ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

ঘর হারানোর শঙ্কায় বন্যপ্রাণেরা

ঘর হারানোর শঙ্কায় বন্যপ্রাণেরা
×

জলাশয় ভরাট এবং দূষণের ফলে ফড়িংরা আজ আবাসভূমি হারিয়েছে; এটি মশাসহ নানা ক্ষতিকর পোকামাকড়ের আধিপত্য বাড়ার এক নীরব সতর্কবার্তা

আশিকুর রহমান সমী

প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬ | ০৬:৫০ | আপডেট: ০৬ জুন ২০২৬ | ২০:৫৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

উন্নয়নের কংক্রিটে মোড়ানো ঢাকা শহরে এখন আর খুব একটা ফড়িংয়ের দেখা মেলে না। অথচ খুব বেশিদিন আগের কথা নয়। ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের দিকেও এই শহরে অন্তত ৫০ প্রজাতির ফড়িংয়ের রাজত্ব ছিল। আজ সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ৩৭-এ। শহরের জলাশয়গুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় এবং দূষণের মাত্রা বাড়ায় ফড়িংরা আজ তাদের নিজস্ব আবাসভূমি হারিয়েছে। ফড়িংয়ের এই বিদায় শুধু একটি পতঙ্গের হারিয়ে যাওয়া নয়, বরং মশাসহ নানা ক্ষতিকর পোকামাকড়ের আধিপত্য বাড়ার এক নীরব সতর্কবার্তা। বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হলেও, এ ছোট ভূখণ্ডেই একসময় ছড়িয়ে ছিল পাহাড়ি চিরসবুজ বন, শালবন, ম্যানগ্রোভ, হাওর-বাঁওড়, বাইদ আর বিস্তীর্ণ তৃণভূমির মতো বৈচিত্র্যময় আবাসস্থল। এ বৈচিত্র্যই জন্ম দিয়েছিল এক অসাধারণ জীববৈচিত্র্যের। কিন্তু বর্তমানে বন্যপ্রাণীদের অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের এই জন্মভূমির ধ্বংস, খণ্ডিতকরণ এবং গুণগত মানের ব্যাপক অবনতি। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো ‘আবাসস্থল বিশেষায়িত’ প্রাণীরা। নির্দিষ্ট উদ্ভিদ, জলজ পরিবেশ বা ঘাসভূমির ওপর নির্ভরশীল এই প্রাণীরা পরিবেশের সামান্য পরিবর্তনেই আজ দ্রুত বিলুপ্তির খাদে গিয়ে পড়ছে।

সবুজ মরুভূমি
আমাদের বন ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘকাল ধরে একটি বড় ভ্রান্তি রয়ে গেছে। একটি প্রাকৃতিক বনকে কেবল ‘গাছের সমষ্টি’ বা কাঠ উৎপাদনের কারখানা হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। ফলে প্রাকৃতিক বন উজাড় করে সেখানে আকাশমণি বা ইউক্যালিপ্টাসের মতো বিদেশি দ্রুতবর্ধনশীল গাছ লাগানো হয়েছে। এর ফলে আমরা হারিয়েছি শত শত দেশীয় বৃক্ষ, ঝোপঝাড়, লতাগুল্ম আর জলাধারের সমন্বয়ে গড়া এক জটিল ও প্রাণবন্ত বাস্তুতন্ত্র। সরকারি অর্থায়নে ও জনগণের করের টাকায় ভুলভাবে পরিচালিত এই বনায়ন মূলত বন্যপ্রাণীদের বাস্তুচ্যুত করারই আরেক নাম। দেশীয় লতাগুল্ম ও বুনো উদ্ভিদ নির্মূল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে প্রজাপতির প্রজনন ক্ষেত্র। আট বছর আগেও ঢাকা শহরে ১৩৭ প্রজাতির প্রজাপতি পাওয়া যেত। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, এই সংখ্যা এখন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। শুধু প্রজাপতি নয়– মৌমাছি, বোলতা ও গুবরে পোকার মতো পরাগায়নকারী পতঙ্গও আজ হুমকির মুখে; যা আমাদের কৃষিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এক বিশাল অশনিসংকেত।

বিপন্ন জলাভূমি
জলাভূমির অবস্থা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। শাপলা, শালুক, নলখাগড়া বা হোগলার মতো দেশীয় জলজ উদ্ভিদকে প্রায়ই ‘আগাছা’ মনে করে ধ্বংস করা হচ্ছে। অথচ এসব উদ্ভিদই অসংখ্য মাছ, ব্যাঙ, ফড়িং আর জলচর পাখির আশ্রয়স্থল। ব্যাঙের সংখ্যা দ্রুত কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের ওপর। একটি ব্যাঙ তার জীবদ্দশায় বিপুল পরিমাণ কৃষিক্ষতিকর পোকা খায়। জলাভূমি ভরাট ও কীটনাশকের প্রভাবে ব্যাঙ কমে যাওয়ায় ফসলের ক্ষেতে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগ করতে হচ্ছে। অন্যদিকে, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নষ্ট হওয়া ও দূষণের কারণে দেশের ৭০ শতাংশ মিঠাপানির কচ্ছপ আজ বিলুপ্তির মুখে। শীতকালে আমাদের হাওর ও নদীতীর লাখ লাখ পরিযায়ী পাখির কলকাকলিতে মুখর থাকলেও, জলাভূমি সংকোচন ও মাছ চাষের আগ্রাসনে সে চিত্র আজ ফিকে হয়ে আসছে। পরিযায়ী তো বটেই, দেশীয় পানকৌড়ি, ডাহুক, জলমুরগি বা শামুকখোলও আজ ভয়াবহ আবাসস্থল সংকটে।

সবখানেই অস্তিত্ব সংকট 
বাংলাদেশের তৃণভূমি ও বাইদ অঞ্চলগুলো সবচেয়ে অবহেলিত। হাতি, শিয়াল, বন বিড়াল বা মেছো বিড়ালের মতো প্রাণীদের জন্য এসব এলাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মেছো বিড়াল মূলত জলাভূমি ও জলসংলগ্ন পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল। ঘাসভূমিগুলো কৃষিজমি বা বসতিতে রূপান্তরিত হওয়ায় এদের আবাস বিলীন হচ্ছে। অন্যদিকে নদীর দূষণ, নাব্য হ্রাস ও অতিরিক্ত নৌযান চলাচলের কারণে কমছে নদীকেন্দ্রিক জীববৈচিত্র্যের অন্যতম প্রতীক শুশুক।

উল্লুক, লজ্জাবতী বানর বা মুখপোড়া হনুমানের মতো প্রাইমেটরা বন খণ্ডিত হয়ে যাওয়ার কারণে আজ একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন। হাতির ঐতিহাসিক বিচরণভূমিতেও জবরদখল চলছে। আমাদের সংরক্ষণ কার্যক্রমের বড় অংশ এখনও কেবল প্রজাতিকেন্দ্রিক। অথচ আধুনিক সংরক্ষণ জীববিজ্ঞানের মূলনীতি হলো আবাসস্থল সংরক্ষণ। একটি প্রাকৃতিক বন বা সুস্থ জলাভূমি রক্ষা করতে পারলে বাঘ বা হাতির পাশাপাশি অগণিত পাখি, সরীসৃপ ও অণুজীবও রক্ষা পায়। 

লেখক: শিক্ষক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×