পেয়ারা চাষে ভাগ্যবদল
পেয়ারা চাষে ভাগ্য বদল হয়েছে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার আয়ানুল হকসহ অনেক চাষির
জালাল উদ্দিন
প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০২৬ | ০৭:১৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
কৃষি কেবল আর মাঠে লাঙল চষা বা প্রচলিত ধান-পাটের চাষাবাদে সীমাবদ্ধ নেই। মেধা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির সমন্বয় ঘটাতে পারলে কৃষিতেও যে অভাবনীয় বিপ্লব আনা সম্ভব, তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার খলিয়াপাড়া গ্রামের কৃষক আয়ানুল হক। প্রচলিত চাষাবাদের গণ্ডি পেরিয়ে ‘বারোমাসি থাই গ্রিন-৮’ জাতের পেয়ারা চাষ করে তিনি কেবল নিজের ভাগ্যই বদলাননি, পরিণত হয়েছেন অন্য কৃষকদের অনুপ্রেরণা। দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে নার্সারি ব্যবসার পাশাপাশি তিনি কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। স্ত্রী পাপিয়া সুলতানা এবং দুই সন্তান–অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে পড়ুয়া বড় ছেলে ও অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছোট ছেলেকে নিয়ে তাঁর সংসার। নার্সারির চারা নাড়াচাড়া করতে করতেই তাঁর মনে নিজস্ব একটি বড় ফলের বাগান করার সুপ্ত বাসনা জন্ম নেয়। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, অন্যের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হলে গতানুগতিক কৃষির বাইরে গিয়ে উচ্চমূল্যের বাণিজ্যিক কৃষিতে মনোযোগ দিতে হবে।
আয়ানুলের এই স্বপ্ন পূরণে পিকেএসএফের অর্থায়নে এবং পিপিডির ‘অ্যাগ্রিকালচারাল ভ্যালু চেইন ডেভেলপমেন্ট’ কর্মসূচির আওতায় তিনি বাণিজ্যিক পেয়ারা বাগান করার উদ্যোগ নেন। সংস্থাটির পক্ষ থেকে তাঁকে ৮২ শতাংশ জমির জন্য ৫৫০টি ‘বারোমাসি থাই গ্রিন-৮’ জাতের পেয়ারার চারা দেওয়া হয়। শুধু চারা নয়, পরিবেশবান্ধব কৃষির চর্চা নিশ্চিত করতে তাঁকে জৈব ও রাসায়নিক সার, বায়োপেস্টিসাইড (জৈব বালাইনাশক), ক্ষতিকর পোকামাকড় দমনে ফেরোমন লিউর ও হলুদ ফাঁদসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ দেওয়া হয়। পাশাপাশি দেওয়া হয় দুদিনের নিবিড় প্রশিক্ষণ।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের মাটি ও আবহাওয়া পেয়ারা চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এর মধ্যে থাই গ্রিন-৮ জাতটি কৃষকদের কাছে আলাদিনের চেরাগের মতো। আয়ানুল জানান, এ পেয়ারার বড় সুবিধা হলো এটি সারা বছরই ফলন দেয়। যখন বাজারে দেশি ফলের সরবরাহ কম থাকে, তখন এই পেয়ারা চড়া দামে বিক্রি করে কৃষকরা অনেক লাভবান হতে পারেন। প্রতিটি গাছে ২০ থেকে ২৫টি ফল ধরে। আকার এবং ওজনেও এটি বেশ বড়; মাত্র তিনটি পেয়ারায় প্রায় এক কেজি ওজন হয়ে যায়। তুলনামূলকভাবে বীজ অনেক কম, খেতে অত্যন্ত মিষ্টি ও সুস্বাদু।
আয়ানুলের বাগানের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো ‘ফ্রুট ব্যাগিং’ পদ্ধতির ব্যবহার। আধুনিক কৃষিবিজ্ঞানের এই পদ্ধতিটি ব্যবহারের ফলে পেয়ারায় কোনো বিষাক্ত রাসায়নিক ও ক্ষতিকর পোকামাকড় আক্রমণ করতে পারে না। ফলে ফল থাকে শতভাগ রোগবালাই মুক্ত, দাগহীন, সতেজ এবং মানবদেহের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ।
পিপিডির কৃষি কর্মকর্তা অনুপ কুমার ঘোষ জানান, ‘উল্লাপাড়া অঞ্চলে ফলের বাগানের খুব একটা প্রচলন ছিল না। দীর্ঘমেয়াদি ফসল বলে অনেক কৃষক প্রথমে আগ্রহ দেখান না। কিন্তু আমরা তরুণ উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে কাজ করছি। থাই গ্রিন-৮ জাতের পেয়ারা চারা রোপণের মাত্র আট মাসের মাথায় ফলন দিতে শুরু করে। গাছের সঠিক পরিচর্যা ও ডালপালা ছেঁটে (প্রুনিং) দিলে ফলন আরও বাড়ে। আমরা সহজ শর্তে ঋণ ও কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে কৃষকদের পাশে দাঁড়াচ্ছি।’
আয়ানুল হকের গল্পটি প্রমাণ করে, কৃষিকাজ কোনো পিছিয়ে পড়া পেশা নয়। যে কেউ প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের পাশাপাশি পরিশ্রম করেন, তবে সফলতা সম্ভব। উল্লাপাড়ার খলিয়াপাড়া গোরস্তানের পাশের সেই খালি জমিটি আজ কেবল পেয়ারা বাগান নয়; আশপাশের অনেক কৃষকের স্বাবলম্বী হওয়ার সবুজ পাঠশালা। আয়ানুল প্রমাণ করেছেন, ইচ্ছা আর অধ্যবসায় থাকলে নিজের ভাগ্য নিজের হাতেই বদলে ফেলা যায়।
- বিষয় :
- পেয়ারা
