ঢাকা রোববার, ০৭ জুন ২০২৬

কাঠের চশমায় নতুন ক্রেজ

কাঠের চশমায় নতুন ক্রেজ
×

আশরাফুল ইসলাম আকাশ

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৫ | ০৭:০৭ | আপডেট: ১৪ অক্টোবর ২০২৫ | ২১:৪২

| প্রিন্ট সংস্করণ

রাসেল জায়েদী ও খসরু সুমন। শৈশব, কৈশোর থেকে যৌবন–দুই বন্ধুর দীর্ঘ পথচলা। সম্পর্কের গভীরতা থেকে পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন উদ্যোক্তা হবেন। সুযোগটা আসে ২০২১ সালে। কভিড পরিস্থিতির মধ্যেই দুই বন্ধুর প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে ‘রোদচশমা’। শুরুটা প্লাস্টিকের চশমা দিয়ে। এখন তারা তৈরি করছেন আকর্ষণীয় নকশার কাঠের ফ্রেমের চশমা, যা বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। তাদের উদ্যোক্তা যাত্রা নিয়ে লিখেছেন আশরাফুল ইসলাম আকাশ

শুরুটা অফিসের বারান্দা থেকে
কভিড পরিস্থিতিতে তখন দেশের অবস্থা শোচনীয়। ঘরে বসে কোনোমতে নিত্যসামগ্রীর চাহিদা মেটানো গেছে। তবে দোকানে গিয়ে চশমার সেবা পুরোপুরি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। মূলত ভাবনাটা তখনই আসে। নিকেতনের একটি অফিসের বারান্দায় বসে সিদ্ধান্ত পাকাপাকি করেন। এরপর বাল্যকালের বন্ধু ও চক্ষু বিশেষজ্ঞ সুমনকে নিয়ে ব্যবসায় নেমে গেলেন রাসেল জায়েদী। শুরুতে ঢাকার পাটুয়াটুলী থেকে প্লাস্টিকের চশমা সংগ্রহ করতেন। পরে ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী পণ্যগুলো হয় হোম ডেলিভারি।

নিজেদের পণ্য তৈরি করতে হবে
প্লাস্টিকের চশমায় বেশ সাড়া পেলেও আত্মতুষ্টি আসছিল না দুই উদ্যোক্তা বন্ধুর। ভাবলেন তারা স্রেফ একটি চাইনিজ পণ্য বিক্রি করছেন। অন্যের ব্র‍্যান্ডকে প্রোমোট করছেন। বেশকিছু দিন সময় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন নিজেরাই চশমা তৈরি করবেন। সেখান থেকেই হাতে তৈরি কাঠের চশমার চিন্তা বেরিয়ে আসে।

বিদেশিনীর চ্যালেঞ্জে বদলে গেল সব
সালটা ২০২৩। স্পেন থেকে ঢাকা এলেন এক নারী ব্যবসায়ী। তাঁর ব্যবসা মূলত গার্মেন্টস পণ্য। তবে নিয়মিত চশমা ব্যবহারকারী। পরিবেশ সচেতন ওই নারীর চোখে ছিল আর্জেন্টিনার একটি কাঠের চশমা। পরিচয়ের সুবাদে সেই পণ্য পরখ করার সুযোগ এলো জায়েদীর। তিনি বলেন, ‘ওই বিদেশি নারী ব্যবসায়ীর চোখে যে চশমা ছিল, ওটা বোর্ড ম্যাটেরিয়াল দিয়ে তৈরি। আমরা এর চেয়েও ভালো চশমা বানাতে পারব, সেটি কাঠ দিয়ে। যেই চ্যালেঞ্জ, সেই কাজ। কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে তাঁর হাতে তুলে দিলাম স্মুথ থিকনেসের কাঠের চশমা। ওই নারীর সঙ্গে দেখা হওয়াটাই ছিল আমাদের টার্নিং পয়েন্ট; যা আমাদের পরবর্তী ধাপে নিয়ে যায়।’

যে প্রক্রিয়ায় তৈরি হচ্ছে কাঠের চশমা
শুরুতে খোলা বাজার থেকে চেরাই কাঠ সংগ্রহ করা হয়। এরপর সেগুলো যায় কারিগরদের হাতে। সেখানে নকশা এঁকে মেশিনের সাহায্যে আকৃতি দেওয়া হয়। ঘুণ কিংবা বিভিন্ন ধরনের ড্যামেজ এড়াতে লম্বা সময় কাঠগুলো গরম পানিতে সেদ্ধ করে ওভেনে পাঠাতে হয়। তারপর কাঠের তৈরি বিশেষ একটি ফর্মাতে আটকে দেয় কারিগররা। ফ্রেমটি বাঁকানো হয়ে গেলে তা বের করে শিরিষ কাগজের সাহায্যে স্মুথনেস দিতে হয়। সব শেষ প্রক্রিয়া হিসেবে পলিকার্বনেট ইউএভি পাওয়ার লেন্স কিংবা রঙিন গ্লাস বসানো হয়। পুরো প্রক্রিয়ায় ১৮ থেকে ২২ দিন চলে যায়। 

ধরবে না ঘুণে, চোখে থাকবে ২০ বছর
রোদচশমার পণ্য তৈরিতে ব্যবহার হচ্ছে বার্মাটিক কাঠ। শুরুতে সেগুন, মেহগনি, নিমসহ বিভিন্ন কাঠ দিয়ে চেষ্টাও করেন তারা। তবে আউটলুকের কারণে তা মনে ধরেনি উদ্যোক্তাদের। মূলত বার্মাটিক কাঠের যে টেক্সচার লুক, এটি অন্য কাঠে আনা সম্ভব হচ্ছিল না। এ কারণেই এ কাঠের ব্যবহার। উদ্যোক্তার দাবি, কাঠ ও চশমা তৈরির প্রক্রিয়ার কারণে ঘুণে ধরা কিংবা ড্যামেজ হওয়ার আশঙ্কা নেই। কিছুটা নষ্ট হলে তা রিপেয়ার করা গেলে অন্তত ২০ বছর ব্যবহার করা যাবে। 

নিজস্ব নকশার চশমা, হয়েছে কর্মসংস্থান
রোদচশমার দক্ষিণ বাড্ডার আউটলেটে এখন ২১ মডেলের চশমা পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে তাদের নিজস্ব নকশার ছয়টি চশমা পাওয়া যাচ্ছে। নিজেদের দেশীয় ভাইব ছড়িয়ে দিতে ধানশালিক, বসন্ত বাউরি, পানকৌড়ি, রাজহংস নামের চশমা বিক্রি করছেন। এছাড়া চাপ সামলাতে অন্তত ১৫ জন যুবকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে; যারা এখানে বসেই নিজেদের ভাগ্যের চাকা ঘোরানোর স্বপ্ন দেখছেন।

দেশের চশমা যাচ্ছে বিদেশে
দেশের তৈরি কাঠের চশমা যাচ্ছে বিদেশের মাটিতে। রোদচশমার হাতের তৈরি পণ্য নিয়মিত যাচ্ছে ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে। এছাড়া অ্যামাজন অস্ট্রেলিয়াতে পাওয়া যাচ্ছে চশমাগুলো। আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরোপের মুক্ত বাজার ধরতে এখনও কিছু ধাপ অতিক্রম করতে হবে রোদচশমার উদ্যোক্তাদের।  

প্রি-অর্ডার ছাড়া মিলছে না চশমা
গত দুই বছর ঢিমেতালে ব্যবসাটা চললেও হঠাৎই জোয়ার আসে সেপ্টেম্বরে। পরিস্থিতি এখন এমন দাঁড়িয়েছে রোদচশমা থেকে কাঠের ফ্রেমের চশমা কিনতে হলে প্রি-অর্ডার করতে হবে। সেটিও অন্তত এক মাস আগে। রাসেল জায়েদী জানালেন, গত মাসেও তারা যতটুকু চশমা উৎপাদন করতেন, সেখান থেকে বিক্রি হতো ৩০-৪০ শতাংশ। এখন শুধু উৎপাদনই বেড়েছে ৬-৭ গুণ। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সেই সংখ্যা আরও বাড়াতে চান।

চ্যালেঞ্জ ও অভিজ্ঞতা
প্লাস্টিক পণ্যের সঙ্গে কাঠের ফ্রেমের চশমার বাজার বেশ চ্যালেঞ্জিং। স্বাস্থ্যগত দিকটা অনেকেই দেখছেন না। রাসেল জায়েদী বলেন, ‘অল্প সময়ে যেভাবে সাড়া পেয়েছি, তাতে আমরা অভিভূত। ক্রেতাকে সর্বোচ্চমানের পণ্য নিশ্চিতের মাধ্যমে ব্র্যান্ড ভ্যালু তৈরি করতে চাই। এর মধ্য দিয়েই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হবে।’

আরও পড়ুন

×