ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জীবনের কথা

জীবনের কথা
×

রাজধানীতে গৃহহীন এক কিশোরের এ ছবিটি জীবন আহমেদ ২০২১ সালের মে মাসে তোলেন

জীবন আহমেদ

প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৫ | ০০:৫৬ | আপডেট: ১৬ আগস্ট ২০২৫ | ১৭:০১

ক্যামেরার প্রতি নিছক টান থেকে বর্তমানে পেশাগত আলোকচিত্রী, যা সময়ের সঙ্গে রূপ নিয়েছে শহরের রাজপথের ঝড়ো দৃশ্যপটে। এখানে বিপদের মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস, মানুষের হাসি-কান্নার অন্তরঙ্গ মুহূর্ত ধরে রাখার মমতা, আর ছবি দিয়ে সময়কে বেঁধে ফেলার এক অদম্য প্রয়াস। 

২০০৭ থেকে ২০২৫। মোটামুটি এই সময়টুকুতে আমার জীবনের একমাত্র সঙ্গী ক্যামেরা। অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ড, টিএসসির ছবি তোলা কিংবা জুলাই গণঅভ্যুত্থান– এ ঘটনা আমাকে ছবি তোলার ক্ষেত্রে শক্তি জুগিয়েছে ঠিকই; কিন্তু তার পেছনে আরও যুদ্ধ রয়েছে আমার জীবনে। ছোটবেলার কথা বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয়, আমার শৈশব মোটেও সহজ ছিল না। অনেক ট্র্যাজেডি, অনেক দুঃখের স্মৃতি সঙ্গী হয়ে বড় হয়েছি। 

খুলনাতে এক স্থানীয় স্টুডিওতে কাজ শুরু করি আমি। সেই থেকে প্রথম ক্যামেরা, ল্যাব, ফিল্মের সঙ্গে পরিচয়। সেই ম্যানুয়ালি রোলের ক্যামেরার বিভিন্ন দিক প্রতিনিয়ত উন্মোচন করতাম নিজেই। এই হাতেখড়িই আমার ভবিষ্যতের ভিত্তি তৈরি করে দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক বেশি সাহায্য করে। 

ঢাকায় প্রথম পা রাখি সিটি কলেজের সামনে। উদ্দেশ্য ধানমন্ডির একটি কালার ল্যাব। নতুন আমি তখন। ধীরে ধীরে পরিচিত হতে থাকি এই জাদুর শহরের সঙ্গে। বিভিন্ন উৎসব-পার্বণ দেখতে থাকি। একজন বড় ভাইয়ের দোকান থেকে একটি ক্যামেরা কিনি। শুরু হয় আমার ফ্রিল্যান্সিং যাত্রা। হাঁটতাম আর শহরের জীবন পর্যবেক্ষণ করে তা লেন্সবন্দি করতাম। কোনো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ছিল না। এখনও নেই। বর্তমানে বেঁচে আছি। 

আমি সবসময় আমার নিজেতেই ছিলাম। কখনও দেশ, রাজনীতিতে থাকতে চাইনি; কিন্তু নিজের গণ্ডির বাইরে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে লেখক অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনা মোড় ঘুরিয়ে দেয় চিন্তার। আমি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলাম। খুব কঠিন, শোকাবহ পরিস্থিতিতে ছবি তুলতে হয়েছিল সে সময়। আমার তোলা ছবিগুলো মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমে। প্রশংসা যেমন এল; তেমনি সমালোচনা আর বিতর্কও পিছু নিল। বাধা পেরিয়ে সামনে এগিয়ে চললাম। তখন বুঝতে পারি, মানুষের জীবন ও মৃত্যুর মর্মাথ আসলে কী হতে পারে। আরও ভালোভাবে তা বুঝতে পারি জুলাই আন্দোলনের সময় নৃশংসতা ও বর্বরতা দেখে। 

পরপর দুটো পত্রিকাতে কাজ করে, দুবার ক্যামেরা হারিয়ে, অনেক কিছু শিখে, ঠেকে, মার খেয়ে, বুঝে শেষে ২০১৮ সালে মানবজমিনের সঙ্গে যুক্ত হই। এই কিছুদিন আগ পর্যন্ত সেখানেই ছিলাম। এখন আছি নেত্র নিউজে।

এ ছাড়া ২০২২ সালে বাংলাদেশ প্রেস ফটো কনটেস্টে ‘পাবলিক ইন্টারেস্ট জার্নালিজম ক্যাটেগরি’ বিভাগে পুরস্কার পাই আমি। এটিও আমাকে অনুপ্রেরণা জোগায় কাজের ক্ষেত্রে। যদিও একজন শিল্পীর কাছে তাঁর কাজই হচ্ছে একমাত্র অর্জন। তবুও এ রকম প্ল্যাটফর্মে পুরস্কার প্রাপ্তিও বড় বিষয়। 

সব থেকে ভালো লাগার বিষয়, আমার ছবি দেখে যখন কেউ প্রশংসা করে, তখন আমার পেছনের দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায়– যে বন্ধুর পথ আমি পাড়ি দিয়ে এ পর্যন্ত এসেছি। আমার কাছে ফটোগ্রাফি শুধু পেশা নয়; এটি আমার অস্তিত্বের অংশ। 

অস্তিত্বের অংশ হিসেবে ২০২০ সাল থেকে নেত্র নিউজের সঙ্গে গুম, হত্যা এসব বিষয় নিয়ে আন্ডার কভারে থেকে কাজ করি। এটিও আমার জীবনের একটি বড় অর্জন। 

আসলে ক্যামেরা আমার জন্য একদিকে রুটি-রুজির উপায়; অন্যদিকে পৃথিবীকে নিগূঢ়ভাবে দেখার তৃতীয় চোখ। খুলনার ছোট্ট গলি থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে ছবি প্রদর্শন, জীবনের প্রথম ফটো এক্সিবিশন– এই দীর্ঘ যাত্রা আমাকে শিখিয়েছে, যদি ধৈর্য থাকে, তাহলে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। 

আমার কাছে ক্যামেরা একমাত্র শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত। এই অস্ত্রের সহযোগিতায় আমি কয়েক হাজার লেখনীকে একটি মাত্র ছবি দিয়ে বুঝিয়ে দিতে পারব– যা আঙুল তুলে বাস্তবতা দেখাবে। 

আমার প্রতিটি ছবির পেছনে আছে একটা গল্প। কখনও তা সংগ্রামের, কখনও বেদনার, কখনওবা সীমাহীন আনন্দের। আমি চাই, আমার ছবির ভেতর দিয়ে মানুষ শুধু দৃশ্যই না, অনুভূতিও স্পর্শ করতে পারুক। এ কারণে প্রতিদিন নতুন করে ক্যামেরা হাতে বের হয়ে পড়ি। মনে হয়, সবচেয়ে সুন্দর ছবিটা হয়তো এখনও তোলা হয়নি আমার।

শ্রুতিলিখন: দ্রোহী তারা

আরও পড়ুন

×