পুরোনো সেই দিনের কথা
মাহজাবিন আলমগীর
প্রকাশ: ১০ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
দ্রুত নগরায়ণ আর বিশ্বায়নের উদভ্রান্ত প্রতিযোগিতায় প্রতিনিয়ত গা ভাসাতে গিয়ে আমরা দিন দিন বৈশ্বিক নাগরিক হয়ে উঠছি। অন্যদিকে ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে আমাদের সংস্কৃতি। শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হতে নিজগৃহে যেন পরবাসী হয়ে উঠছি আমরা।
আমরা যারা আশি-নব্বই দশকে বড় হয়ে উঠেছি, তাদের কাছে স্কুল-কলেজের বার্ষিক পরীক্ষার পর শীতের ছুটি মানেই ছিল শিকড়ের টানে নিজের গ্রামের স্বজনদের কাছে ফেরা। নতুন গুড়ের নানা রকম মুখরোচক পিঠা, পায়েস ইত্যাদি বানিয়ে নানি-দাদিরা অপেক্ষা করতেন পরিজনদের জন্য। এখন সে অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে, শীতের ছুটিতে গ্রামের বাড়ির তুলনায় কক্সবাজার বা রাঙামাটিতে বেশি বেড়াতে যায়। যারা অতদূরে যায় না, তাদের জন্য হাতের কাছে নানা রকম রিসোর্ট তো রয়েছেই। চালের রুটি আর হাঁসের মাংস খাওয়ার জন্য এখন আর গ্রামে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। নগরজীবনে শীতের রাত যেন হয়ে উঠছে ছাদে ছাদে বারবিকিউ পার্টি, হৈ-হুল্লোড় আর শব্দবাজির। নিজেরা ফুর্তি করতে গিয়ে অন্যের ক্ষতি হলো কিনা, তা নিয়ে ভাবার সময় এখন কারও নেই। সামষ্টিক চিন্তাচেতনা থেকে মানুষ দিন দিন দূরে চলে যাচ্ছে।
এখনকার শিশু-কিশোরদের শৈশব ইট-কাঠ আর পাথরে বন্দি। শিশু-কিশোররা সিলেবাসের চাপে গাদা গাদা পাঠ্যবই পড়ে ঠিকই কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ নেই। তারা জানে না কোন গাছের পাতা কেমন, কোন পাখির রং কী। এসব চেনাতে আমরা নিয়ে যাই তাদের চিড়িয়াখানা বা বোটানিক্যাল গার্ডেনে। অথচ গ্রামবাংলার সবুজ প্রকৃতির সঙ্গে তাদের যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করি না। যতই আমরা আধুনিক হচ্ছি, গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের সঙ্গে তত দূরত্ব তৈরি করছি। এ প্রজন্মের শিশু-কিশোররা শর্ষে ইলিশ বা কচু শাকের ঘণ্ট খেতে ভালোবাসে না। তাদের পছন্দ চাওমিন, ফ্রায়েড রাইস বা স্যান্ডউইচের মতো ফাস্টফুড।
আজ থেকে দুই দশক আগেও কথায় কথায় বাইরে গিয়ে খাওয়াটা ভাবা যেত না। অনলাইনে অর্ডার করে বা বাইরে গিয়ে যখন তখন খাওয়া আজকাল এক ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। কয়েক বছর আগে গবেষণামূলক এক প্রতিবেদনে দেখা গিয়েছে, এ প্রজন্মের অধিকাংশই ৫০ বছর বয়সের মধ্যে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ভয়াবহ ঝুঁকিতে থাকবে শুধু ফাস্টফুডের প্রতি অতি আসক্তির কারণে।
আমাদের সমাজে আগেও অভাব ছিল, বেকারত্ব ছিল, কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে ছিল একটা শৃঙ্খলিত শালীনতা আর পরিমিতিবোধের উপস্থিতি। সেই শালীনতা আর পরিমিতিবোধের সংস্কৃতি কোথায় যেন আজ হারিয়ে গেছে। বিশ্বায়ন নামে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে আমরা প্রতি মুহূর্তেই কি বিসর্জন দিচ্ছি না নিজস্ব স্বকীয়তা আর শিকড়ের প্রতি আনুগত্য?
nমাহজাবিন আলমগীর: শিক্ষিকা
মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭
- বিষয় :
- স্মৃতি
