বাংলার নিসর্গে পরিযায়ী পাখি
নীল লেজ সুইচোরা
আশিকুর রহমান সমী
প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬ | ০৭:২২ | আপডেট: ২৩ মে ২০২৬ | ১৯:৪২
| প্রিন্ট সংস্করণ
মধুপুর শালবন, গত সপ্তাহের ঘটনা। ভোরের স্নিগ্ধতায় বনের ভেতর হাঁটতে বেরিয়েছি। চারপাশের নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎ কানে ভেসে এলো সুমিষ্ট ডাক–‘বউ কথা কও’। থমকে দাঁড়ালাম। চেনা ছকের চেয়ে ডাকটি যেন কিছুটা ভিন্ন। উৎস খুঁজতে দৃষ্টি প্রসারিত করলাম। দোখলা এলাকায় পৌঁছাতেই পাখির সেই সুর আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। চারপাশ থেকে কলকাকলি জুড়ে দিয়েছে অসংখ্য পাখি। চৈত্রের তাপদাহ আর বৈশাখের তপ্ত দুপুরে এই ডাকগুলো তৈরি করেছে অনন্য সুরের মূর্ছনা। এই মোহনীয় সুরের স্রষ্টা ‘বনসুন্দরী’ নামের মায়াবী পাখি, যাকে আমাদের দেশি সুমচাও বলা হয়। প্রজনন ঋতুতে এরা মূলত আমাদের দেশে আসে। এরা নিজেরাই সযত্নে বাসা বোনে, ডিমে তা দেয়। এরপর ছানাদের বড় করে, তাদের ডানা মেলে ওড়ার সামর্থ্য জুগিয়ে পুনরায় ফিরে যায় নিজেদের ভিনদেশি আবাসে। মূলত এ পাখিগুলোই হলো দেশের গ্রীষ্মকালীন পরিযায়ী পাখি।
পরিযায়ী পাখি বলতে আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে শীতের জলাশয়ে ভিনদেশি অতিথিদের জলকেলি। আমাদের বদ্ধমূল ধারণা, পরিযায়ী পাখিরা কেবল তীব্র শীতের প্রকোপ থেকেই বাঁচতে আসে। বাস্তবের চিত্রটি ভিন্ন। আমাদের দেশের পাখিমহলের বিশাল অংশই পরিযায়ী। দেশে পাওয়া সাত শতাধিক পাখির মধ্যে ২০৮ প্রজাতির পাখি শীতকালীন পরিযায়ী। এর পাশাপাশি ১২ প্রজাতির গ্রীষ্মকালীন পরিযায়ী, ১৪ প্রজাতির পান্থ-পরিযায়ী (যারা যাত্রাপথে সাময়িক বিশ্রাম নেয়) এবং ১১৯ প্রজাতির ভবঘুরে পাখির দেখা মেলে। সাধারণত মার্চের শেষভাগ থেকে আগস্ট বা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলার প্রকৃতিতে গ্রীষ্মকালীন পরিযায়ী পাখিদের বিচরণ লক্ষ্য করা যায়। এদের বিস্তৃতি ও পরিযান মূলত ভারতীয় উপমহাদেশজুড়েই ঘটে। প্রজননের অনুকূল আবহাওয়া ও পর্যাপ্ত খাবারের সন্ধানেই এরা গ্রীষ্মে বাংলাদেশে পাড়ি জমায়।

গ্রীষ্ম পরিযায়ী পাখিদের এক বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে কোকিল বা ‘কুকুলিফর্মিস’ বর্গের পাখিরা। এই বর্গের ছয় প্রজাতির গ্রীষ্ম পরিযায়ী পাখির দেখা মেলে বাংলায়। এদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত ‘বউ কথা কও’। দেশের যে কোনো বনাঞ্চল, বাড়ির ধারের ঝোপঝাড় কিংবা ফসলের ক্ষেতের আশপাশে এদের ডাক শোনা যায়। ভারতীয় উপমহাদেশ ছাড়াও চীন, কোরিয়া, জাপান ও রাশিয়ায় এদের বিস্তৃতি রয়েছে। পাখিটি বাংলাদেশে আসে কেবলই প্রজননের তাড়নায়। তবে এদের একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হলো, এরা নিজেরা কোনো বাসা তৈরি করে না। প্রজনন শেষে এরা অতি সঙ্গোপনে কালো ফিঙে, বনছাতারে, বুলবুলি, বেনেবউ কিংবা ভাতশালিকের বাসায় নিজেদের ডিম রেখে আসে। এই পোষক পাখিরাই নিজের সন্তান ভেবে পরম আদরে তা দিয়ে ডিম ফোটায় এবং ছানা বড় করে। বিজ্ঞানের ভাষায় এই অদ্ভুত আচরণকে বলা হয় বাসা-পরজীবী প্রজনন।
কোকিল গোত্রের আরেক গ্রীষ্ম পরিযায়ী ‘মেটেপেট পাপিয়া’। সারাদেশে বিস্তৃতি থাকলেও পাখিটির দেখা মেলে কম। গভীর বনজঙ্গলেই এরা নিজেদের আড়াল করে রাখে। এরাও বাসা-পরজীবী স্বভাবের। অন্যদিকে, পাহাড়ি অঞ্চলে আসা গ্রীষ্ম পরিযায়ী পাখিদের মধ্যে অন্যতম মোহনীয় ‘এশীয় শ্যামা পাপিয়া’। পরিণত পুরুষ পাখির শরীর উজ্জ্বল পান্না সবুজ পালকে আবৃত থাকে আর বুক ও পেটে থাকে সাদাকালো ডোরাকাটা দাগ। সাধারণত মৌটুসী ও মাকড়মার পাখির বাসায় এরা ডিম গচ্ছিত রাখে। পাহাড়ি বনভূমির আরেক সৌন্দর্য ‘বেগুনি পাপিয়া’। পুরুষ পাখির উপরিভাগ উজ্জ্বল বেগুনি পালকে সাজানো থাকে।
গ্রীষ্মের প্রখর রোদে বৃষ্টির জন্য তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষায় থাকা ‘চাতক’ পাখির গল্প আমরা অনেকেই শুনেছি। পৌরাণিক আবহের এই চাতকও কোকিল গোত্রের একটি গ্রীষ্ম পরিযায়ী পাখি। গ্রীষ্মে সারাদেশের বনভূমি, গ্রাম্য প্রান্তর এমনকি শহরের আশপাশেও এই সাদাকালো পাখির দেখা মেলে। সাধারণত বনছাতারের বাসায় এরা ডিম পাড়ে। কোকিল গোত্রের আরেক পরিযায়ী হলো ‘খয়রাপাখ পাপিয়া’, গ্রীষ্মকালে প্রধান বনভূমিগুলোয় যাদের বিচরণ চোখে পড়ে।
নীলকণ্ঠ বা ‘কোরাসিফর্মিস’ বর্গের অধীনে দুই প্রজাতির গ্রীষ্ম পরিযায়ী পাখির দেখা মেলে বাংলাদেশে। এর মধ্যে ‘নীল লেজ সুইচোরা’ অন্যতম। গ্রীষ্মে এরা ঝাঁকে ঝাঁকে মাঠ, প্রান্তর, বনভূমি ও নদীর দুই পারে চরে বেড়ায়। বাতাসে ডিগবাজি খেয়ে ফড়িং বা মৌমাছির মতো বড় ডানাযুক্ত পতঙ্গ শিকার করায় এদের জুড়ি মেলা ভার। মাটিতে গর্ত করে বাসা বানানো এই পাখিদের প্রজননকাল মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত। একই বর্গের আরেক বিস্ময় হলো ‘উদয়ী বামনরাঙা’ বা বুনো মাছরাঙা। কমলা ও কালচে নীল পালকে আবৃত এটিই বাংলাদেশের সবচেয়ে ছোট প্রজাতির মাছরাঙা। গ্রীষ্মে পরিযান করে আসা বিরল এ পাখিটি সিলেট ও চট্টগ্রামের পাহাড়ি বনের পাহাড়ি ছড়ার আশপাশে দেখা যায়। আইইউসিএন বাংলাদেশের ২০১৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, অত্যন্ত সংবেদনশীল এ পাখিটি বর্তমানে আমাদের দেশে ‘বিপন্ন’ প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত।

গায়ক পাখি বা ‘প্যাসেরিফর্মিস’ বর্গের অধীনে চার প্রজাতির গ্রীষ্ম পরিযায়ী পাখির দেখা মেলে, যার মধ্যে তিনটিই শুমচা। প্রথমেই আসে ‘বনসুন্দরী’ বা দেশি শুমচার কথা। ৯টি ভিন্ন রঙের পালকে আবৃত এই পাখি শালবনে গাছের মগডালে গোলাকার বাসা তৈরি করে। পাহাড়ি বাঁশঝাড়ে দেখা মেলে ‘নীল শুমচা’র। এ ছাড়া সবুজ দেহ ও খয়েরি মাথার ‘খয়রামাথা শুমচা’ সিলেট, চট্টগ্রাম, মধুপুর ও দক্ষিণবঙ্গের গ্রামীণ বনে সৌন্দর্য ছড়ায়। সবশেষে বলতে হয় ‘শতদাগি ঘাসপাখি’র কথা। বৈশ্বিকভাবে সংকটাপন্ন এ প্রজাতিটি হাওর অঞ্চল, বিশেষ করে টাঙ্গুয়ার হাওর এবং পদ্মা অববাহিকায় লম্বা ঘাস ও নলখাগড়ার বনে বাসা বাঁধে।
পাখিদের পরিযান একটি বছরব্যাপী চলমান প্রক্রিয়া। শীতকালে এদের সংখ্যাধিক্যের কারণে বিষয়টি আমাদের চোখে বেশি ধরা পড়ে। অথচ গ্রীষ্মের তপ্ত দিনগুলোতেও এই ১২ প্রজাতির পরিযায়ী পাখিরা সুমিষ্ট সুরের জাদুতে বাংলার প্রকৃতিকে প্রাণবন্ত করে তোলে। পরিতাপের বিষয়, বন উজাড় ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে দিন দিন এসব পাখির সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এই গ্রীষ্ম পরিযায়ী পাখিদের আবাসস্থল সংরক্ষণ করা এখন সময়ের জোরালো দাবি। আমাদের একটু সচেতনতাই পারে বাংলার নিসর্গে এদের সুরেলা কলতান বাঁচিয়ে রাখতে।
লেখক: শিক্ষক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- আশিকুর রহমান সমী
- পরিযায়ী পাখি
