ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রাকৃত সমাজের ডাক: বিষমুক্ত ভবিষ্যতের সূচনা

প্রাকৃত সমাজের ডাক: বিষমুক্ত ভবিষ্যতের সূচনা
×

প্রাকৃত সমাজের সংগঠক ব্রাত্য আমিন অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন

লাবণী মণ্ডল

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৫ | ১৯:৩২ | আপডেট: ৩০ আগস্ট ২০২৫ | ১২:৪৮

২২ আগস্ট, বেলা ৩টা। রাজধানীর সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রে তখন ‘প্রাকৃত সমাজ’-এর আয়োজনে এক অনন্য উচ্ছ্বাসমুখর পরিবেশ। বাইরে হয়তো নগরজীবনের ব্যস্ততা, কিন্তু ভেতরে জড়ো হয়েছেন প্রায় দেড়শ মানুষ; যাদের চোখে ও মুখে স্পৃহা একটাই– মানুষ ও প্রকৃতির মিলিত ভবিষ্যৎ গড়া। ‘প্রাকৃত সমাজের ডাক’ নামে এই আয়োজনে গান, আলোচনার উত্তাপ রাত সাড়ে ৭টা পর্যন্ত চলে। সময় গড়িয়েছে, কিন্তু কারও চোখে ক্লান্তি দেখা যায়নি। বরং প্রত্যেকের মধ্যে ছিল আবিষ্কারের আনন্দ– যেন নতুন কোনো সভ্যতার বীজ বোনা হলো এই আড্ডা-আলোচনার মাধ্যমে।

শিশিরভেজা ভোরে উঠোনে ঝরে পড়া শিউলি ফুল, ধানের জমিতে সোনালি রোদ– প্রকৃতির এই সহজ সৌন্দর্য আমাদের চিরচেনা। কিন্তু আজ চারপাশে তাকালে দেখা যায় আমরা ধীরে ধীরে প্রকৃতিকে হারাচ্ছি। নদী ভরাট, খাল দখল, বন উজাড়, কৃষিজমি সংকুচিত– সবই উন্নয়নের নামে ঘটছে। অথচ প্রকৃতি ছাড়া মানুষের টিকে থাকা অসম্ভব।

সভ্যতার চকচকে মোড়কের ভেতরে আজকের পৃথিবী এক অভূতপূর্ব সংকটে। প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে তত মানুষের ভেতরে বাড়ছে শূন্যতা। নদী শুকিয়ে যাচ্ছে, অরণ্য হারিয়ে যাচ্ছে, পাখিদের গান থেমে যাচ্ছে যান্ত্রিক শব্দে। অথচ সভ্যতার শুরুতে মানুষ প্রকৃতির কোলে জন্মেছিল; শিকড় তার বন, নদী আর মাটির ভেতরেই। এই শিকড়ের দিকে ফিরে তাকানোর ডাকই ‘প্রাকৃত সমাজের ডাক’। এমন সমাজ, যেখানে প্রকৃতি শুধু সম্পদ নয়, প্রাণের আত্মীয়; যেখানে মানুষ নিজেকে প্রকৃতির ঊর্ধ্বে মনে করে না; বরং প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে বাঁচতে শেখে। দ্বিজেন শর্মা লিখেছিলেন, ‘নতুন আরেকটি সভ্যতার কথা চিন্তা করতে হবে– যেখানে মানুষ আর প্রকৃতি মিলেমিশে থাকবে।’ উক্তিটি আমাদের ভবিষ্যৎকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়– উন্নয়নের নামে ধ্বংস নয়, প্রকৃতির সঙ্গে মিলিত উন্নয়ন।

প্রাকৃত সমাজের মানে হলো, মাটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক পুনর্নির্মাণ, সংযমী জীবন, প্রযুক্তিকে প্রকৃতিবান্ধব করে তোলা এবং প্রকৃতির অধিকার স্বীকার করা। মানবসভ্যতার টিকে থাকা নির্ভর করছে আমরা এই ডাক শুনতে পাই কিনা তার ওপর।

প্রাকৃত সমাজের সূচনা বক্তব্যে ব্রাত্য আমিন জানান, ১৯৩৭ সালে পৃথিবীতে মানুষ ছিল ২.৩ বিলিয়ন; ২০২০ সালে তা ৭.৮ বিলিয়নে পৌঁছেছে। একই সময়ে প্রাণবৈচিত্র্য কমেছে ৬৬ শতাংশ থেকে ৩৫ শতাংশে। আমরা যত উন্নত হচ্ছি, প্রকৃতিকে ততই ধ্বংস করছি। উন্নয়নের সুফল ভোগ করতে গিয়ে মানুষের নজর প্রাণ ও প্রকৃতির দিকে কমে গেছে। তিনি বলেন, “দেশে ডজনেরও বেশি টিভি চ্যানেল, শতাধিক পত্রিকা এবং সরকারি রেডিও ও টেলিভিশন চ্যানেল রয়েছে। কিন্তু ‘সর্বপ্রাণের মঙ্গল’ নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা নেই। যারা বলছে তারা বিচ্ছিন্ন। ফলে একটি সামগ্রিক পথ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।’’

প্রাকৃত সমাজের সংগঠক ইকবাল হোসেন জুপিটার বলেন, ‘প্রকৃতিকে অবহেলার ফলেই কৃষি আজ বিপর্যয়ের মুখে। ঋতুর অনিশ্চয়তা, অবিরাম বন্যা ও ঝড়-ঝাপ্টার কারণে প্রান্তিক কৃষকরা প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। টাঙ্গাইলের ভেড়াজানি বিলের মতো অঞ্চলে এক ফসলের ওপর নির্ভরতা, বিলের ধীর পানিপ্রবাহ, অসম সময়ে বীজতলা ও রোপণ– সব মিলিয়ে ফসলের নিশ্চয়তা প্রায় শূন্য। স্থানীয় বা আদি ধানের বীজ সংরক্ষণ ও পরীক্ষামূলক চাষের চেষ্টা সত্ত্বেও প্রকৃতির অপ্রত্যাশিত আক্রমণে ফলন নষ্ট হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে কৃষক যদি পেশা পরিবর্তন করেন, তখন দেশের খাদ্য ও কৃষি নিরাপত্তা বিপন্ন হবে। তাই বীজ সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার দায়িত্ব সম্মিলিত প্রচেষ্টায় টিকিয়ে রাখা ছাড়া কোনো উপায় নেই।’

আলোচকদের মতে, আমাদের নতুনভাবে ভাবতে হবে। প্রকৃতিকে জয় করে নয়; বরং প্রকৃতির অংশ হয়ে বেঁচে থাকার জীবনযাপন গড়ে তুলতে হবে। যেটি হবে ‘প্রাকৃত সমাজ’– যেখানে মাটি, পানি, বাতাস হবে দূষণহীন, প্রাণের ক্ষতি করা হয় না। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সবই প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

‘প্রাকৃত সমাজের ডাক’-এ যারা এসেছিলেন, তাদের জন্য ছিল প্রাকৃত চাষের সব খাবার– বিষমুক্ত লেবু, যবের ছাতু দিয়ে লাড্ডু, হাতে ভাজা মুড়ি এবং বিষমুক্ত কলা। সাভার থেকে এসেছেন এক প্রকৃতিপ্রেমী, তিনি মাশরুম নিয়ে কাজ করেন। তিনি জানান, ফেসবুকে প্রাকৃত সমাজের ডাকে সাভার থেকে এসেছেন। প্রাকৃত সমাজ তৈরি করতে না পারলে আগামী প্রজন্মের বিকাশে বড় বাধা হবে, তাই ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা বাড়াতে হবে।

সভা শেষে অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের আগ্রহ অনুযায়ী মত প্রকাশ করেন। কে পরিবেশশিক্ষা, কে বৃক্ষরোপণ, কে সাংস্কৃতিক জাগরণ নিয়ে ভূমিকা রাখবেন– সব স্পষ্ট করতে গিয়ে তৈরি হয় একটি খসড়া কমিটি। লক্ষ্য পরিষ্কার– নেতৃত্ব নয়, দায়িত্ব ভাগাভাগি; কাজ হবে প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতায়।

প্রাকৃত সমাজের ডাক আমাদের মনে করিয়ে দেয়– আমরা প্রকৃতির অংশ, এটি আমাদের মায়ের মতো। যত দূষণ ও ধ্বংস আমরা ঘটাই, ততই আমাদের ভবিষ্যৎ দুর্বল হয়। আলোচকরা বলেন, প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে বাঁচাই প্রকৃত সমৃদ্ধির চাবিকাঠি। আজকের এই আয়োজন কেবল শুরু। এই প্রাণবৈচিত্র্য যদি আমরা যত্নের সঙ্গে রাখি, আগামী প্রজন্ম পাবে একটি দূষণমুক্ত, বিষমুক্ত ও প্রাণসমৃদ্ধ পৃথিবী।

আরও পড়ুন

×