি– নাম দেব ‘আমি তুমি সে ও অক্সিজেন।’ কেমন হবে? জীবনের এই অক্সিজেনের রং এক-একজনের একরকম। সুধার অক্সিজেন হরিদাস বলে ওই যৌবনদৃপ্ত লোকটা। যাকে ও বলে হরিদাস আমার। আর পাশের বাড়ির ট্রেসির রং করা কিছু নতুন জামা। আর সায়রা নামের মেয়েটার বই। ও বই পড়তে ভালোবাসে। আমি ভাবছি দুটো উপন্যাসের কথা, ভাবছি অক্সিজেনের কথা, শেষ পর্যন্ত জালে কোন পাখিটা ধরা পড়ে।
এবার ট্যাপ খুলে ওদের পানি পান করাতে হবে। ওদের তৃষ্ণা পেয়েছে। বাগানের নতুন ট্যাপে ঝরঝর পানি ঝরে। গোলাপ গাছ পানি পান করে মাথা দুলিয়ে কী যেন বলতে চায়। তারপর নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
ঘরে ফোনের শব্দ। কোন এক দূরের ফোন। ফোনের কথা শেষ হয়। আমি আবার ফিরে আসি গোলাপের বাগানে। মাটি আলগা করি। পচা পুরোনো পাতা ছিঁড়ে ফেলি। খুপরিতে একটু অক্সিজেনের ব্যবস্থা করি। তারপর আবার ফিরে যাই নিটিংয়ে না হলে বইতে। একা থাকা কষ্টের নয়। যদি থাকে নিজের জগৎ। আর কল্পনা নামের সেই এলিক্সার। ওরা বলে– আমি নাকি রেকর্ড করেছি। প্রবাসে একশটি বই লিখেছি। হবে। তবে বই তো আমার হৃদয় আর মননের সেই তৃষ্ণা যাকে আমি ট্যাপ থেকে ঝরিয়ে বাগানে দেই। আর বাগান হাসতে থাকে। এখন আমার চারপাশে কতসব চেনা-অচেনা মুখ। সকলকে আমি চিনি। যারা আমার মন জুড়িয়ে দেয়। আমি মনে করি– বেশ আছি। বেশ আছি। আমার কোনো কষ্ট নেই। কেবল অদ্ভুত স্বপ্ন আমাকে হাসায়, কাঁদায়। তারপর সকালের আলো এসে আমাকে ঘিরে ধরে। বাগান হাসছে। পনেরোটি গোলাপ, আর সব ফুল। বোগেনভিলিয়া, লালচে সেই ফুল– যার নাম আমি বারবার ভুলে যাই। হাইড্রেনজা। ফুল ভরা ক্যাকটাস। দুটো অর্কিড। আমার দুটো চেয়ার। একটা গোল টেবিল। আর ছাতা। আমার প্রাণ জুড়ানো সময়। কখন সেইসব গান। সেদিনের সোনাঝরা সন্ধ্যা বা অন্য আর একটা। তখন আমার মনে পড়বে অনুর কথা। ও রংপুরে আমার সঙ্গে পড়ত। আমাদের বাড়ির সামনে যেতে যেতে খোলা গলার গান– সেদিনের সোনাঝরা সন্ধ্যা। রংপুর থেকে আসবার সময় ওকে দেখিনি। এখনও কি অনু বেঁচে আছে? পান্না নেই। আমি আছি। আর আছে আমার গানের ভাবনা, গল্প আর উপন্যাসের ব্লুপ্রিন্ট।
ছেলেমেয়েরা মাঝে মাঝে আসে। ছেলেটাও মাঝে মাঝে বই লেখে। মেয়েটা পড়ে দেদার। এখনও লেখা ভর করেনি ওকে। আমি গল্প করি। তারপর একা।
সুধা জানিয়ে গেছে হরিদাস ওকে আর ভালোবাসে না। ও কান্তা বলে একটা মেয়েকে এখন ভালোবাসে। হয়তো হরিদাস কান্তাকে বিয়ে করবে। সুধার মন খারাপ। খানিক পর চলে যায়। আমার সৃষ্টির নরনারী এমন করবে না। কেউ আমাকে ছেড়ে যাবে না। আর গোলাপের থেকে যাক বাগান আলো করে। তারা তো যাবেই না। মাঝে মাঝে ভাবি আমি কি কেবল নিজেকে ভোলাতে চাই? আমি কি ওসব গল্প লিখে কেবল নিজেকে ব্যস্ত রাখি। কিছু বলতে চাই? তা হোক। হরিদাসের মতো কেউ তো এসে বলবে না– আমি তোমাকে আর ভালোবাসি না। কান্তাকে বিয়ে করব। কারণ, কান্তার বয়স কম আর রং ফর্সা। আর ভীষণ দুষ্টু কান্তা!
গলার লাল মাফলার জড়ানো পাখিটা, একরাশ লাল গোলাপ, ফুল ঘিরে থাক আমাকে। আর রেডিওতে কোনো সুর। মনে মনে ভাবি, কেমন হবে সেই উপন্যাস– আমি তুমি সে ও অক্সিজেন।
আমার বাগান আমার একান্ত বিলাস। জীবনে একটু-আধটু বিলাস থাকা ভালো। আর যদি ফুলেরা সঙ্গী হয়ে যায়, তারপর তো আর কোনো কষ্ট থাকে না। ফুলেরা ভালো থাকো। আলো হয়ে থাকো আমার বাগানে। নীল গলার পাখিটা মাঝে মাঝে উড়ে এসে বসে। তুমিও এসো যখন মনে হয়। আর সঙ্গে করে এনো আরও পাখি। আবার কখনও উজ্জ্বল একঝাঁক পায়রা আসে। প্লেটে ভাঙা বিস্কুট থাকে ওদের জন্য। জীবন তো আসলে এই। সঙ্গ নিঃসঙ্গতায় আমার লেখালেখি আর ফুলেদের ভালোবাসা। সুধা তুমি কেন ভুল মানুষ বেছে কষ্ট পেলে। বানাও না একটি বাগান, যেখানে পাখিরা আর প্রজাতিরা তোমাকে ভালোবাসবে।
- বিষয় :
- ব্যক্তিগত
