ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

‘প্রকৃতিই শূন্যস্থান পূরণ করে দেয়’

‘প্রকৃতিই শূন্যস্থান পূরণ করে দেয়’
×

বদরুদ্দীন উমর [২০ ডিসেম্বর ১৯৩১–৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫]

বদরুদ্দীন উমর

প্রকাশ: ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:১৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের জ্ঞানতাত্ত্বিক রাজনৈতিক আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব বদরুদ্দীন উমর। চলতি বছরের ৭ সেপ্টেম্বর তিনি প্রয়াত হয়েছেন। তাঁর রেখে যাওয়া ‘ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর: উনিশ শতকের বাঙালি সমাজ’, ‘পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’, ‘সাম্প্রদায়িকতা’, ‘বাংলাদেশের অভ্যুদয়’, ‘যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ’, ‘মার্কসীয় দর্শন ও সংস্কৃতি’, ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি’, ‘সমাজতন্ত্রের অনিবার্য ভবিষ্যৎ’সহ অসংখ্য ধ্রুপদি ইতিহাস ও গবেষণাধর্মী গ্রন্থের মধ্য দিয়ে তিনি স্মরণীয়। আগামীকাল ২০ ডিসেম্বর বদরুদ্দীন উমরের ৯৫তম জন্মদিন। ২০২৩ সালে ডিসেম্বর মাসে মিরপুরে নিজ বাসভবনে বদরুদ্দীন উমর কবি ও সাংবাদিক লোপা মমতাজের মুখোমুখি হন। এর উল্লেখযোগ্য অংশ পত্রস্থ হলো। 

লোপা মমতাজ: আপনার শৈশব থেকেই শুরু করছি। আপনার বাবা চেয়েছিলেন আপনি ডাক্তার হবেন। আপনি কী হতে চেয়েছিলেন?

বদরুদ্দীন উমর: আমি কিছু হতে চাইনি। স্কুলে বা কলেজে পড়ার সময়ও নির্দিষ্ট কিছু হতে চেয়েছিলাম এমন না। তবে আব্বা চেয়েছিলেন আমি ডাক্তার হই।

lআপনার পরিবারে কমিউনিস্ট রাজনৈতিক চর্চা অনেক বেশি হতো বলে জেনেছি। তাহলে কি ধরে নেবো আপনি সেখান থেকেই কমিউনিস্ট রাজনীতি করতে উদ্বুদ্ধ হন?

ll না, বিষয়টা হলো, আমাদের পরিবারে বহু আগে থেকেই অনেকে কংগ্রেসের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আমার দাদা কংগ্রেস করতেন। তিনি মুসলিম লীগ করতেন না। আবুল কাশেম সাহেব অল্প বয়সেই অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটির সদস্য ছিলেন এবং বেঙ্গল কংগ্রেসেও একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন। আব্বার (আবুল হাশিম) চাচা আবুল খায়ের সাহেবও কংগ্রেসে ছিলেন। পরিবারের অন্যরাও কংগ্রেস করত। পরে অবশ্য মুসলিম লীগেও যুক্ত হয়। পরিবারে আমার বাবা প্রথম মুসলিম লীগে অংশগ্রহণ করলেন। এরপর থেকে কেউ কেউ মুসলিম লীগ করলেও পরবর্তী প্রজন্মের বেশির ভাগই কমিউনিস্ট রাজনীতি করতেন। এরপর কৃষক সভা প্রভৃতি সংগঠনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়তেন। কাজেই আমাদের পরিবারে রাজনীতির একটা আবহ আমি ছোটবেলা থেকেই দেখে এসেছি। আমার বড় দাদা আবদুল জব্বারও রাজনীতি করতেন। সে-সময় যে ধারার রাজনীতি চলত তিনি সেই ধারার রাজনীতি করতেন। অধ্যাপক রফিক কায়সার একটা বই লিখেছিলেন–‘তিন পুরুষের রাজনীতি’। বইটিতে নবাব আবদুল জব্বার, আবুল কাশেম এবং আবুল হাশিম–তিনজনের বংশানুক্রমিক রাজনীতির ইতিহাস লিপিবদ্ধ হয়েছে। পরে আমি যুক্ত হয়েছি। আমি চতুর্থ প্রজন্মের রাজনীতিক।

lসারাজীবন এই বাম ঘরানার রাজনীতির সঙ্গেই কাটালেন।

llআমি ছাত্রাবস্থায় রাজনীতি করিনি, একেবারেই করিনি। ছাত্র ফেডারেশন বা ছাত্রলীগের সদস্য হইনি। পরে একটা সময় চাকরি ছেড়ে দিয়ে পার্টিতে যোগ দিলাম। তবে পার্টিতে যোগ দেওয়ার আগে রাজনৈতিক পরিবেশেই বড় হয়েছি। ছেলেবেলা থেকেই রাজনীতির আভাস পেয়েছি এবং সব রকমের রাজনীতি দেখেছি। কাজেই রাজনীতির সঙ্গে পরিচয় ছিল কিন্তু কোন রাজনীতি করব তা আমার নিজের কাছে নির্দিষ্ট ছিল না। আব্বা মুসলিম লীগ করতেন, কিন্তু আমি কোনোদিন সেই ছাত্রলীগ বা অন্যকিছু করতে যাইনি। ছোটবেলায় কমিউনিস্ট পার্টি বর্ধমানে কিশোর বাহিনী নামে একটি সংগঠন করেছিল। ছোটদের এই সংগঠনের প্রাদেশিক সভাপতি ছিলেন সুকান্ত ভট্টাচার্য। আমি তখন বর্ধমানে তাঁর সেক্রেটারি ছিলাম, এই পর্যন্তই। এছাড়া ছাত্রজীবনে আমি কোনো রাজনীতি করিনি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকা অবস্থায়ও কোনো ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হইনি। ঢাকায় আসার পর তমদ্দুন মজলিশ নামে একটি সংগঠন তখন ছিল। আব্বার সঙ্গে তাদের যোগাযোগ হয়। সেই সময় আমি তাদের সঙ্গে যুক্ত হই। যতদূর মনে আছে, সংগঠনটির সদস্যও হয়েছিলাম। অনেকেই বলেন, তিনি তমদ্দুন মজলিশ করতেন। আমি নিজে একথা কখনও অস্বীকার করিনি। কমিউনিস্ট পার্টির মুজফ্‌ফর আহ্‌মদও এককালে খেলাফত আন্দোলন করেছিলেন, তাতে কী হয়েছে? আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন যখন তমদ্দুন মজলিশ করি, তখন কমিউনিস্ট রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন যারা তারা পরে বামধারার রাজনীতি দূরের কথা, নোংরা রাজনীতির নর্দমায় গড়াগড়ি খেয়েছে। আমার তা হয়নি।

lএই প্রসঙ্গে আমি আরেকটা প্রশ্ন করতে চাই। বাংলাদেশ-ভারত দুই দেশেরই কমিউনিস্ট রাজনীতির সঙ্গে যুক্তদের সমালোচনা করেছেন। এর ফলে কোনো পরিবর্তন তাদের মধ্যে লক্ষ্য করেছেন?

llআমি প্রতিহিংসাবশত কারও সমালোচনা করিনি। এখানে অনেকে আমাকে নিয়ে সমালোচনা করার ক্ষেত্রে গালাগালি ছাড়া কিছু করেনি। রাজনীতি করতে এসে বামপন্থিদের থেকে গালাগালি ছাড়া কিছু পাইনি। সামান্য সাহায্য-সহযোগিতাও পাইনি। একতাবদ্ধ আন্দোলনের দিক থেকে যে ঘাটতি রয়েছে আমি সে বিষয়ে সমালোচনা করেছি। সমালোচনা মানে এই ঘাটতির বিষয়ে আমার আলোচনা। এটিও বলেছি, তাদের মধ্যে ত্যাগ ও অঙ্গীকারে কোনো কমতি ছিল না, কমতি ছিল চিন্তাভাবনায়। সেজন্য নানারকম ভুলভ্রান্তি হয়েছিল। শয়তান সবখানেই থাকে। শয়তান আল্লাহর সঙ্গেও ছিল। আমি তাদের খারাপ বলে চিত্রিত করতে চাইনি, সেখানে ভালো লোকও ছিল। কিন্তু তারা ভুল করছিল। সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন ও সাংগঠনিক দিক থেকে যেসব আন্দোলন আমার কাছে ভুল মনে হয়েছে সেগুলো নিয়ে আলোচনা করেছি।

lবাংলাদেশে এতগুলো বাম দল কেন? এত বিভক্তি কেন?

ll বিভক্তি সবখানেই আছে। বলা যেতে পারে স্তালিনের জীবন পর্যন্ত একটা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল। তখন সারা দুনিয়ায় যে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন ছিল সেটি একটা পতাকার নিচে ছিল। কমিউনিস্ট পার্টির পতাকার নিচেও সবার সদ্ভাব ছিল না। ট্রটস্কির একটা অংশ বের হয়ে গিয়েছিল অনেক আগে। তার কোনো প্রভাব দুনিয়াজুড়ে ছিল না। কমিউনিস্ট পার্টি বলতে সবাই একবাক্যে সোভিয়েত ইউনিয়নের স্তালিনকেই চিনত। সেখানে ভাঙনের পরই দেখা গেল যে দুনিয়াজুড়ে ভাঙন আরম্ভ হয়েছে।

lএকটা সময় বাংলাদেশে বামপন্থি আন্দোলন নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ ছিল; যা এখন ম্রিয়মাণ। কেন? 

ll হবেনা কেন? মানুষ চোরকে ভক্তিশ্রদ্ধা করে না। একদিকে মন্ত্রিত্ব করব, দালালি করব, আরেকদিকে বামপন্থির কাজ করব। মানুষ বোকা না। বাংলাদেশে অভিনব জিনিস দেখা যায়। একদিকে মন্ত্রী হয়ে বসে আছেন, আবার বামপন্থি সেজে সমালোচনাও করছেন। সমাজতন্ত্রের কথা মুখে বলে গোপনে গোপনে সরকারের সঙ্গে আঁতাত রাখলে হবে না। 

lনতুন অবস্থানে সমাজে ভোগবাদি হয়ে ওঠার প্রবণতাগুলো কি কমিউনিস্ট দলগুলো চিহ্নিত করতে পারেনি? 

ll পারেনি। যেমন সিপিবি একটি সংগঠন, ১৯৭১ সালে কলকাতায় গিয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে তেমন কোনো পার্থক্য রাখেনি। ঘুরে এসে তারা যে রাজনীতি শুরু করলো তা দেখে আমি তখন বলেছিলাম, সিপিবি বলতে আর কিছু নেই, এটি আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক উইং। মূলত আওয়ামী লীগের হয়ে তারা কাজ করত। তারপর পঁচাত্তর সালে তারা নিজেদের দল বিলুপ্ত করে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বাকশাল গঠন করল। তাদের নিজস্ব স্বাধীন অবস্থানই তৈরি করতে সক্ষম হয়নি কোনোদিন। এমনকি কমিউনিস্ট পার্টির লোকেরা শেখ মুজিবকে সালাম করত। এই কমিউনিস্টদের মুরোদ কতটুকু? তারা তাহলে কাদের প্রতিনিধি? 

lতখন আপনার অবস্থান কী ছিল? অর্থাৎ সেই সময় আপনি কিসের সঙ্গে যুক্ত?

llআমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই। সাম্রাজ্যবাদ ও পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে লেখালেখি করেছি। সময়ের গুরুত্ব অনুধাবন করে যা বলা প্রয়োজন তা এখন কেউ বলে না। আমি সেই সময় রাজশাহীতে বসে যা বলেছি তা তরুণদের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন হয়েছিল; যাকে আমি পরবর্তী সময়ে ‘উসুলবন্ধের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’ বলে অভিহিত করেছি। সাতচল্লিশের পর শুরু হওয়া এই সাংস্কৃতিক আন্দোলন সেই সময়ে একটি অন্তিম রূপ পাচ্ছিল। আমাদের এখানে সব বিষয়েই শেখ মুজিবকে টানা হয়। যেন এই নামটি বাদে আর কিছুই নেই। এজন্য কমিউনিস্টরা দায় এড়াতে পারেন না। সিপিবি ও রুশপন্থিরা আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিলে একটি আন্দোলনকে বিলুপ্ত করল। পিকিংপন্থিরা সম্পূর্ণ দেউলিয়াই ছিল বলা যায়। নিজেদের পায়ে দাঁড়িয়ে কখনও কিছু করার কথা ভারতের কমিউনিস্টরা ভাবেনি, কখনও পারেনি। সাতচল্লিশের আগেও তাই ঘটেছে। এখানে একান্ন সালের পর থেকে চীনাপন্থিরা চীনা পরামর্শে চলছে। চীনা পরামর্শ বলতে বলা যাবে না যে তারা সরাসরি পরামর্শ নিয়েছে। তারা কেবল চীনা কাঠামোটাকে মেনে নিয়েছে। আদর্শের জায়গা থেকে নিজের দেশের অবস্থা বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা এই পিকিংপন্থিদের ছিল না। তাদের দেউলিয়াপনার চিত্র এই। শুরুতে তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল একসঙ্গে আন্দোলন করবে। পরে আন্দোলনের ফল অর্জনের যে প্রক্রিয়া থাকা দরকার, সে প্রক্রিয়া এখন পর্যন্ত তৈরি হয়নি। এখনও আওয়ামী লীগের নানা দুষ্কৃতি আছে। ইলেকশনে বসলে মুসলিম লীগের ১৯০ ৫৪ সালের অবস্থা আবার ঘটবে অথবা আরও খারাপ হবে। যারা আসছে তারাও একই ঘরানার। চরিত্র ও গুণগত দিক থেকে অভিন্ন। এ অবস্থার বদল না ঘটলে কখনও বিএনপির আমলেও এখনকার নানা সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে এমন প্রত্যাশা করা যায় না। 

lবাংলাদেশে সঠিক কোনো রাজনৈতিক দল নেই? 

llবলা চলে নেই। কারণ ছোট দুয়েকটা থাকলেও তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা নেই। এমন অনেক ছোট দলই আছে; যারা রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে আপস করতে নারাজ, তবে তারা দৃশ্যমান প্রভাব রাখতে অপারগ। কেন এমন হয়েছে এ নিয়ে আমি প্রচুর লিখেছি। বাহাত্তর সালের পর থেকে একটি বিষয় দেখা যাবে। এখানে সংগঠিত কোনো বিরোধী দল নেই। শুধু বামপন্থি কেন, কোনো সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তিই এখানে তৈরি হয়নি। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সমাজকাঠামোতে ব্যাপক পরিবর্তন এলো। নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্ম হলো। যারা এখানে ক্ষমতায় এসেছিল তারা মেরুদণ্ডহীন ছিল। তাদের না ছিল বড় ব্যবসা-বাণিজ্য বা বড় জমিজমা। আওয়ামী লীগের অধীনে যখন তারা এলো, ক্ষমতা ব্যবহার করে লুটপাট, চোরাকারবার ও ভোগবাদিতার মাধ্যমে সম্পদ গড়লো। এ ইতিহাস প্রত্যেকেই জানে। নতুন কিছু বলার নেই। এই মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব এবং সর্বস্তরে তাদের প্রভাব বিস্তার করার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে মাত্র ৯ মাসের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এমন কিছু পরিবর্তন এসেছে; যা কল্পনাই করা যেত না। এই অঞ্চলের মানুষ এক অবস্থান থেকে সম্পূর্ণ নতুন অবস্থানে চলে এলো। এসে তাদের বেহুঁশ হওয়ার অবস্থা। নতুন অবস্থানে তাদের কিছু সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হলো। এই অঞ্চলে ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে ছাত্র আন্দোলনের একটি গৌরবময় ঐতিহ্য ছিল। আশির দশকে এসে কিছু আন্দোলন হয়েছে, কিন্তু সেসব আন্দোলনের কোনো প্রকৃত গণতান্ত্রিক চরিত্র ছিল না। জোরালো আন্দোলনটা হয়েছিল মূলত এরশাদকে ফেলে দেওয়ার জন্য। শেষ পর্যন্ত আন্দোলনের ভাষা দাঁড়াল, ‘এরশাদ তুই কবে যাবি।’ মনে হলো, এরশাদকে ফেলে দিলেই একবারে স্বর্গ লাভ হবে। দেখা গেল কিছুই হলো না। এরশাদকে ফেলে দেওয়ার পর ১৯৯১ সালে এখানে বিএনপি সরকার হলো। সেই সরকার কী করল? তারাও ব্যাপক শোষণ করল, দমন করল। দেখা গেল সেই সময় থেকেই ছাত্ররাজনীতি গুন্ডাদের রাজনীতিতে পরিণত হলো। একানব্বই সালের পর থেকে একদিকে আওয়ামী লীগ, অন্যদিকে বিএনপি–উভয় দলই ছাত্ররাজনীতিকে ছাত্রবাহিনী থেকে গুন্ডাবাহিনীতে পরিণত করল। আজকের দিনে এখানে ছাত্ররাজনীতি বলতে আগেকার কোনো ঐতিহ্য আর নেই।

lসমাধান কী?

ll এই সমাধানের কাজ মূলত সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তির। সমাজতান্ত্রিক সরকার না এলে সমস্যার সমাধান হবে না। এমন অবস্থানে যখন জনগণ যাবে তখনই পরিবর্তন হবে। অন্যথায় ছিটেফোঁটা কিছু পরিবর্তন সম্ভব। অনেক চেষ্টাই করেছি, অনেক কিছুই হয়েছে, তবে কিছুই স্থায়ী হয়নি। আমাকে অনেকে এখনও বলে, ‘চুম্বক লোহাকে যেমন আকর্ষণ করে, আপনি তেমন কিছু করতে পারলেন না।’ আমি উত্তর দিই, বিষয়টা দ্বিপক্ষীয়। চুম্বক লোহাকেই আকর্ষণ করে, কাঠকে না। দেশের জনগণের অবস্থা যদি কাঠের মতোই হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে আর উপায় কী। স্বয়ং লেনিন এসেও কিছু করতে পারবেন না।

lমুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ এলেই অনেকে বলে থাকেন, সেই সময় আওয়ামী লীগের তেমন প্রস্তুতি ছিল না। অথচ তারা নেতৃত্বদানের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন। এই বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখেন?

ll আওয়ামী লীগের কোনো প্রস্তুতিই ছিল না। ২৫ মার্চ আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব সম্পূর্ণ কলাপস করল। এই কলাপসের কারণেই শেখ মুজিবকে আত্মসমর্পণ করতে হলো। শেখ মুজিবের গ্রেপ্তারকে আমি আত্মসমর্পণ বলি বলে আওয়ামী লীগের লোকেরা আমাকে গালাগাল করে। অথচ এটি আত্মসমর্পণ ছাড়া আর কিছুই ছিল না। পরিস্থিতি এমন যে ধরা পড়লে বিপদ। সে সময় তিনি বাড়িতে বসে থাকলে মিলিটারি তাঁকে ধরতো এটাই স্বাভাবিক। প্রত্যেকে বলে এটি গ্রেপ্তার। এটি এখন অনেক পরিচিত ব্যাপার, পালানোর সময় তাজউদ্দীনসহ অন্যরাও তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন যেন তিনিও আত্মগোপনে যান। তা না করে তিনি বাড়িতেই বসে থাকলেন। বাড়িতে বসে থাকার কারণ, তিনি এমন এক হতবুদ্ধিকর পরিস্থিতির মুখে পড়ে কী করবেন তা বুঝতে পারছিলেন না। সম্পূর্ণ কলাপস। তারপর যা ঘটলো, তা পৃথিবীর আর কোনো দেশের মুক্তিযুদ্ধে ঘটেনি। যারা লড়বে, তারা দেশের মাটি ছেড়ে পালালো। ফলে নেতৃত্ব ও লড়াইয়ের মাঠে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হলো। এমনটা কি কোনো দেশে হয়েছে? কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, কিউবা কোথাও এমন হয়েছে? যেমনটা বললাম, কমিউনিস্টরা যদি ঠিক পথে থাকত, তারা এই আন্দোলন ঠিকই এগিয়ে নিয়ে যেতে পারত। তবে তাদের দেউলিয়াপনার কথাও বললাম। এই কারণে তা সম্ভব ছিল না। শূন্যতা বেশিক্ষণ থাকে না। প্রকৃতিই শূন্যস্থান পূরণ করে দেয়। এখানেও সেই পূরণের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ছিল। আওয়ামী লীগের যারা ভারতে গেলো, তারা কোনো লড়াই করেনি। মুক্তিযুদ্ধ বলতে যা বোঝায়, তার আঙ্গিকে বিচার করলে দেখা যায়, তারা ভারতে গিয়ে দেনদরবার করল। বললেন, ‘তোমরা বাংলাদেশকে স্বাধীন করো এবং আমরা যা করব, তার জন্য সাহায্য করো।’ তাই এখানে ফ্যাক্টর হিসেবে ভারতের উপস্থিতিই রয়ে গেল। আওয়ামী লীগ সেখানে ভারতের সহযোগী শক্তি হিসেবে ছিল। বিস্ময়কর। আরও বিষয় হলো, তখন সিভিল সার্ভিসে থাকা অনেকেই বিদেশে থেকে সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছে, আবার স্বাধীনতার পক্ষে তদবিরও করেছেন। এই আমলারা কিন্তু লড়াই করেননি। তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা ঠিক রেখেই তারা যুক্ত ছিলেন। তাদের দিক থেকে বিষয়টা যুদ্ধ নয়, তদবিরের রাজনীতি হয়ে দাঁড়াল। এমন কথা কেউ কখনও শুনেছে? চীনে লড়াই হচ্ছে, নেতারা চীনের বাইরে গিয়ে তদবির চালাচ্ছেন? v

আরও পড়ুন

×