ঢাকা বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

জানালা

জহির রায়হানের রক্তবীজ

জহির রায়হানের রক্তবীজ
×

জহির রায়হান [১৯ আগস্ট ১৯৩৫–৩০ জানুয়ারি ১৯৭২]

বদরুজ্জামান আলমগীর

প্রকাশ: ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:১৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

জীবনের একটা মুক্তধারা সময় আমি ঢাকার মিরপুরে কাটিয়েছি। আমার ধারণা ছিল– হঠাৎ একদিন জহির রায়হানের সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে! রক্তবীজ বলে একটা কথা আছে না– মাতঙ্গিনী মা কালীও যাকে নিঃশেষ করতে হাঁপিয়ে ওঠেন!
অবিরাম আমার প্রাণাশা ছিল মিরপুরের কোনো না কোনো কংক্রিটের নিচে নিশ্চয়ই জহির রায়হানের একফোঁটা অদম্য রক্ত লেগে আছে– যা থেকে একদিন তিনি রক্তবীজ ঠিকঠিক বেরিয়ে আসবেন।
সম্ভবত আমি ক্লাস এইটে পড়ার সময় অগ্রজ খালেকুজ্জামান মতিনের কল্যাণে প্রথম জহির রায়হানের ‘তৃষ্ণা’ উপন্যাসটি আমার হাতে আসে; তিনি কিশোরগঞ্জ মহকুমা বিতর্ক প্রতিযোগিতায় জয়ী হয়ে বইটি উপহার পেয়েছিলেন। পাঠ্যবইয়ে শাহজাহান স্যার, বা খসরু স্যার যে বাংলা পড়ান– তার সঙ্গে তৃষ্ণার ভাষা ও ভাব মেলাতে আমার কপালে নির্ঘুম দশা নেমে আসে। 
কলেজে ভর্তি হবার মারাত্মককালে আমার আরেক অগ্রজ কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের বরাতে জহির রায়হানের সবগুলো উপন্যাস আমার হাতে পাই। জহির রায়হানের উপন্যাসের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার একটা অদ্ভুত যুক্তি আমার মাথায় ঢোকে– যে-পূর্ববাংলায় এমন ভাষায় এ রকম স্বপ্ন ও উপন্যাস লেখা হয়, সেই জনপদ আর পাকিস্তানের অধীনে থাকতে পারে না– পূর্ণ স্বাধীনতাবিহীন অন্য কোনো আঁধিয়ারে তাকে আর মানায় না।
আরেক ফাল্গুন উপন্যাসের শেষ লাইন– আসছে ফাল্গুনে আমরা কিন্তু দ্বিগুণ হবো– পড়েই মনের অজান্তে মনস্থির করি– ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে প্রথমেই আমি ঢাকায় শহীদ মিনারের সামনে গিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়াব।
মার্কসবাদে ইমান আনার পর প্রথম যে আতঙ্কে কাবু হই– তা হলো, বড় বড় অনেক মার্কসবাদী লেখক নামতার মতো করে লেখেন– তিনি সারাক্ষণ তটস্থ থাকেন তা যেন মার্কসবাদী নন্দনতত্ত্বের ফর্মুলার বাইরে না যায়। এ ক্ষেত্রেও জহির রায়হানকে এক কার্যকর ব্যতিক্রম হিসেবে পাই।
‘আরেক ফাল্গুন’ উপন্যাসের বুনন আর চালচিত্র তৃষ্ণা, বা ‘হাজার বছর ধরে’ থেকে মৌলিকভাবে আলাদা; ‘বরফ গলা নদী’, ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’ বাঙালি মধ্যবিত্ত জীবনের চড়াই-উতরাই, ওঠানামার কড়চা; অন্যদিকে আর কতদিন তাঁর এক বিশ্ববীক্ষা। জহির রায়হান ‘লেট দেয়ার বি লাইট’-এর বাংলা করেছিলেন আর কতদিন। বাইবেলের জেনেসিস পর্ব থেকে লেট দেয়ার বি লাইট পদ নিয়েছিলেন বটে, কিন্তু বাইবেলীয় একচ্ছত্রতার জায়গায় ঠেসে দিয়েছিলেন পরাধীন মাতৃভূমি ও ক্লেদাক্ত দুনিয়ার মুক্তির বাসনা।
সিনেমায় জহির রায়হানের স্বপ্ন কল্পনা ঠিক অন্য কোনো বাঙালি চলচ্চিত্রকারের সঙ্গে মেলে না। ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ চলচ্চিত্রে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে জহির রায়হান পরিচিত হয়েছিলেন কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজের সঙ্গে, লেট দেয়ার বি লাইটের উর্দু ভার্সনে ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের কাজ করার কথা ছিল। 
‘বেহুলা’, ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘কখনো আসেনি’ থেকে ‘স্টপ জেনোসাইড’ পর্যন্ত জহির রায়হানের অন্বেষা, সংযুক্তি, জনমুখিতা তুলনারহিত। কথাশিল্পের এক জাদুকরি ভাষা আমরা মিস করি, আমরা সাধারণ মানুষেরা খুঁজে ফিরি স্টপ জেনোসাইডের নির্ভীক মোকাবিলা, সাচ্চা মুক্তির নেশা। ১৯৭১-এর স্বাধীনতার ভেতর দিয়ে কত বাঘা বাঘা সেলিব্রিটি তাত্ত্বিক পেয়েছি, আগুনখেকো বক্তা আমাদের ওপর হামলে পড়েছে– কিন্তু একজন জহির রায়হান, একজন পরীক্ষিত ক্রিয়েটিভ পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল আর পাইনি– অঙ্গীকার আর সৃষ্টিশীলতার এমন যৌগ দ্বিতীয়জন আসেনি আর।
বিপুল মেলা উৎসবের জন্য নরবলি লাগে; জহির রায়হান ছাড়া আর কার এমন বুকের পাটা যে বুক চিতিয়ে খাঁড়ার নিচে মাথা গলিয়ে দিতে পারেন? 
জহির রায়হানের দিকে তাকিয়ে আমরা অবলীলায় শতাশতি বাজারি ইন্টেলেকচুয়ালদের খারিজ করি; জহির রায়হানের একটি লাইন ধার করেই বলি– ওদের জানিয়ে দাও। ওরা বুদ্ধিপাইকার। 
ফিনকি দিয়ে জহির রায়হানের রক্ত আমাদের তারা-ভেজা চাহনি      ও তীরের ফলায় এসে লাগে– ওম গর্ভবতী পাথর কাতরায়      শিহরণ লাগি! 

আরও পড়ুন

×