ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

যুদ্ধ ও সশস্ত্র সংঘাত

পরিবেশের শোষণ প্রতিরোধ

পরিবেশের শোষণ প্রতিরোধ
×

বিশ্বের সর্ববৃহৎ পারমাণবিক বোমা সোভিয়েত আমলের ‘জার বোম্বা’

রফিকুর রহমান প্রিয়াম

প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:৩৬ | আপডেট: ০৩ নভেম্বর ২০২৫ | ১৩:০০

| প্রিন্ট সংস্করণ

হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে ‘লিটল বয়’ ও ‘ফ্যাট ম্যান’ নামক পারমাণবিক বোমা বিপর্যয়ের ৮০ বছর পর বিশ্ব আজও নিরাপদ নয়; বরং এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। রাশিয়া-ইউক্রেনের বিধ্বংসী যুদ্ধ, যেখানে পারমাণবিক হুমকি এখন রাষ্ট্রীয় কৌশলের অংশ, তাইওয়ান নিয়ে পরাশক্তিদের দ্বন্দ্ব এবং ইরানের ওপর সামরিক হামলার অস্থিতিশীল পরিস্থিতি–এই সবকিছুই প্রমাণ করে, একটি ভুল পদক্ষেপ পৃথিবীকে ভয়াবহ পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে। এমন এক সময়ে ৬ নভেম্বর পালিত হবে ‘যুদ্ধ ও সশস্ত্র সংঘাতে পরিবেশের শোষণ প্রতিরোধের আন্তর্জাতিক দিবস’, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যুদ্ধের সবচেয়ে নীরব শিকার পরিবেশ।

২০২৫ সালের শুরুর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ৯টি দেশের কাছে আনুমানিক ১২,২৪১টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে। রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতেই রয়েছে বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ পারমাণবিক অস্ত্র। উভয় দেশই নিজেদের অস্ত্রভান্ডারকে আরও আধুনিক ও শক্তিশালী করার জন্য বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেখানে নতুন সেন্টিনেল মিসাইল, কলাম্বিয়া-শ্রেণির সাবমেরিন এবং বি-২১ রাইডার স্টেল্থ বোমারু বিমান মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি তৈরি করছে, সেখানে রাশিয়াও সারমাট আইসিবিএম এবং পারমাণবিক শক্তিচালিত বুরেভেস্টনিক ক্রুজ মিসাইলের মতো বিধ্বংসী অস্ত্র মোতায়েন করছে।

তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এনেছে চীন। দেশটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে তার পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। চীনের অস্ত্রাগারে এখন প্রায় ৬০০টি ওয়ারহেড রয়েছে এবং প্রতি বছর প্রায় ১০০টি নতুন ওয়ারহেড যুক্ত হচ্ছে। প্রায় ৩৫০টি নতুন মিসাইল সাইলো নির্মাণের মাধ্যমে চীন ২০৩০-এর দশকের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা রাশিয়ার সমকক্ষ হওয়ার পথে হাঁটছে, যা ক্ষমতার বৈশ্বিক ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে। এই ভয়ংকর প্রতিযোগিতা এমন এক সময়ে ঘটছে যখন পরাশক্তিদের মধ্যে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের শেষ চুক্তিটিও (নিউ স্টার্ট) ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে শেষ হতে চলেছে, যার পর পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যাপারে অনেক ক্ষেত্রেই আর কোনো আইনি সীমাবদ্ধতা থাকবে না।   

ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী পারমাণবিক বোমা ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘জার বোম্বা’, যা ১৯৬১ সালে পরীক্ষা করা হয়েছিল। এর ক্ষমতা ছিল ৫০ মেগাটন, যা হিরোশিমার বোমার চেয়ে প্রায় ৩,৮০০ গুণ বেশি। এর বিস্ফোরণের আলো ১,০০০ কিলোমিটার দূর থেকেও দেখা গিয়েছিল এবং ভূকম্পন তরঙ্গ পৃথিবীকে তিনবার প্রদক্ষিণ করেছিল। রাশিয়ার আধুনিক ‘স্যাটান-২’ (আরএস-২৮ সারমাট) মিসাইল একাধিক ওয়ারহেড বহন করতে সক্ষম।   

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রাগারে থাকা সবচেয়ে শক্তিশালী বোমা হলো বি৮৩, যার ক্ষমতা ১.২ মেগাটন, যা হিরোশিমার বোমার চেয়ে ৮০ গুণ বেশি ধ্বংসাত্মক। একটি মাত্র বি৮৩ বোমার আঘাতে একটি বড় শহর মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে পারে। 

চীন তার পারমাণবিক শক্তি বাড়াচ্ছে মূলত মার্কিন হস্তক্ষেপ ঠেকানোর জন্য। যদি যুদ্ধ শুরু হয়, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনের মূল ভূখণ্ডে ব্যাপক হারে হামলা চালাতে পারে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই সংঘাতে পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কা রয়েছে।

যুদ্ধ ও সশস্ত্র সংঘাতে পরিবেশের ক্ষতি প্রতিরোধের জন্য জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক দিবসটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে যুদ্ধ কীভাবে ফসল পুড়িয়ে, মাটি বিষাক্ত করে এবং জল দূষিত করে পরিবেশকে ধ্বংস করে। পারমাণবিক অস্ত্র এই ধ্বংসযজ্ঞের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ। তবে বোমা ব্যবহারের অনেক আগেই এর পরিবেশগত ক্ষতি শুরু হয়। পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন প্রক্রিয়া বিশ্বজুড়ে বিশাল এলাকা এবং জলাশয়কে স্থায়ীভাবে দূষিত করছে। শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই দূষণ পরিষ্কার করতে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ হবে বলে অনুমান করা হয়। পারমাণবিক পরীক্ষার যুগে ২,০০০-এরও বেশি বিস্ফোরণ প্রশান্ত মহাসাগরের অ্যাটল বা প্রবাল দ্বীপগুলোকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলেছে এবং ভূগর্ভস্থ পরীক্ষাগুলো হাজার হাজার বছরের জন্য ভূগর্ভস্থ জলকে বিষাক্ত করছে।   

বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, একটি সীমিত আঞ্চলিক পারমাণবিক যুদ্ধও বিশ্বব্যাপী বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে বড় যুদ্ধ হলে শুধু দুর্ভিক্ষেই ৫০০ কোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে। পারমাণবিক যুদ্ধ কোনো দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়, বরং এটি হবে পৃথিবীর জীবন ধারণ ক্ষমতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ।

তাই এমন ভয়াবহতা থেকে বিশ্বকে রক্ষা করতে সাধারণ মানুষের ভূমিকা অপরিহার্য। এর প্রথম ধাপ হলো ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি। পারমাণবিক অস্ত্র ও বিদ্যুৎশক্তির মতো সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে সমাজের সর্বস্তরে গঠনমূলক আলোচনা শুরু করতে হবে। শক্তিশালী জনমত গঠনের মাধ্যমে তারা সরকার ও নীতিনির্ধারকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যাতে তারা পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ চুক্তিগুলোর প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থাকে এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড কঠোরভাবে অনুসরণ করে।

আরও পড়ুন

×