প্রকৃতির বন্ধু গন্ধগোকুল
পাবনার সাঁথিয়া উপজেলা থেকে গন্ধগোকুলের এই ছবিটি তুলেছেন জালাল উদ্দিন
জালাল উদ্দিন
প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬ | ০৬:৫২
| প্রিন্ট সংস্করণ
সন্ধ্যা নামলেই চারপাশ ম-ম করে পোলাওয়ের মিষ্টি গন্ধে। অথচ আশপাশের কোনো বাড়িতেই পোলাও রান্না হয়নি! কোথা থেকে আসছে এই সুবাস? উৎস খুঁজতে গিয়ে হয়তো আপনার চোখে পড়বে এক অদ্ভুত প্রাণী, যার গা থেকে ছড়াচ্ছে এই মনমাতানো গন্ধ। এই প্রাণীটির নাম গন্ধগোকুল।
এক সময় দেশের প্রায় সব জায়গায় এদের দেখা মিললেও, আজ এরা বিপন্নপ্রায়। তবে, পাবনার বেড়া পৌর এলাকার বৃশালিখা, মৈত্রবাধা, আলহেরা নগর, জোড়দহ-বাঙালবাড়িয়া, দাসপাড়া, হাতিগাড়াসহ বেশ কয়েকটি মহল্লায় এখনও এদের অবাধ বিচরণ চোখে পড়ে।
প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক আন্তর্জাতিক জোট (আইইউসিএন)-এর বিবেচনায় গন্ধগোকুল এখন ‘বিপন্ন’ প্রাণীর তালিকায়। বেড়া উপজেলায় এরা ‘নেল’ বা ‘বাগডাশ’ নামেও পরিচিত। গন্ধগোকুল মূলত নিশাচর প্রাণী। এদের শরীর থেকে নিঃসৃত রসের কারণেই এমন পোলাওয়ের মতো গন্ধ ছড়ায়, যা দিয়ে এরা নিজেদের সীমানা নির্ধারণ করে।
বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, গন্ধগোকুল প্রকৃতির এক পরম বন্ধু। ইঁদুর, ব্যাঙ ও ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে এরা ফসলের উপকার করে। এমনকি প্রিয় খাবারের তালিকায় থাকা বট বা অন্যান্য ফলের বীজ এদের পরিপাকতন্ত্র হয়ে মলের সঙ্গে বেরিয়ে আসার পর শতভাগ অঙ্কুরোদগম হয়। অর্থাৎ, বন সৃষ্টিতে এদের রয়েছে বিশাল অবদান।
একসময় গ্রামাঞ্চলে বা বনজঙ্গলে এদের প্রচুর দেখা মিললেও, আজ এরা বিলুপ্তির পথে। এর মূল কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি বিষয়কে চিহ্নিত করেছেন–
১. গন্ধগোকুল কখনও কখনও হাঁস-মুরগি বা কবুতর ধরে নিয়ে যায়। এই কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে অনেক মানুষ ফাঁদ পেতে এদের হত্যা করে।
২. বড় বড় গাছ ও ঝোপঝাড় কেটে ফেলার কারণে এদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে।
৩. রাস্তা পার হওয়ার সময় গাড়ির নিচে চাপা পড়েও অনেক গন্ধগোকুল মারা যায়।
সারাদেশে গন্ধগোকুলের সংখ্যা কমলেও, বেড়া পৌর এলাকায় এদের দেখা মেলে বেশ ভালো সংখ্যাতেই। স্থানীয়রা জানান, এখানকার বেশির ভাগ মানুষই প্রাণীটিকে পছন্দ করে এবং গত ১০-১২ বছরে জানামতে কেউ এদের ক্ষতি করার চেষ্টা করেনি। বেড়া পৌর এলাকার অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক শিখা রাহা জানান, তাঁর বাড়ির ছাদে প্রায়ই গন্ধগোকুল দেখা যায়। তিনি বলেন, ‘সন্ধ্যা হলেই অনেক সময় পোলাওয়ের গন্ধ পাই। কখনও কখনও এদের দুই-তিনটি একসঙ্গে যাতায়াত করতে দেখি। কয়েক মাস আগে আমার ছাদবাগানের ঝোপের মধ্যে দুটি বাচ্চাও দেখেছিলাম।’
বেড়ার মনজুর কাদের মহিলা কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী অধ্যাপক আবদুস সালাম বলেন, ‘দেশের অনেক জায়গা থেকে গন্ধগোকুল বিলুপ্ত হতে বসেছে। তবে বেড়া পৌর এলাকায় এদের বিচরণ যেমন কিছুটা বেশি, তেমনি পৌরবাসীও এদের প্রতি সহানুভূতিশীল।’
রাজশাহী বিভাগীয় বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অধিদপ্তরের বন্যপ্রাণী পরিদর্শক জাহাঙ্গীর কবির জানান, প্রাণীটির অস্তিত্ব এখনও দেশের বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে এবং বেড়া পৌর এলাকায় এদের বিচরণ কিছুটা বেশি বলে তিনি শুনেছেন। তিনি প্রাণীটি রক্ষায় সবার সহযোগিতা কামনা করেন।
বেড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘বাগডাশ বা গন্ধগোকুল মানুষের কাছাকাছি থাকে ঠিকই, কিন্তু মানুষ দেখলে খুব ভয় পায়। এটি খুবই লাজুক স্বভাবের প্রাণী। আবাসভূমি ধ্বংস এবং হাঁস-মুরগি বাঁচানোর জন্য ব্যাপকভাবে হত্যার কারণে এরা আজ প্রায় বিপন্ন। অথচ এরা প্রকৃতির বন্ধু। তাই আমাদের সবার উচিত এদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া।’
গন্ধগোকুল আমাদের প্রকৃতির এক অমূল্য সম্পদ। এদের বিলুপ্তি আমাদের বাস্তুতন্ত্রের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। ভুল ধারণা থেকে মুক্ত হয়ে প্রাণীটিকে রক্ষায় সবার কার্যকর অংশগ্রহণ জরুরি। এদের প্রতি সহানুভূতিশীল হলে হয়তো একদিন আবারও আমাদের আশপাশে পাওয়া যাবে গন্ধগোকুলের মিষ্টি সুবাস।
- বিষয় :
- প্রকৃতি
