ছবির ভাষায় মানুষের ইতিহাস
রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর তোলা হয় মনে গেঁথে থাকা সেই ছবিটি
শুভ্র কান্তি দাশ
প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৫ | ০০:৫৪ | আপডেট: ১৬ আগস্ট ২০২৫ | ১৭:০৫
২০১৩ সালের রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর স্কুলের মাঠে ছবি তুলছিলাম। এক ছোট্ট মেয়ে এসে বলল, ‘আম্মার সাথে একটা ছবি তুলে দেন।’ চারপাশে এত লাশ, বাতাসে সেইসব লাশের গন্ধ। নিজেও মানসিকভাবে ক্লান্ত। সব মিলিয়ে প্রথমে ঠিক বুঝে উঠতে না পেরে মেয়েটিকে বলি, তোমার আম্মাকে নিয়ে আসো, তুলে দিচ্ছি ছবি। মেয়েটি দৌড়ে গিয়ে লেমিনেটিং করা একটি ছবি নিয়ে এসে বুকের কাছে ধরে সটান হয়ে দাঁড়াল আমার সামনে। সেই মুহূর্তে অনুভব করলাম আমি– এই জায়গাতে এসে সব ভেদরেখা মুছে যায়। থাকে শুধু গল্প ও স্মৃতি।
আমার জীবনে এ রকম মনের ভেতর দাগ কাটা বহু ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়েছে ছবি তুলতে গিয়ে, যা প্রতিনিয়ত নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছে।
নব্বই দশকে কাজিনের একটি ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলার মধ্য দিয়ে শুরু হয় এই যাত্রা। খুব ছোট থাকার কারণে বুঝিনি, সেটা আমার জীবনের সঙ্গে একেবারে জড়িয়ে গেছে।
স্কুল, কলেজের শিক্ষার পাঠ কক্সবাজারে শেষ হয় আমার। পরে ঢাকায় এসে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কম্পিউটার সায়েন্সে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করি। জীবিকার তাগিদে প্রথাগত চাকরিতে যোগ দিই টেলিকম সেক্টরে, হুয়াওয়েতে চাকরি করার মাধ্যমে। কিন্তু তখনও ভেতরে সেই ক্যামেরা, লেন্স, ছবি– এই তিনটি বিষয় কাজ করছিল। সেই তাড়না থেকেই ২০০৫ সালের শেষের দিকে প্রথম বেতনের টাকা দিয়ে কিনি নিজের ক্যামেরা। বলা যায়, সেই ক্যামেরা কেনার মধ্য দিয়েই শুরু আমার ফটোগ্রাফিক জার্নি।
প্রথাগত চাকরির গ্যাড়াকলে থাকলেও ২০০৯ থেকে ২০১২ সাল, এই তিন বছর চাকরির পাশাপাশি পাঠশালায় ফটোগ্রাফির বেসিক ও তিন বছরের পূর্ণাঙ্গ কোর্স শেষ করি– যা আমার ফটোগ্রাফিক জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে বড় ভূমিকা রাখে। পরে চাকরি ছেড়ে দিয়ে শুরু করি ছবি তোলা। ফ্রিল্যান্সিং কাজ করতে থাকি। সবারই তো একটা ইচ্ছা থাকে ভেতরে। ইচ্ছে ছিল ওয়ার ফটোগ্রাফার (যুদ্ধের আলোকচিত্রী) হওয়ার; কিন্তু ব্যাটে বলে সেভাবে মেলেনি। এভাবেই প্রায় ১০ বছর ধরে সংবাদমাধ্যমে কাজ করছি।
আসলে ফটোগ্রাফি আমার কাছে কেবল একটা পেশা নয়। এটা জীবনের সঙ্গে মিশে থাকা এক স্বপ্ন ও দীর্ঘ ভ্রমণ। এরই ধারাবাহিকতায় আমার জীবনে যুক্ত হয় ২০২৪-এর জুলাই আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থান। আমার ফটোগ্রাফি জীবনে যুক্ত হয় নতুন একটা পালক। তা হলো, ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির সোনালি মুহূর্ত– ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো পুরস্কার জয়। ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটোর ৭০তম বর্ষপূর্তিতে আয়োজিত এ প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হই আমি। ছবিটি তুলেছিলাম ৫ আগস্ট। সেদিন যখন দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টা ধরে একটি নির্দিষ্ট ভিজ্যুয়াল মুহূর্তের অপেক্ষায় ছিলাম আমি। মনে হচ্ছিল, এখানে আমি কিছু একটা পাব। এবং শেষে পেয়ে যাই ছবিটি। তবে আমি বিজয়ী হবো, এটা মানতে আমার একটু সময় লেগেছিল। এটা ছিল আমার প্রত্যাশার বাইরে। কারণ আমি সবসময় ছবিটাই তুলে গেছি। তা ছাড়া আরেকটা বিষয় হলো, একজন ফটোগ্রাফার যখন ক্যামেরার লেন্সে চোখ রাখেন কোনো মুহূর্ত ধারণ করার জন্য, ওই সময় তাঁর সামনে ধর্ম, গোত্র, রাজনীতি কিছুই থাকে না। থাকে শুধু ঘটনাটা।
আসলে ফটোগ্রাফি আমার কাছে এমন একটা কাজের জায়গা, যেখানে কালকে কী হবে তা জানা নেই। বরং বর্তমানের মুহূর্তটুকুই বাস্তব আমার কাছে। সেটাকেই লেন্সে বন্দি করতে ব্যস্ত থাকি আমি।
তবে ২০২৫-এ এসে আমি বলতে পারি, ফটোসাংবাদিকতার পথ অনিশ্চিত। প্রতিদিনই নতুন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে সামনে। সেই চ্যালেঞ্জগুলোর সামনে শুধু একটা ক্যামেরা ও বিশ্বাসটুকু নিয়ে আমি লড়ে যাচ্ছি। এই লড়াই চালিয়ে যেতে চাই বাকি জীবন। কারণ, ছবির ভাষায় মানুষের ইতিহাস তুলে ধরতে চাই আমি।
শ্রুতিলিখন: দ্রোহী তারা
