ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ক্যামেরাবন্দি হাহাকারের গল্প

ক্যামেরাবন্দি হাহাকারের গল্প
×

ছবি :: মোশফিকুর রহমান জোহান

মোশফিকুর রহমান জোহান

প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৫ | ০০:৫৮ | আপডেট: ৩০ আগস্ট ২০২৫ | ১২:৪৬

দীর্ঘদিন ধরে ‘মায়ের ডাক’-এর সঙ্গে কাজ করছি। ২০১৮ সালে দুটি পরিবারের সঙ্গে কথাও বলেছি। তখন আমার কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে ডকুমেন্টেশনের কাজটি করা হয়নি। পরে ২০২০ সাল থেকে এটি শুরু হয়। আমি এখন পর্যন্ত ছবি তুলেছি ২০টি পরিবারের। আমি গুম কমিশনে অভিযোগ জমা দিয়েছি ১১৭টির মতো। আমি প্রথমে অ্যাক্টিভিস্ট; এরপর আলোকচিত্রী। দুটির কারণে আলোকচিত্রে ওই ২০ পরিবারের বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। 

আমি দীর্ঘ মেয়াদে কাজ করতে চাই। কারণ প্রতিটি পরিবারের একটি প্রতিরোধের চিহ্ন খুঁজে বের করা, আর্কাইভিং বের করা, একটি প্যাটার্ন খুঁজে বের করার জন্য আমি একটু সময় নিয়ে কাজ করতে চাই। ঘটনাগুলো যেন অনেক বেশি বার্তাবাহক হয়, এটির জন্য চেষ্টা করছি।

গত ২২ আগস্ট থেকে শুরু হয়ে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত যে আলোকচিত্র প্রদর্শনী চলছে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে, তা মূলত গুম হওয়া পরিবারের স্মৃতি ও আর্তনাদ নিয়ে। ‘মেমোরিজ অব ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স’। পরিবারের স্মৃতি নিয়ে লড়াই। আমরা দেখছি যে, ৫ আগস্টের পর বেশ কয়েকজন মানুষ গুম থেকে ফেরত এসেছেন। তাদের বক্তব্য আমরা পেয়েছি। যারা ফেরত আসেননি, তাদের বক্তব্য হাজির করার জন্য আমাদের এই প্রদর্শনী। 

‘মায়ের ডাক’-এর পরিবার মানে প্রতিটি গুম পরিবার আলাদা আলাদা। আবার এই আলাদা পরিবারগুলো মিলে একটা পরিবার। প্রদর্শনীতে আসা দর্শনার্থীরা ছবিগুলো দেখে খুব বিস্ময় প্রকাশ করেন। পর্দার ফাঁক দিয়ে চশমা চোখে অপলক তাকিয়ে থাকা নারী, গুম হওয়া মানুষটির খোঁজে বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে প্ল্যাকার্ড হাতে অক্লান্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকা–সবকিছু মিলিয়ে যেন এক ভিন্ন বয়ান। গণঅভ্যুত্থান না হলে হয়তো এগুলো সেভাবে সামনে আসত না, আমরাও দেখতে পেতাম না আয়নাঘরের মতো ভয়াবহ জায়গাগুলো। যদিও গুমের বিষয়টি নতুন কিছু না, এটি বহু বছর ধরে চলে আসছে। জনসাধারণের সামনে আসেনি তেমনভাবে। এখন আসছে। একটি গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আমরা নিজেদের চাওয়াগুলো বলতে পারছি। এ ছবিগুলো তোলা আমার জন্য অনেক বেদনাদায়ক একটা সময় ছিল। মানুষগুলোর আবেগ, কষ্টগুলো ক্যামেরাবন্দি করেছি আমি। এমন অনেক সময় দেখা গেছে, পরিবারের সদস্যরা কথা বলতে বলতে কান্না করছেন। তাদের সেই কষ্ট দেখে আমি তখন নিজেকে সংবরণ করতে পারিনি। আমিও তাদের সঙ্গে কেঁদেছি। আপনজন হারানোর স্মৃতি বলতে গিয়ে তারা খুব ভেঙে পড়েন এত বছর পরও। এ বিষয়গুলো তো নেওয়ার মতো নয়, মানসিক যন্ত্রণাদায়ক। একজন আপাকে তাঁর স্বামী বলছেন, ‘চা এনে দাও, তোয়ালে এনে দাও’। এসব যে বলছেন, তা তিনি শুনতে পান।

আবার অন্য একজন আপা তাঁর স্বামীকে স্বপ্নে দেখেছেন যে, তিনি শুয়ে আছেন। আপা তাঁকে প্রশ্ন করেন, ‘আমরা তোমাকে সারাদিন খোঁজ করি আর তুমি শুয়ে আছো। তখন তাঁর স্বামী বলেন, তুমি আমাকে কীভাবে খুঁজতেছ? তুমি তো আমাকে ভালোভাবে খুঁজতেছ না। তুমি যদি ভালো করে খোঁজো, তাহলে ঠিকই পাবে। এই স্বপ্ন দেখে তিনি আগের মতো আবার রাস্তায় দাঁড়ানো শুরু করেন। এ রকম আরও বহু ঘটনার সম্মুখীন হয়েছি আমি। তাই সবসময় সচেতন থাকতাম যে–এ রকম সেনসেটিভ বিষয়গুলো নিয়ে তাদের প্রশ্ন করার ক্ষেত্রে। সরাসরি প্রশ্ন না করে কথোপকথনের মাধ্যমে তথ্য জানতাম। তবে প্রদর্শনী করতে পারব না–এটি ভাবিনি কখনও। কারণ, আমার মনে হয়েছে কাজটা যেভাবেই হোক করতে হবে, যত প্রতিকূলতাই আসুক না কেন। পরিবারগুলোর সঙ্গে থাকতে থাকতে একটি সময় হয়েছে যে, এটি আমার পরিবার। পরিবারের প্রতি আমার দায়বদ্ধতার জায়গা আছে। সেই জায়গা থেকে কাজটা করা।

২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর মধ্যরাতে কাওসার হোসেনকে নাখালপাড়ার বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় র‍্যাব পরিচয় দিয়ে। কাওসার হোসেন স্বেচ্ছাসেবক দল করতেন। নিখোঁজ হওয়ার আগে চার বছর আট মাসের সংসার জীবন ছিল কাওসার-মিনু দম্পতির। এক মাত্র মেয়ে মীম তিন বছর বয়স থেকে বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত। ৫ আগস্টের পর নতুন করে আশায় বুক বাঁধেন গুম হওয়া কাওসার হোসেনের স্ত্রী মিনু আক্তার। 

মিনুর দৃঢ় বিশ্বাস, তাঁর স্বামী বেঁচে আছেন। আমরা আয়না ঘরে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছি এবং আয়না ঘরে আমরা প্রতিটি দেয়ালের ছবি তোলার চেষ্টা করেছি। সেখানে আমরা দেখেছি যে, দিন গণনা, পরিবারের সদস্যদের নম্বর, নাম। আমি ‘মিনু’ নামটা একটি দেয়ালে দেখতে পাই। সেই ‘মিনু’ আবার ওই ওয়ালটা দেখে ছুঁয়ে অনুভব করার চেষ্টা করেছেন। ওই দেয়াল থেকে তাঁর স্বামীর গন্ধ নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। মিনুর মতো অন্যান্য পরিবারের এ রকম আশা আর অপেক্ষার চিহ্নগুলোই ক্যামেরায় ধারণ করার চেষ্টা করেছি।

আরেকটা স্মৃতি হলো–ওই পরিবারগুলোর বাচ্চাদের আর্তনাদ। তারা আসলে অপেক্ষা করে। যেমন–কথা বলতে বলতে দেখতাম যে, তারা বারবার বলে, আমি তো ২০১৩ সালেই আছি। কারণ তাঁর স্বামী হয়তো ২০১৩ সালে গুম হয়েছেন। আমি মনে করি এই যে স্মৃতির প্রতিরোধ এবং এই স্মৃতিগুলোই যে আমার মাঝে বারবার আসছে–আমি চাই এই স্মৃতিগুলো যেন মানুষের মাঝেও আসে। এই জন্য আলোকচিত্র প্রদর্শনী জরুরি। এর মাধ্যমে যেন ওই গুম হওয়া মানুষগুলো অন্য সহনাগরিকের মাঝে, তাদের স্মৃতিতেও জায়গা করে নিতে পারে; যা আমাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে গুমের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সাহস ও শক্তির জোগান দেবে।

আরও পড়ুন

×