ভবিষ্যতের উপযোগী ব্যবসায়িক মডেল ‘ফিউচার-ফিট’
কারখানায় এখন ‘কোবট’ (কোলাবরেটিভ রোবট) ব্যবহার করছে ইউনিলিভার বাংলাদেশ
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ | ১৪:২১
ব্যবসা-বাণিজ্যের চিরচেনা জগৎটা গত কয়েক বছরে খুব দ্রুত বদলে গেছে। একসময় যা ছিল কেবল অভিজ্ঞতা আর অনুমানের ওপর নির্ভরশীল, আজ তা হয়ে দাঁড়িয়েছে তথ্য ও প্রযুক্তির এক নিখুঁত সমীকরণ। যেকোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সময়ের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়া। তবে কিছু প্রতিষ্ঠান থাকে, যারা কেবল যুগের সঙ্গে তাল মেলায় না, বরং ভবিষ্যতের ব্যবসায়িক যাত্রার নেতৃত্ব দেয়। তারা বিশ্বাস করে, আধুনিকতা কোনো গন্তব্য নয়, বরং এটি একটি নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া।
প্রযুক্তির এই সুশৃঙ্খল ব্যবহারে যখন কোনো প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটে, তখনই জন্ম নেয় ভবিষ্যতের উপযোগী একটি ব্যবসায়িক মডেল– যাকে বলা যায় ‘ফিউচার-ফিট’। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ব্যবসায়িক রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে ইউনিলিভার বাংলাদেশ। তাদের এই পথচলা কেবল যান্ত্রিক উৎকর্ষের নয়; বরং কারখানা থেকে শুরু করে ভোক্তার হাত পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে রয়েছে এক টেকসই পরিবর্তনের গল্প।
কারখানার নতুন রূপ
রূপান্তরের এই গল্পের শুরুটা হয় কারখানায় পণ্য উৎপাদনের একদম প্রথম ধাপ থেকে। ১৯৬৪ সালে আনুষ্ঠানিক যাত্রার শুরু থেকেই চট্টগ্রামের কালুরঘাটে অবস্থিত ইউনিলিভারের কারখানাটি আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছে। তবে সময়ের প্রয়োজনে এখন সেখানে প্রতিনিয়ত যুক্ত হচ্ছে আরও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। আগে যেখানে ম্যানুয়াল লাইনের ওপর কিছুটা নির্ভরতা ছিল, সেখানে এখন ধাপে ধাপে জায়গা করে নিচ্ছে উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন ও স্মার্ট প্রযুক্তি।
ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেমের মাধ্যমে এখন মুহূর্তেই মেশিনের পারফরম্যান্স ও পণ্যের মান যাচাই করা যাচ্ছে। এর ফলে একই সময়ে আগের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে, যা সরাসরি প্রতিষ্ঠানের অপারেশনাল দক্ষতা বৃদ্ধি করেছে। এই আধুনিকায়ন কেবল উৎপাদন ক্ষমতাই বাড়ায়নি, বরং ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনার বৈশ্বিক লক্ষ্য, অর্থাৎ টেকসই উন্নয়নের পথেও বড় ভূমিকা রাখছে।
এরই অংশ হিসেবে কারখানায় এখন ‘কোবট’ (কোলাবরেটিভ রোবট) ব্যবহার করছে ইউনিলিভার বাংলাদেশ। পণ্য প্যাকিং করা কিংবা মান যাচাইয়ের মতো কাজগুলোতে এই প্রযুক্তি এখন কর্মীদের বড় সহযোগী, যা মানুষের ভুল কমিয়ে নিখুঁত উৎপাদনে সাহায্য করছে।
অনুমানের বদলে তথ্য
কারখানা থেকে পণ্য যখন দেশের প্রায় ১৪ লাখ ক্ষুদ্র ও মাঝারি দোকানের বিশাল ও বিচ্ছিন্ন বাজারে পৌঁছায়, তখন চ্যালেঞ্জটা দাঁড়ায় নিখুঁত সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার। আগে এই পুরো প্রক্রিয়াটি চলত মূলত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আর অনুমানের ভিত্তিতে। কিন্তু ইউনিলিভার এই প্রথাগত সরবরাহ ব্যবস্থাকে একটি সুশৃঙ্খল ও ডেটা-চালিত কাঠামোতে নিয়ে আসতে উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়েছে।
এর একটি শক্তিশালী উদাহরণ হলো ‘আইকিউ নেক্সাস’ নামের নিউরাল নেটওয়ার্কভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম। এটি বর্তমানে দেশজুড়ে প্রায় ৫ লাখ ক্ষুদ্র ও মাঝারি দোকানদারের ব্যবসার ধরনে আমূল পরিবর্তন এনেছে। এটি প্রতিদিনের বিক্রয় তথ্য ও বাজারের আচরণ বিশ্লেষণ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চাহিদার পূর্বাভাস দেয়।
পাইলট প্রজেক্টে দেখা গেছে, এই সিস্টেম ব্যবহারের ফলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের হার ৭১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আউটলেটের বিক্রি প্রায় ১৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এটি মূলত মজুত ও বিক্রির মধ্যে নিখুঁত ভারসাম্য নিশ্চিত করে নগদ প্রবাহকে স্থিতিশীল করেছে, যা একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মানুষ ও সিস্টেমের মেলবন্ধন
টেকসই রূপান্তর তখনই সম্ভব, যখন ফিউচার-ফিট প্রযুক্তি এবং মানুষ একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। প্রযুক্তি মানুষের বিকল্প নয়, বরং মানুষের সক্ষমতা বাড়ানোর হাতিয়ার। এ বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়ে ‘ডিজি-অপস’ ও ‘সিটিজেন ডেভেলপার’ প্রোগ্রামের মাধ্যমে কর্মীদের প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তুলতে বড় বিনিয়োগ করছে ইউনিলিভার বাংলাদেশ। এখানে মূল লক্ষ্য প্রযুক্তিকে এমনভাবে ব্যবহার করা, যাতে কর্মীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরও নিখুঁত এবং দ্রুততর হয়।
বাংলাদেশ যখন দ্রুত ডিজিটাল অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, ইউনিলিভারের এই উদ্যোগ মূলত বৈশ্বিক উদ্ভাবনকে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়ার এক ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। কারখানা থেকে দোকান– প্রতিটি স্তরে প্রযুক্তির এই সুশৃঙ্খল প্রয়োগ কেবল উৎপাদনশীলতাই বাড়াচ্ছে না, বরং এটি একটি আধুনিক, ফিউচার-ফিট এবং টেকসই ব্যবসায়িক ইকোসিস্টেম তৈরির অনন্য কারিগর হিসেবে কাজ করছে।
- বিষয় :
- ইউনিলিভার বাংলাদেশ
- কারখানা
- উৎপাদন
