তেলাপিয়ার চামড়া
পোড়া ক্ষতের চিকিৎসায়
ব্রাজিলের ‘ড. হোসে ফ্রোটা ইনস্টিটিউট’ নামক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে প্রথমবারের মতো মানুষের ওপর এই তেলাপিয়ার চামড়ার সফল পরীক্ষামূলক প্রয়োগ চালানো হয়
রফিকুর রহমান প্রিয়াম
প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬ | ০৬:৫১
| প্রিন্ট সংস্করণ
অগ্নিদগ্ধ বা পুড়ে যাওয়া রোগীদের শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। প্রথাগত চিকিৎসায় প্রতিদিন ক্ষতের ড্রেসিং বা ব্যান্ডেজ পরিবর্তন করার তীব্র ব্যথা এবং সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকি রোগীদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তোলে। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক অভাবনীয় ও সাশ্রয়ী আবিষ্কার এই চিত্রকে পুরোপুরি বদলে দিচ্ছে। সাধারণ তেলাপিয়া মাছের চামড়া এখন ব্যবহৃত হচ্ছে পুড়ে যাওয়া মানুষের ক্ষত নিরাময়ের এক জাদুকরী বিকল্প বা ‘জৈবিক ড্রেসিং’ হিসেবে। এই নতুন পদ্ধতি দগ্ধ রোগীদের যেমন দিচ্ছে ব্যথাহীন আরোগ্য, তেমনই বাঁচাচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থ।
এই যুগান্তকারী চিকিৎসা পদ্ধতির উদ্ভাবন ঘটে লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিলে। ২০১৪ সালের দিকে ব্রাজিলের ফেডারেল ইউনিভার্সিটি অব সিয়ারা-এর একদল বিজ্ঞানী ও গবেষক প্রথম এই বিষয়টি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। এই গবেষণার মূল নেতৃত্বে ছিলেন প্রখ্যাত বার্ন বিশেষজ্ঞ ড. এডমার ম্যাকিয়েল এবং গবেষক ড. ওডোরিকো ডি মোরাইস। তারা লক্ষ্য করেন, ব্রাজিলের নদী ও খামারগুলোতে প্রচুর পরিমাণে তেলাপিয়া মাছ উৎপাদিত হলেও এর চামড়া সাধারণত বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ব্রাজিলের ফোর্টালেজা শহরের বিখ্যাত ‘ড. হোসে ফ্রোটা ইনস্টিটিউট’ নামক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে প্রথমবারের মতো মানুষের ওপর এই তেলাপিয়ার চামড়ার সফল পরীক্ষামূলক প্রয়োগ চালানো হয়। এই ইনস্টিটিউটটিই পৃথিবীর বুকে প্রথম তেলাপিয়া চামড়ার মাধ্যমে মানুষের পোড়া ক্ষত নিরাময়ের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করে।
মানুষের কৃত্রিম ত্বক বা গবেষণাগারে তৈরি ড্রেসিং অত্যন্ত ব্যয়বহুল, যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। বিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখেছেন যে, তেলাপিয়া মাছের চামড়ার গঠন মানুষের ত্বকের কোষীয় বিন্যাসের সঙ্গে আশ্চর্যজনকভাবে মিলে যায়। তেলাপিয়া মাছের চামড়ায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ‘টাইপ-১ কোলাজেন’ নামক প্রোটিন। এই কোলাজেন মানুষের শরীরের নতুন ত্বক তৈরি করতে এবং ক্ষত দ্রুত শুকাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ড্রেসিং হিসেবে ব্যবহারের আগে তেলাপিয়ার চামড়াকে গবেষণাগারে বিশেষ রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত করা হয়। এর ফলে মাছের সমস্ত ক্ষতিকর অণুজীব ধ্বংস হয়ে যায় এবং আঁশটে গন্ধ পুরোপুরি দূর হয়ে যায়। জীবাণুমুক্ত করার পর এই চামড়া দেখতে অনেকটা স্বচ্ছ এবং নমনীয় প্লাস্টিকের মতো মনে হয়। যখন একজন দগ্ধ রোগীর দ্বিতীয় বা তৃতীয় মাত্রার ক্ষতের ওপর এই চামড়াটি বসিয়ে দেওয়া হয়, তখন এটি একটি প্রাকৃতিক আবরণের মতো কাজ করে। এটি ক্ষতস্থান থেকে তরল বের হয়ে যাওয়া বন্ধ করে এবং চামড়াকে শুকিয়ে যেতে দেয় না।
প্রথাগত চিকিৎসার সঙ্গে তেলাপিয়া মাছের চামড়ার ড্রেসিংয়ের তুলনা করলে এর কার্যকারিতা সহজেই অনুধাবন করা যায়। সাধারণ চিকিৎসায় ক্ষতের ওপর রুপা মিশ্রিত মলম লাগিয়ে প্রতিদিন বা প্রতি দুই দিন পর পর ড্রেসিং পরিবর্তন করতে হয়, যা রোগীর জন্য অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। অপরদিকে, তেলাপিয়া মাছের ড্রেসিং একবার ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দিলে তা ক্ষত শুকানো পর্যন্ত, সাধারণত ৯ থেকে ১৮ দিন পর্যন্ত আর পরিবর্তনের প্রয়োজন হয় না। বারবার ব্যান্ডেজ পরিবর্তনের এই ঝামেলা না থাকায় রোগীর ব্যথার মাত্রা নাটকীয়ভাবে কমে যায়।
তেলাপিয়া চামড়ার এই সফল ব্যবহার শুধু মানুষের বুকেও সীমাবদ্ধ থাকেনি, এটি বন্যপ্রাণীদের জীবনও বাঁচিয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার ভয়াবহ দাবানলের সময় বেশ কিছু বন্য ভালুক এবং পাহাড়ি সিংহ গুরুতরভাবে পুড়ে গিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ইউসি ডেভিস বিশ্ববিদ্যালয়ের পশু চিকিৎসকরা এই পোড়া প্রাণীদের পায়ে তেলাপিয়া মাছের চামড়া দিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিয়েছিলেন। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রাণীগুলো সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে আবার বনে ফিরে যেতে সক্ষম হয়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই চমকপ্রদ সাফল্য সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে যখন এটি জনপ্রিয় আমেরিকান টিভি ধারাবাহিক ‘দ্য গুড ডক্টর’-এ ফুটিয়ে তোলা হয়। ধারাবাহিকের প্রথম মৌসুমের একটি পর্বে মূল চরিত্র ড. জ্যারেড কালু একজন ভয়াবহভাবে পুড়ে যাওয়া রোগীর চিকিৎসায় এই তেলাপিয়া মাছের চামড়া ব্যবহারের প্রস্তাব করেন এবং তা সফলভাবে প্রয়োগ করে দেখান। এছাড়া ‘গ্রে’স অ্যানাটমি’ ধারাবাহিকেও এই চিকিৎসার বৈজ্ঞানিক দিকগুলো সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়।
সবচেয়ে আশার কথা হলো, আমাদের বাংলাদেশেও মাছের চামড়া থেকে ক্ষত নিরাময়কারী উপাদান তৈরির গবেষণা চলছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগ এবং সাভারের পরমাণু শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের টিস্যু ব্যাংকিং ও বায়োমেটেরিয়াল গবেষণা ইনস্টিটিউট যৌথভাবে তেলাপিয়া মাছের চামড়ার কোলাজেন, মানুষের অ্যামনিওটিক ঝিল্লি এবং থানকুনি পাতার নির্যাস মিশিয়ে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী নিরাময়কারী জেল তৈরি করেছে, যা গবেষণাগারে সফলভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে।
এছাড়া বুয়েটের রাসায়নিক প্রকৌশল বিভাগের গবেষক নাফিসা ইসলাম ও তানজিনা তারান্নুমের দল স্থানীয় শোল মাছের ফেলে দেওয়া চামড়া থেকে কোলাজেন পেপটাইড বের করে ক্ষতের ব্যান্ডেজ হিসেবে ব্যবহারের জন্য একটি বিশেষ হাইড্রোজেল তৈরি করেছেন।
তেলাপিয়া মাছের চামড়া ড্রেসিংয়ের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর অবিশ্বাস্য কম খরচ। যেহেতু এটি মাছের বাজারের একটি ফেলনা অংশ বা বর্জ্য, তাই এর কাঁচামাল সংগ্রহ করতে কোনো বাড়তি খরচ হয় না। প্রক্রিয়াজাতকরণের খরচও অত্যন্ত সীমিত। ব্রাজিলের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তেলাপিয়ার চামড়া ব্যবহারের ফলে প্রথাগত পোড়া চিকিৎসার তুলনায় সামগ্রিক চিকিৎসা ব্যয় প্রায় ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়।
- বিষয় :
- চিকিৎসা
