ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

প্রকৃতির নিভৃত প্রহরী

এক জীবনে ৫০ লাখ টাকার ফসল রক্ষা করে একটি মেছোবিড়াল

প্রকৃতির নিভৃত প্রহরী
×

আশিকুর রহমান সমী

প্রকাশ: ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৩২ | আপডেট: ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ | ২০:৩৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

গ্রামবাংলায় রাতের অন্ধকারে ঝোপঝাড় কিংবা জলাশয়ের ধারে এক জোড়া জ্বলজ্বলে চোখ। সাধারণ মানুষের কাছে যা ভয়ের, আতঙ্কের। এই ভয় থেকেই জন্ম নেয় নিষ্ঠুরতা। লাঠিসোঁটা নিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয় প্রাণীটিকে। অথচ আমরা অনেকেই জানি না, রাতের আঁধারে বিচরণ করা এই প্রাণীটি আমাদের অজান্তেই কৃষকের গোলা ভরিয়ে দিচ্ছে, বাঁচিয়ে দিচ্ছে লাখ লাখ টাকার ফসল। বলছিলাম মেছোবিড়াল বা ফিশিং ক্যাটের কথা।

বাংলাদেশের বন্যপ্রাণীদের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝাবুঝির শিকার এই প্রাণীটি। অথচ গবেষণায় উঠে এসেছে বিস্ময়কর এক তথ্য–একটি মেছোবিড়াল তার জীবদ্দশায় কৃষকের প্রায় ৫০ লাখ টাকার ফসল রক্ষা করে।

একনজরে মেছোবিড়াল
বিড়াল গোত্রের হলেও মেছোবিড়াল সাধারণ বনবিড়ালের চেয়ে এটি আকারে বেশ বড় এবং শক্তিশালী। এদের গায়ের রং জলপাই-ধূসর, সারা গায়ে কালচে ছোপ; যা তাদের ঝোপঝাড়ের মধ্যে মিশে থাকতে সাহায্য করে।

অন্যান্য বিড়াল যেখানে পানি এড়িয়ে চলে, মেছোবিড়াল সেখানে পানির সঙ্গেই সখ্য গড়ে তুলেছে। এদের পায়ের আঙুলগুলোর মাঝখানে হাঁসের মতো পাতলা পর্দা থাকে, যা তাদের সাঁতারে অত্যন্ত দক্ষ করে তোলে। এদের লেজটি শরীরের তুলনায় খাটো এবং কিছুটা চ্যাপ্টা, যা পানিতে দিক পরিবর্তনে সাহায্য করে। মূলত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জলাভূমি, হাওর, বিল এবং প্যারাবন বা ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল এদের প্রধান আবাসস্থল।

অস্তিত্বের লড়াই
আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা (আইইউসিএন) বিশ্বব্যাপী মেছোবিড়ালকে ‘সংকটাপন্ন’ তালিকাভুক্ত করলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি এখন ‘বিপন্ন’ প্রাণীর তালিকায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সাম্প্রতিক গবেষণা (২০২০-২৪) অনুযায়ী, বাংলাদেশে মানুষ ও মেছোবিড়ালের দ্বন্দ্বের চিত্রটি ভয়াবহ। ওই চার বছরে মানুষ-মেছোবিড়াল দ্বন্দ্বের ২৮৯টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এ ঘটনাগুলোয় ৩৬৯টি মেছোবিড়ালের মধ্যে ১৩০টিকে হত্যা করা হয়েছে। এ চার বছরে গড়ে প্রতি সপ্তাহে একটি করে সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে এবং প্রতি ১৫ দিনে একটি মেছোবিড়াল মারা পড়েছে।

বিশেষ করে শীতকাল ও প্রজনন ঋতুতে যখন জলাশয়ে পানি কমে যায় এবং খাদ্যের সংকট দেখা দেয়, তখন মা মেছোবিড়াল খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে বা মাছের ঘেরের কাছে চলে আসে। তখনই ঘটে বিপত্তি। মাছ চুরির অপবাদ বা শুধুই আতঙ্কের বশবর্তী হয়ে মানুষ এদের নৃশংসভাবে হত্যা করে।

৫০ লাখ টাকার ‘অদৃশ্য’ উপকার
মেছোবিড়ালকে বলা হয় কৃষকের অকৃত্রিম বন্ধু। কৃষি অর্থনীতিতে এর অবদান টাকার অঙ্কে পরিমাপ করলে অনেকের চোখ কপালে উঠবে।
১. ধানক্ষেত ও শস্যের প্রধান শত্রু ইঁদুর। একটি মেছোবিড়াল তার পুরো জীবনে যে পরিমাণ ইঁদুর শিকার করে, তা বেঁচে থাকলে কৃষকের প্রায় ৫০ লাখ টাকার বেশি দামের ফসল নষ্ট করত। ২. প্রাকৃতিকভাবে ইঁদুর ও ক্ষতিকর পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ করার ফলে জমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের প্রয়োজন কমে। এতে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাঁচে এবং জমির উর্বরতা বজায় থাকে। ৩. মেছোবিড়াল মূলত অসুস্থ মাছ, দুর্বল প্রাণী এবং পচা-গলা দেহাবশেষ খেয়ে জলাশয় পরিষ্কার রাখে। এতে মাছের মড়ক ও অন্যান্য জলজ রোগবালাই ছড়িয়ে পড়া রোধ হয়।

পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, মেছোবিড়াল হলো জলাভূমির ‘কি-স্টোন স্পিসিজ’, অর্থাৎ একটি ইটের ইমারত থেকে মাঝখানের প্রধান ইটটি সরিয়ে নিলে যেমন পুরো ভবন ধসে পড়ে, তেমনি জলাভূমি থেকে মেছোবিড়াল হারিয়ে গেলে পুরো বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাবে।

এরা খাদ্যশৃঙ্খলের ওপরের দিকের খাদক। মেছোবিড়াল বিলুপ্ত হলে ইঁদুর, ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী ও কিছু জলজ পাখির সংখ্যা অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে যাবে, যা শেষ পর্যন্ত কৃষি ও মৎস্য সম্পদের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে। মেছোবিড়াল টিকে থাকা মানেই জলাভূমি টিকে থাকা। জলাভূমি বাঁচলে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, ভূগর্ভস্থ পানি রিচার্জ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে।

আশার আলো
সাংস্কৃতিকভাবেও এই প্রাণীটি আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকার মেছোবিড়ালকে তাদের ‘রাজ্য প্রাণী’ (স্টেট অ্যানিম্যাল) হিসেবে ঘোষণা করেছে; যা এর গুরুত্বের স্বীকৃতি। আমাদের দেশেও হাওর ও বিল এলাকার লোককথায় ‘মেছোবাঘ’ বা ‘বাঘরোল’ হিসেবে এর উপস্থিতি রয়েছে।

দীর্ঘদিনের অবহেলার পর আশার কথা হলো– বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এবং বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। গৃহীত পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে– ১. আইনি কঠোরতা: মেছোবিড়াল হত্যার ঘটনায় প্রথমবারের মতো মামলা ও বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ২. শিক্ষামূলক কার্যক্রম: পাঠ্যক্রমে বিপন্ন প্রাণী সংরক্ষণের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা ক্যাম্পেইন। ৩. সামাজিক সচেতনতা: ‘বিশ্ব মেছোবিড়াল দিবস’ পালন এবং স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা ক্যারাভান। এ উদ্যোগগুলোর ফলে গত এক বছরে মানুষ ও মেছোবিড়ালের দ্বন্দ্বে মৃত্যুর হার কিছুটা হলেও কমেছে।

মেছোবিড়াল কেবল একটি বন্যপ্রাণী নয়; এটি আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি অর্থনীতি এবং পরিবেশগত সুরক্ষার এক নীরব প্রহরী। অজ্ঞতা ও ভয়ের কারণে আমরা যেন আমাদের এই পরম বন্ধুকে হারিয়ে না ফেলি। একটি মেছোবিড়াল হত্যা করা মানে প্রকারান্তরে আমাদের কৃষকের ৫০ লাখ টাকার ক্ষতি করা এবং প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করা। তাই ভয় বা কুসংস্কার নয়– বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে মেছোবিড়ালকে দেখতে হবে। জলাভূমি ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষায় এদের বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, প্রকৃতি বাঁচলেই বাঁচবে মানুষ।

আরও পড়ুন

×