তাঁর ছায়ায় আমরা বড় হয়েছি
হাসান আজিজুল হক [২ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৯ – ১৫ নভেম্বর ২০২১]
আফসান চৌধুরী
প্রকাশ: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৫৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
হাসান আজিজুল হকের সঙ্গে প্রথম পরিচয় ঘটে তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ আত্মজা ও একটি করবী গাছের মাধ্যমে। তখন ঢাকা কলেজের ছাত্র। এখন কেমন জানি না, তবে আমাদের সময় ঢাকা কলেজের বেশ সুখ্যাতি ছিল। পড়াশোনার পাশাপাশি সাহিত্য ও রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত ছিলাম। বন্ধুদের কজনকে নিয়ে একটা দলমতোন ছিল, একটা সাহিত্যপত্রিকা করতাম, নাম–পূর্বপত্র। সেই সময় যারা একসঙ্গে ছিলাম তাদের ভেতর রয়েছে হাসান ফেরদৌস, মনজুরুল হক, ওয়াসী আহমেদ, শহীদুল জহির, খান মোহাম্মদ ফারাবি, দাউদ হায়দার–আমরা সবাই একসাথে । প্রচুর পড়তাম। পশ্চিমা বই সবচেয়ে বেশি পড়েছি। বাংলা সাহিত্য বলতে কবিতা বেশি পড়েছি, প্রবন্ধও কিছু পড়েছিলাম, তবে কথাসাহিত্য বেশি পড়া ছিল না। আমার ধারণা তখনও বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে সেই ব্যাপকতা, পরিপুষ্টতা আসেনি। যাঁদের পড়েছি তাঁদের ভেতর ছিলেন শওকত ওসমান (তিনি আমাদের শিক্ষকও ছিলেন ঢাকা কলেজে), সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ ও আরও কয়েকজন। তাঁদের পরের প্রজন্মের লেখকদের আমাদের তখনও পড়া হয়নি।
এ সময় টেলিভিশনে একটা অনুষ্ঠান হতো বই নিয়ে। সঞ্চালনা করতেন, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী–শহীদ মুনীর চৌধুরী। অপূর্ব বই আলোচনা করতেন! তাঁর আলোচনাগুলো কতখানি প্রভাবিত করেছিল তা আজকের দিনে এসে বুঝতে পারি। মুগ্ধ হয়ে শুনতাম সেই অনুষ্ঠান। জানি না আজকের দিনে এমন অনুষ্ঠান হয় কিনা। মুনীর চৌধুরী একটি পর্বে হাসান আজিজুল হকের ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ গল্পগ্রন্থ নিয়ে আলোচনা করতে বসে নামগল্পটি পড়ছিলেন। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম। দারুণ আবেগী হয়ে পড়ি বিশেষ করে শেষের দিকে এসে। মুনীর চৌধুরী নাটকের মানুষ। যে দক্ষতা ও সূক্ষ্মতা নিয়ে পড়ছিলেন বই থেকে একটি উদ্ধৃতি, তার তুলনা হয় না। পড়ার পাশাপাশি আলোচনা করছিলেন। সেই আলোচনা শুনে এতো মুগ্ধ হলাম যে পরদিনই সবাইকে বললাম, এই নামের একজন লেখক আছেন, আমরা এখনো তাঁকে পড়িইনি।
এটা উনিশশ ঊনসত্তরের কথা বলছি। তখন আমার বন্ধুবান্ধবেরাও কেউ তেমন শোনেনি তাঁর কথা।
আমরা, সম্ভবত আমিই, গিয়ে নিউমার্কেট থেকে বইটি কিনে আনলাম। পড়ে শেষ করে স্তব্ধ হয়ে যাই। এতো অসাধারণ গল্পগ্রন্থ! আত্মজা গল্পটির শেষাংশ চিরকাল মনে থাকবে। আমি মনে করি এর দুর্দান্ত ভাষার তুলনা কবিতা-সাহিত্যেও দুর্লভ। আমরা তাঁর ভক্ত হয়ে গেলাম। আমাদের ‘পূর্বপত্রের’ প্রথম সংখ্যার কাজ শেষ হয়ে এসেছে প্রায়। ঠিক করলাম দ্বিতীয় সংখ্যার জন্য হাসান আজিজুল হকের সাক্ষাৎকার নিতে হবে।
তখনকার দিনে যোগাযোগ করাটা আজকের মতো সহজ ছিল না। শুধু জানতাম তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। এটুকু তথ্যের ওপর ভর করেই যোগাযোগের পথ করে নিয়েছি। এরপর তাঁকে প্রশ্ন পাঠালাম। পাঁচ কি ছয়টা প্রশ্ন পাঠিয়েছিলাম। তখন বয়স কম, তাঁকেও মাত্রই পড়ছি। নানান অপরিপক্বতা ছিল। সবাই মিলে প্রশ্নগুলো তৈরি করেছিলাম। তাঁর ভাষার ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। আমার ওপর পশ্চিমা সাহিত্যের প্রভাব তখন প্রকট। তাঁকে সাহিত্যে ইম্প্রেশনিজম, এক্সপ্রেশনিজম নিয়ে প্রশ্ন করেছিলাম। হাসান আজিজুল হক আমাদের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন।
প্রশ্নের ধরনেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন বয়স কম, কলেজের ছাত্র আমরা। যত্ন করে উত্তর দিলেন। দুটো কথা এখনো মনে আছে। একটি হলো–উচ্চকণ্ঠে কোনো কিছু বলে মানুষের মনে দাগ ফেলা যায় না।
তাঁর সেই ভাবনা যে কতখানি পরিপক্বতার প্রকাশ ছিল তা আমরা পরে বুঝেছি। একাত্তরের পটভূমিতে লেখা একটা গল্প আছে আমার লেখা, ‘ধড়’। ধড় নিয়ে সিনেমাও হয়েছে আকা রেজা গালিবের পরিচালনায়। সিনেমাটি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিল। সে যাক, গল্পটি বেশ কিছু ভাষায় অনূদিত হয়। পাকিস্তানের করাচির একজন শিক্ষিকা বাংলাদেশে এসেছিলেন, তিনি দেখা করতে এসেছিলেন গল্পটি পড়ে। অনেকের মতো তিনিও বলেছিলেন, ‘এতো ভয়াবহ সব বাক্য, কিন্তু কী নিচু কণ্ঠে বলা। এটাই সবচেয়ে বেশি আঘাত করেছে।’
তীব্র কথা নিচু কণ্ঠে বলা, এটা হাসান আজিজুল হকের কাছে আমাদের শেখা। আমাকে তিনি প্রভাবিত করেছিলেন। আমার প্রথম উপন্যাস ‘বিশ্বাসঘাতকগণ’ পড়ে অনেকে মন্তব্য করেছিলেন ভাষায় হাসান আজিজুল হকের প্রভাব স্পষ্ট। প্রভাব শুধু আমার ভেতরই ছিল এমন নয়, বন্ধুদের অনেকের লেখার ক্ষেত্রেও এ কথা তখন সত্য। কারণ এটা কীভাবে সম্ভব যে এতো বড় শিল্পী তাঁর প্রভাব নিয়ে আমাদের লেখায় থাকবেন না?
তাঁর ওই কথা কয়েক প্রজন্মের লেখক-শিল্পীরা অনুসরণ করেছে।
দ্বিতীয় যে কথা তিনি বলেছিলেন তা হলো, ‘আমি দর্শনের অধ্যাপক হিসেবে এখনো কান্ট ও হেগেলের লেখায় পোকার মতো ঘুরে ঘুরে বেড়াই।’
কান্ট ও হেগেলের ভাষ্য বোঝা তো সহজ নয়। একবার পড়ে মনে হয়, বুঝলাম। কিছুক্ষণ পর মনে হয়, ঠিক বুঝেছি? বারবার তার কাছে ফেরত আসি। –এই যে চর্চার বিষয়টি। এটি আমাদের মতো শেষ কৈশোরে থাকা ছেলেগুলোর কাছে যেভাবে প্রকাশ করেছিলেন, তা ছিল অনন্য এবং আমাদের জন্যে দারুণ গুরুত্বপূর্ণ।
এরপর এলো সত্তর, তারপর একাত্তর। এর ভেতর তাঁকে আরো পড়েছি। তাঁর লেখা নিয়ে লিখেছিও। একাত্তরের পর, একাত্তরের ওপর প্রথম যে সাহিত্য পড়েছি তা হাসান আজিজুল হকের ‘নামহীন গোত্রহীন’। গল্পগুলো অতুলনীয়। সবসময় মনে হয়, হাসান আজিজুল হক ছোটগল্প দিয়ে বাংলাসাহিত্যকে যতখানি সমৃদ্ধ করেছেন তেমন খুব কম লেখক করতে পেরেছেন। আমাদের অর্জনগুলো মূলত ছোটগল্পে। উপন্যাসের চেয়ে বেশি। এ কথা বাংলা সাহিত্যের বাইরে বিশ্ব সাহিত্যেও খাটে অনেক ক্ষেত্রে। যেমন জেমস জয়েসের ‘ইউলিসিসে’ অনেক ভাবনা আছে কিন্তু ‘ডাবলিনার্সে’ যে জয়েসকে পাওয়া যায় তা আমার বিচারে শ্রেষ্ঠতর। আমাদের আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ক্ষেত্রেও কি এটা সত্য নয়? তাঁর বিখ্যাত উপন্যাসগুলোর চেয়েও ছোটগল্পগুলোর অর্জন বেশি আমি মনে করি। উপন্যাস কম অর্জন করেছে তা বলছি না। অনেক অর্জন করেছে। তবে ছোটগল্পের অর্জন অন্য মাত্রায়। উপন্যাসে একটা ‘ডেলিবারেশন’ এসে যায় : আমি এই কথাটি এভাবে বলব। এমন একটা ভাব প্রকাশ হয়েই পড়ে। ছোটগল্পে তা আসার সুযোগ নেই। ইলিয়াসের ‘মিলির জন্য স্টেনগান’-এর কথা মনে পড়ছে। সেই যে পাগল লোকটা ‘সুস্থ’ হয়ে উঠছে আর মিলি ‘অসুস্থ’ হয়ে পড়ছে, এখানে যে ট্রান্সিশন বা রূপান্তর /পরিবর্তন তা সরল নয়, তীর্যক। ছোটগল্পের এই সামর্থ্যের জায়গাটি বিশেষ। আর এটিকেই হাসান আজিজুল হকের মতো বিকশিত করতে খুব বেশি লেখক পারেননি।
মুক্তিযোদ্ধা ও চলচ্চিত্র আন্দোলনের অন্যতম পুরো ব্যক্তিত্ব খসরু ভাই (প্রয়াত কামরুল আলম খান) তখন যুদ্ধের সিনেমা করার কথা ভাবছেন। আমার সঙ্গে দেখা হলে বললাম, ‘আপনি পড়সেন নামহীন গোত্রহীন?’ খসরু ভাই বললেন, ‘নাতো, তুমি আমারে দাও।’ আমি বইয়ের দোকান চিনিয়ে দিলাম। তিনি বইটি কিনলেন। তিন দিন পর আবার যখন দেখা, ডেকে উঠলেন, ‘আফসান! আমি তো মোহিত! তুমি আমাকে আরো আগে বলোনি কেন?’ বললাম, ‘কী আশ্চর্য, আমি জানি নাকি আপনি পড়েন নাই?’ তিনি বললেন, ‘আমি হাসান আজিজুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি।’ বললাম, ‘আপনি তাঁর কাছ থেকে রাইট্ নেন ছবি করার জন্য।’ কদিন পর আবার খসরু ভাইয়ের সঙ্গে দেখা, বললেন, ‘আফসান, সব নেওয়া হয়ে গেছে, একেবারে কাগজে কলমে। আমি এটা নিয়ে ছবি করব এবং এটাই হবে আমার প্রথম ছবি।’ দুর্ভাগ্য, খসরু ভাই কোনো কারণে ছবিটা করতে পারেন নাই। কোনো ছবি করতে পারেন নাই।
নাম-গল্পটার একটা দৃশ্য মনে পড়ে, মাটি খুঁড়ছে বাবা, একটার পর একটা খুলি বের হচ্ছে। সেখানে আছে ‘ফেরা’র মতো গল্প (‘আমার পা ফেরত দাও’)! আগে এ ধরনের গল্প নিয়ে টেলিভিশনে কাজ হতো, এখন হয় না। আমার তো মনে হয় না আর কোনো গল্পে এভাবে একাত্তর এসেছে। এই গল্প গভীরভাবে অনুভব করতে পারি, কারণ এই মানুষগুলোই আমার সঙ্গীসাথী। যুদ্ধে অঙ্গহানি পরবর্তী সময়ে যুদ্ধের চেয়ে মানুষের কাছে বড় হয়ে যায়। আরেকটা গল্পে, মুক্তিযুদ্ধের পরে পটভূমি, একাত্তর পরবর্তী সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গল্প হতে পারে ওটাও। একটি মেয়ে, যুদ্ধে যাওয়া স্বামীর সংসারে খেতে পায় না, আরেকজনের কাছে চলে গেছে। এরপর ফেরত আসে। বলে, খেতে পায় না তাই চলে গিয়েছিল। ওর স্বামী বলে, আবার যদি তোকে খেতে দিতে না পারি, চলে যাবি? মেয়েটা বলে, আর যাব না।–কসম এরকম সাধারণ মানুষের যুদ্ধকালের জীবনের প্রকাশ বাংলাসাহিত্যে বিরল। বাংলাদেশের সাহিত্যে কতজন এটা এনেছে?
- বিষয় :
- হাসান আজিজুল হক
