ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জলের মতো ঘুরে ঘুরে

আমার এই সময়

আমার এই সময়
×

ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ

ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ

প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:০৮ | আপডেট: ১০ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:০৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গুরুদায়িত্ব পালনের দীর্ঘ দেড়টি বছর অবশেষে সমাপ্ত হলো। রাষ্ট্রের এই সুবিশাল দায়িত্বভার কাঁধ থেকে নামার পর মানসিকভাবে আমি এখন এক পরম স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছি। নিজেকে মনে হচ্ছে সম্পূর্ণ নির্ভার। অকপটে স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, এই দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা আমার জন্য আগাগোড়াই খুব একটা সুখকর ছিল না। কবে এই দায়িত্ব থেকে মুক্তি মিলবে, দিন গুনছিলাম। তবে যতদিন দায়িত্বে ছিলাম, নিজের সাধ্য অনুযায়ী কাজ করে গেছি। তবে এ নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলার এটা যথোপযুক্ত সময় নয়। দেশের রাজনীতি এখন বেশ উত্তপ্ত, নানা বিতর্ক চলছে। সংবেদনশীল বিষয়ে মন্তব্য করে অযথা কোনো নতুন বিতর্কের জন্ম দিতে চাই না। অদূর ভবিষ্যতে হয়তো এসব নিয়ে আমার বিস্তারিত লেখার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকার পরিচালনার সেই কঠোর শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে আমি ফিরে পেয়েছি আমার একান্ত আপন জগৎটিকে– আমার পেশাগত ও সৃজনশীল কাজের চিরচেনা ভুবন। এই জায়গাটিতেই আমি সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। লেখালেখি, গবেষণা, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের একাডেমিক জগতের সঙ্গে পুনরায় সেতুবন্ধন রচনা করা– এগুলোই আমার বেঁচে থাকার প্রাণবায়ু। এর বাইরে আমার অবসরের যে ছোট্ট-ছিমছাম সুন্দর একটি পৃথিবী আছে, সেখানে আমি আপন মনে আইপ্যাডের পর্দায় আঁকিবুঁকি করি, গুনগুন করে গান গাই। একসময় বিশ শব্দের কিছু অণুগল্প লিখেছিলাম। বছর দুয়েক আগে সমকালের ঈদ আয়োজনে সেগুলো প্রকাশিত হয়েছিল।
এই তো দিনদুয়েক আগে বসে বসে হঠাৎ একটা কবিতাও লিখে ফেললাম! আমি কবি নই, কিন্তু হঠাৎ করেই মনে হলো, চারপাশের এই যে রাজনৈতিক ডামাডোল– অন্তর্বর্তী সরকার কী করল, বিএনপি এখন কী করছে, ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগের পরিণতি কী হবে– দেশের সবাই যা নিয়ে ভাবছে তা থেকে বেরিয়ে গিয়ে অন্য কিছু ভাবা যায়। এর মধ্যে আবার সংঘাতের শিরোনামে এলো– ইরান যুদ্ধ এবং একইসঙ্গে নভোচারীদের চন্দ্রাভিযান।  

সেই ভাবনা থেকেই কবিতাটির উৎপত্তি। তবে ভূরাজনীতি, অর্থনীতির সম্পর্ক আমার একটি আগ্রহের গবেষণার বিষয়। বিশ্বব্যাপী নব্য-সাম্রাজ্যবাদের উত্থান, বিশ্ব অর্থনীতির আগ্রাসী বাজার ব্যবস্থা বা ‘হাইপার ক্যাপিটালিজম’ এবং ভূরাজনীতির সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক– এসব নিয়ে আগে থেকেই বিস্তর পড়াশোনা করি। 

একদিকে ইরান যুদ্ধ, অন্যদিকে চাঁদের উদ্দেশে মহাকাশযাত্রার খবর। বিক্ষিপ্ত কিছু ভাবনাকে ভাষায় রূপ দেওয়ার জন্য কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার অ্যাপের শরণাপন্ন হলাম এবং তার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে অবশেষে একটা কিছু দাঁড় করালাম। অতঃপর নিজের মতো করে ইংরেজি থেকে বাংলা। গদ্য না পদ্য সে বিষয়ে আমার কোনো সাহিত্য জ্ঞান নেই। –ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ

নভোচারীর চোখে বিপন্ন মায়াবী পৃথিবী

মহাকাশযানের ছোট জানালায় 
এক চিলতে কাচ,
সেখানে ফ্রেমবন্দি এক বিস্ময়ের 
নীল গোলক। 
সাদা মেঘের কারুকাজ আর নীলাভ গভীরতার আঁচলে ঢাকা, 
যেন কোনো পরম মমতায় মহাবিশ্ব তার কোলে আগলে রেখেছে।

এখান থেকে কোনো মানচিত্রের কাঁটাতার চোখে পড়ে না,
দেখা যায় না কোনো কৃত্রিম সীমান্ত,
অথবা রাষ্ট্রের রক্তচক্ষু,
এখানে অনুভবে নাই বর্ণবাদ, ধর্মের বিভাজন,
অথবা হিংসার পুরোনো বিষ– 
পুরোনো যে ঘৃণা ফিরে আসে নতুন মোড়কে
সর্ববিধ্বংসী মারণাস্ত্রের উচ্ছৃঙ্খল উন্মাদনায়। 

কী আশ্চর্য এ সময়ের উন্মাদনা!
ক্ষমতার দম্ভ হুমকি দিচ্ছে–
সহস্র বছরের সভ্যতার পীঠস্থানকে
গুঁড়িয়ে নাকি প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে দেবে। 
আমরা কি আসলে এগোচ্ছি? 
নাকি অন্ধ মোহে সবাই মিলে ছুটছি প্রস্তর যুগের দিকে?
যেখানে পাথরের বদলে হাতে মারণাস্ত্র,
আর শক্তির নীতিহীন আস্ফালন।

ভোগবাদী উন্নয়নের নেশা বুঝি আমাদের পেয়ে বসেছে,
প্রকৃতির সঙ্গে করছি চালাকি,
কেড়ে নিচ্ছি আগামী প্রজন্মের হিস্যা, অন্য প্রাণীর আশ্রয়স্থল। 
আসলে প্রকৃতির কোনো দায় নেই আমাদের কাছে,
সে দেখেছে অনেক সভ্যতার উত্থান-পতন,
এক সময়ের পৃথিবী দাবড়ে বেড়ানো বিক্রমশালী প্রাণিকুলের বিলুপ্তি।
প্রকৃতির প্রতি দায়টা আমাদেরই। 
অথচ আমাদের আস্ফালন যেন আমরাই এ ধরণির ঈশ্বর।

মহাকাশযানের ছোট জানালায় 
এক চিলতে কাচ,
সেখান ফ্রেমবন্দি এক বিস্ময়ের 
নীল গোলক–
একাকী, নিঃসঙ্গ, বড় বেশি মায়াবী।
এখান থেকে দেখা যায় না কোনো রাষ্ট্রের সীমারেখা,
কোনো বিভেদ, বিভাজন, হানাহানি,
শুধু আছে একটি অনিন্দ্য সুন্দর 
জ্বলজ্বলে মার্বেল গোলক।
আমরা তুচ্ছ অহংকারে ভুলে যাই–
মহাকাশের অতলান্ত কালো আঁধারে ভেসে থাকা
ওই নীল মার্বেলটিই আমাদের 
একমাত্র ঠিকানা, আশ্রয়। 
৬ এপ্রিল ২০২৬

এগুলো দীর্ঘদিনের গবেষণারই অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ নিয়ে দু-একটি বইও রয়েছে। এসব নিয়ে ইদানীংকালে আমার কিছু লেখালেখিও আছে।
সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের আগেই দুটো বই নিয়ে কাজ করছিলাম। বইগুলোর পাণ্ডুলিপি এবং প্রয়োজনীয় অনেক উপাদান বেশ কয়েকটি খাতায় নোট করা ছিল। এতদিন পর সেগুলো আবার বের করেছি। এর মধ্যে প্রথম বইটির শিরোনাম হলো– ‘হার্ড ফ্যাক্ট: রিফ্লেকশনস অন ডুয়িং ইকোনমিকস ইন বাংলাদেশ।’ এটি কোনো আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা থেকে বের করার ইচ্ছা আছে। এই বইটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সারাজীবনের কাজ, চিন্তা ও অভিজ্ঞতার এক ধরনের আত্মজীবনীমূলক চিন্তা-ভাবনা।

১৯৬৯ সালের শেষের দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে আমার কর্মজীবনের শুরু। এরপর কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করে ১৯৭৭-৭৮ সালের দিকে আমি দেশে ফিরে আসি। সেই থেকে আমার পুরো কর্মজীবন বাংলাদেশেই কেটেছে। তবে মাঝেমধ্যে কিছু সময় বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থায় ভিজিটিং পদে ছিলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণার সঙ্গে যুক্ত থেকেছি। তবে সেই শুরু থেকেই আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন নীতি-নির্ধারণী কমিটিতে, প্যানেলে বা কমিশনের সদস্য ও সভাপতি হিসেবে কাজ করে এসেছি। এগুলো কোনোটাই লাভজনক কোনো পদ ছিল না, পেশাগত দায়িত্ব পালনের তাগিদেই এসব করেছি। 

দেশেই স্থায়ীভাবে শিক্ষকতা ও গবেষণার কর্মজীবন কাটিয়েছি বলে অর্থনীতির চর্চাকে উন্নয়নশীল বিশ্বের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার চেষ্টা করেছি। সর্বশেষ আন্তর্জাতিকভাবে প্রকাশিত বই ‘মার্কেটস, মোরালস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট: পার্সপেক্টিভস ফ্রম দ্য পয়েন্ট অব ভিউ অব আ ডেভেলপিং কান্ট্রি’-তে আমি দেখানোর চেষ্টা করেছি অর্থনীতির শিক্ষা ও গবেষণায় পাশ্চাত্য বা উন্নত বিশ্বের মূলধারার অর্থনীতির তুলনায় আমাদের মতো দেশের প্রেক্ষাপটের কোথায় কোথায় ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন আছে। এ ক্ষেত্রে আমরা অনেক সময় শুধু পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণ করে যাই, কিন্তু পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় নীতি-নির্ধারণ– সব ক্ষেত্রেই যে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বাস্তবজ্ঞানের প্রয়োগ দরকার সেদিকে খেয়াল করা হয় না। এ বইটি অনেকাংশেই হলো এ বিষয় নিয়ে এক ধরনের আত্মজিজ্ঞাসা। একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে দেশের অর্থনীতি নিয়ে যেভাবে চিন্তা করেছি, সরকারকে যেসব পরামর্শ দিয়েছি বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের যা পড়িয়েছি, আজ পেছন ফিরে তাকালে আমি নিজেই খুঁজি– কোথায় কোথায় আমি ঠিক ছিলাম, আর কোথায় কোথায় অর্থনীতিবিদ হিসেবে ভুল করেছি। বলতে পারেন, এটি আসলে উন্নয়নশীল বিশ্বের নিরিখে অর্থনীতির চর্চা নিয়ে নির্মোহ মূল্যায়নের চেষ্টা।
দ্বিতীয় বইটি লিখছি বাংলায়। এর নাম– ‘অর্থনীতি: যুক্তি, তত্ত্ব ও চর্চা’। এটি এমন সহজবোধ্য ভাষায় লেখা, যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ছাত্রছাত্রীদের পাশাপাশি সাংবাদিক, পেশাজীবী বা নাগরিক সমাজের যে কেউ চাইলে অর্থনীতির জটিল ও নিরস বিষয়গুলো খুব সহজেই অনুধাবন করতে পারেন। অর্থনীতির অনেক কঠিন তত্ত্ব এবং খটমটে নিরস বিষয়গুলোকেও যে সহজ বাংলায় এবং চিত্তাকর্ষকভাবে উপস্থাপন করা যায় তার একটা পরীক্ষামূলক চেষ্টা করতে চাই বইটিতে। 

প্রচ্ছদ :: আনিসুজ্জামান সোহেল

অর্থনীতি কেবল কিছু শুষ্ক অঙ্ক, পরিসংখ্যান বা ডায়াগ্রাম নয়; এর সঙ্গে আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতার অনেক বিষয় গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। আমরা একটি বৈষম্যহীন ন্যায্য সমাজ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নির্মাণ করতে চাই। সম্প্রতি বাংলায় আরেকটা বই লিখেছিলাম–‘উন্নয়নশীল দেশের গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র’। চীন বা ভিয়েতনামের মতো সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর নিজস্ব বাজার অর্থনীতি আছে; কিন্তু আমরা যেহেতু গণতন্ত্রে বিশ্বাসী, তাই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও কাঠামোর ভেতরে থেকেই বাজার অর্থনীতিকে পরিচালনা করতে হবে। মুশকিল হলো, শুধু বাজার অর্থনীতির অন্ধ নিয়ম দিয়ে কখনও একটি বৈষম্যহীন সমাজ গঠন করা সম্ভব নয়। এ জায়গাতেই রাষ্ট্রকে তার সবচেয়ে বড় ও অভিভাবকসুলভ ভূমিকাটি পালন করতে হবে।

‘জুলাই সনদ’ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে, হচ্ছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলেছে। সবার অভিন্ন উদ্দেশ্য হলো একটি কার্যকর, জবাবদিহিমূলক, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণ। স্বাধীনতার এত যুগ পর এই সীমিত লক্ষ্য অর্জনের প্রচেষ্টাতেই আমরা আটকে আছি; কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হলেই যে অর্থনৈতিক ন্যায্যতা ও সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে এমন তো কথা নেই। এখানেই গণতন্ত্র, বাজার অর্থনীতি ও অর্থনৈতিক সাম্যের মধ্যে সমন্বয়ের জন্য প্রয়োজনীয় নীতি-নির্ধারণের বিষয় রয়েছে। এটা রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের বিষয় নয়, এ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব দর্শন ও কর্মসূচি থাকার কথা; যা দিয়ে দলগুলোকে মধ্য-বাম, মধ্য-ডান ইত্যাদিতে চিহ্নিত করা যায়। আগামীর রাজনীতিতে এ বিষয়গুলো সামনে আসতে হবে।
আমাদের প্রচলিত বাজার অর্থনীতিতে ‘বৈষম্যহীন অর্থনীতি’র কোনো একক ধারণা বা সংজ্ঞাও নেই। এটি একটি দার্শনিক বিতর্কেরও বিষয়। একটা মত হলো, সব নাগরিকের আত্মউন্নয়নের সমান সুযোগ থাকতে হবে। কিন্তু আরেকটি শর্তও এখানে যোগ করা যায়– শুধু সুযোগ থাকলেই হবে না, সুযোগ কাজে লাগানোর সক্ষমতাও থাকতে হবে। যেমন– ভারতে সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার নাগরিক দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সে দেশের সুপ্রিম কোর্ট প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার আদেশ দেন। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে যে, রাষ্ট্রের পক্ষে সব পরিবারের ন্যূনতম জীবিকা সংস্থান নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতার অনুরূপ আদেশ না থাকলে সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার এই সুযোগ কাজে লাগবে কী করে?

এই যে এত জটিল সব তত্ত্ব– সমাজ, রাষ্ট্র ও অর্থনীতির অন্তহীন টানাপোড়েন– এসবের কোলাহল থেকে মুক্তি পেতে দিনশেষে আশ্রয় নিই শিল্প-সাহিত্যের স্নিগ্ধ ছায়ায়। পুরোনো দিনের গান শুনি আর সাদা-কালো যুগের ধ্রুপদি সব সিনেমা দেখি। এসবের সঙ্গে মিশে আছে কম বয়সের অনেক মধুর স্মৃতি। সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেনের কালজয়ী চলচ্চিত্রগুলো আমি বারবার দেখি। এগুলো নিয়ে অন্যরা যখন লিখেছে, যেখানে অনেক অজানা গল্প রয়েছে, তা পড়তেও আমার খুব ভালো লাগে। সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ সিনেমাটার কথাই ধরুন না। উত্তম কুমারের সেই অবিস্মরণীয়, নিখুঁত অভিনয়! সিনেমাটির একটি দৃশ্যে ট্রেনের খাবার কামড়ায় শর্মিলা ঠাকুর উত্তম কুমারের কাছে অটোগ্রাফ চাইতে আসেন। এই যে অটোগ্রাফ চাওয়ার মুহূর্তটা, কলমটা হাতে নিয়ে উত্তম কুমারের দুবার মৃদু ঝাঁকি দেওয়া, কালি বের না হওয়ায় লেখা হলো না বলে আবার সেই কলমের নিব গ্লাসের পানিতে ভিজিয়ে নেওয়া– এই ছোট সূক্ষ্ম অভিনয়ের কাজটি নাকি মূল স্ক্রিপ্টে ছিল না। সত্যজিৎ রায় পরে উত্তম কুমারের এই স্বতঃস্ফূর্ত এক্সপ্রেশনটির প্রশংসা করেছিলেন।

আসলে শিল্পের এই ছোটখাটো ব্যতিক্রম-বিচ্যুতিগুলোই তার নিজস্ব সৌন্দর্যের অংশ। ঠিক যেমন আমাদের অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থা। অসংখ্য ত্রুটি-বিচ্যুতি, অপূর্ণতা, স্খলন আর গ্লানি নিয়েই আমাদের সমাজ। একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে হয়তো কাঠখোট্টা নিয়মে সেই ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলোর কার্যকারণ সম্পর্ক চিহ্নিত করার, তা সংশোধনের পথ খোঁজার চেষ্টা করি। কিন্তু দিনশেষে এই অপূর্ণ, অগোছালো পৃথিবীর সৌন্দর্যকেই উদযাপন করতে চাই। রাষ্ট্রের কঠোর দায়িত্ব থেকে ফিরে এসে তাই এই নিজস্ব সৃজনশীল ভুবনের ছোট্ট পরিসরেই আমি আজ সবচেয়ে বেশি প্রশান্ত। 
গ্রন্থনা: শাহেরীন আরাফাত

আরও পড়ুন

×