অরণ্যে অন্যরকম জীবন
সবুজে ঘেরা খাসিয়াদের নিভৃত বাসস্থান; নিরালাপুঞ্জি, শ্রীমঙ্গল ছবি:: আব্দুল আহাদ
শিশির কুমার নাথ
প্রকাশ: ০৪ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৪২ | আপডেট: ০৫ এপ্রিল ২০২৬ | ১৯:১২
| প্রিন্ট সংস্করণ
যান্ত্রিক শহরের কোলাহল আর কংক্রিটের দেয়াল থেকে বহুদূরে, সবুজের বিস্তীর্ণ চাদরে মোড়া এক নিভৃত প্রান্তর। নাম তার ‘নিরালাপুঞ্জি’। মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলায় অবস্থিত খাসিয়া জনগোষ্ঠীর এই আবাসভূমি যেন আক্ষরিক অর্থেই তার নামের সার্থকতা বহন করে চলেছে।
পুঞ্জি দর্শনের কৌতূহল মনের ভেতর দানা বেঁধেছিল বেশ আগে থেকেই। সেই উদ্দেশ্যেই জনাদশেকের একটি দল নিয়ে আমাদের এবারের অরণ্যযাত্রা। শ্রীমঙ্গল উপজেলা সদর থেকে পুঞ্জিটির দূরত্ব প্রায় ২৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে শেষ সাত কিলোমিটার পথ রীতিমতো দুর্গম। যাতায়াতের একমাত্র ভরসা ছাদখোলা জিপগাড়ি, যা স্থানীয়দের কাছে ‘চান্দের গাড়ি’ নামে পরিচিত।
আমরা যখন সমতল থেকে প্রায় ১৫০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত নিরালাপুঞ্জিতে পৌঁছালাম, তখন এক ভিন্ন জগতের প্রতিভাস আমাদের স্বাগত জানাল। প্রবেশপথের সাইনবোর্ডটিই বলে দেয় এখানকার বাসিন্দারা তাদের পরিবেশ ও নিজস্বতার বিষয়ে কতটা সচেতন। সেখানে স্পষ্ট লেখা–এটি কোনো সাধারণ পর্যটনকেন্দ্র বা পিকনিক স্পট নয়; অযথা হৈ-হুল্লোড় করা এবং মোটরসাইকেল নিয়ে পাড়ায় প্রবেশ এখানে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
ভেতরে প্রবেশ করতেই মুগ্ধ হতে হলো। প্রতিটি বাড়ির আঙিনা অভাবনীয় রকম ছিমছাম, গোছানো এবং পরিচ্ছন্ন। মাচাং বা উঁচু মাচার ওপর তৈরি বাঁশের তরজার ঘরগুলোর সামনে ফুলের বাগান, ঘের দেওয়া বাঁখারি বেড়া দিয়ে। অনেক বাড়ির চালা বেয়ে উঠেছে রঙিন বাগানবিলাস (বোগেনভেলিয়া)। অবস্থাপন্ন পরিবারের কেউ কেউ আধাপাকা বা বাংলো ধাঁচের বাড়িও বানিয়েছেন। সব মিলিয়ে এখানকার শান্ত ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ যে কোনো দর্শনার্থীর মন কেড়ে নেবে।
খাসিয়া জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা আবর্তিত হয় পান আর সুপারিকে কেন্দ্র করে। অরণ্যের বড় বড় বৃক্ষকে আশ্রয় করে বেড়ে ওঠে পানের লতা। বৃক্ষকে জড়িয়ে বেড়ে ওঠা এই লতাই যেন একটি আস্ত জনগোষ্ঠীর বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন।
বিকেলের সূর্য পাহাড়ের ঢালে হেলে পড়তেই জঙ্গল আর পানের বরজ থেকে ফিরতে শুরু করেন খাসিয়া পুরুষেরা। কারও কাঁধে পানের ভারী বোঝা, কেউবা ফিরছেন জ্বালানি কাঠ নিয়ে। ‘খাসিয়া পান’ তার বিশেষ ঝাঁজালো ও মিষ্টি স্বাদের জন্য শুধু সিলেট অঞ্চলে নয়, সারাদেশেই সমাদৃত। অতিথি আপ্যায়ন থেকে শুরু করে সামাজিক যে কোনো পালা-পার্বণে পান-সুপারি তাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
মঙ্গোলীয় বংশোদ্ভূত খাসিয়ারা মূলত মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার অধিকারী। তাদের এই গ্রামগুলোকে বলা হয় ‘পুঞ্জি’ এবং পুঞ্জির যিনি প্রধান থাকেন, তাকে বলা হয় ‘মন্ত্রী’। নিরালাপুঞ্জির অধিবাসীরা খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বী। প্রায় ১৫০টি পরিবারের এই পুঞ্জিতে জনসংখ্যা এক হাজারের কাছাকাছি। পুঞ্জির ভেতরেই রয়েছে তিনটি গির্জা, যেখানে প্রতি রোববার সাপ্তাহিক প্রার্থনার আয়োজন করা হয়।
পাহাড়ের এই শান্ত ও সুন্দর জীবনের আড়ালে লুকিয়ে আছে বেঁচে থাকার এক কঠিন সংগ্রাম। হাঁটতে হাঁটতে আমরা পুঞ্জির সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টিতে পৌঁছালাম। পড়ন্ত বিকেলে মাঠে খেলছিল শিশুরা। আমাদের দেখে আম্বানিসা নামে মিষ্টি এক খাসিয়া শিশু এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে বলল, ‘হাদিয়াম’, যার অর্থ ‘কেমন আছেন’।
নিরালাপুঞ্জির সহকারী প্রধান (সহকারী মন্ত্রী) এলভিস পতাম জানালেন তাদের দৈনন্দিন দুর্দশার কথা। পান চাষের ওপর নির্ভরশীল এ মানুষগুলোর সবচেয়ে বড় সংকট দেখা দেয় শুষ্ক মৌসুমে, যখন খাবার পানির তীব্র অভাব দেখা দেয়। তখন ভরসা বলতে কেবল কুয়ার পানি। স্বাস্থ্যসেবার অবস্থাও বেশ করুণ। সামান্য চিকিৎসার জন্যও দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে তাদের শহরে ছুটতে হয়।
নিরালাপুঞ্জিতে ‘কমিউনিটিবেজড ট্যুরিজম’ বা সম্প্রদায়ভিত্তিক পর্যটন গড়ে ওঠার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে, যা হতে পারে এখানকার বাসিন্দাদের বিকল্প আয়ের উৎস। কিন্তু স্থানীয় খাসিয়ারা এখনই পর্যটকদের অবাধ আনাগোনায় খুব একটা উৎসাহিত নন। তাদের আশঙ্কা, অতিরিক্ত পর্যটকের ভিড়ে তাদের সমাজজীবনের নিজস্বতা, গোপনীয়তা ও সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা হারিয়ে যেতে পারে।
তাই নিরালাপুঞ্জিতে ঘুরতে গেলে একজন দায়িত্বশীল পর্যটক হিসেবে পুঞ্জি কর্তৃপক্ষের নিয়মকানুন মেনে চলা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব। অনুমতি ছাড়া কারও ব্যক্তিগত ছবি তোলা বা তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত ঘটানো কোনোভাবেই কাম্য নয়।
সমতলের যান্ত্রিক সীমানা ছাড়িয়ে, বন-পাহাড়ের রাজ্যে খাসিয়াদের এই জীবন এক অনন্য পাঠশালা। নিরালাপুঞ্জির এই সফর শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ নয়, বরং প্রকৃতির প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা একটি পরিশ্রমী জনগোষ্ঠীর সংগ্রামী জীবনের আখ্যানকে খুব কাছ থেকে দেখার এক বিরল সুযোগ।
লেখক: ঐতিহ্য সংগ্রাহক
