ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রকৃতিপ্রেমিক এক ‘আধুনিক সাপুড়ে’র গল্প

প্রকৃতিপ্রেমিক এক ‘আধুনিক সাপুড়ে’র গল্প
×

‘আধুনিক সাপুড়ে’ রফিকুল ইসলাম

শওকত আলী রতন

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৪৫ | আপডেট: ২২ আগস্ট ২০২৬ | ২১:২৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

সাপের হিমশীতল চাহনি আর বিষাক্ত ফণা তোলার দৃশ্য কল্পনায় এলেই অধিকাংশ মানুষের মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে যায় আতঙ্কের অজানা স্রোত। সেই ভয়াল বিষধর সাপের সঙ্গেই পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর উপজেলার দেউলবাড়ি গ্রামের রফিকুল ইসলামের নিত্য বসবাস। তিনি কোনো সাবেকি ঘরানার সাপুড়ে নন; যাঁর গলায় ঝুলবে তাবিজ-কবজের মালা কিংবা হাতে থাকবে বিষদাঁত ভাঙা সাপের ঝাঁপি। ৪৮ বছর বয়সী রফিকুল ইসলাম পেশা ও নেশায় একজন আধুনিক ‘স্নেক রেসকিউয়ার’ বা সাপ উদ্ধারকারী। বংশগতভাবে কোনো সাপুড়ে পরিবারের সন্তান না হয়েও কেবল অদম্য সাহস, বিজ্ঞানমনস্কতা আর প্রকৃতিপ্রেমের জোরে তিনি পরিবেশ রক্ষায় নিবেদিতপ্রাণ।

রফিকুলের এই ‘আধুনিক সাপুড়ে’ হয়ে ওঠার পেছনের ইতিহাসটি কোনো রোমাঞ্চকর উপন্যাসের চেয়ে কম নয়! সময়টা ১৯৯৮ সাল। প্রলয়ঙ্করী বন্যায় ভাসছে গোটা দেশ। লোকালয়ে পানির তোড়ে ভেসে আসে অসংখ্য বিষধর সাপ। গ্রামের পর গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে সাপের আতঙ্ক। ঠিক সেই দুর্যোগের দিনগুলোতে সাপের কামড়ে মৃত্যু ঘটে রফিকুলের ফুপুর।

১৮ বছরের এক তরুণের বুকে প্রিয়জনের এই মৃত্যু গভীর ক্ষত তৈরি করে। ফুপুর মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে রফিকুল নেমে পড়েন সাপ নিধনে। বেশ কয়েকটি সাপ মেরেও ফেলেন। কিন্তু প্রকৃতির নিজস্ব কিছু সমীকরণ থাকে। সাপ মারতে মারতেই রফিকুল গভীরভাবে অনুধাবন করেন, প্রাণী হত্যা কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। তিনি বুঝতে পারেন, বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাপের অনস্বীকার্য ভূমিকা রয়েছে। সাপের প্রধান খাদ্য ইঁদুর ও ক্ষতিকর পোকামাকড়; সাপ না থাকলে ফসলের যে ক্ষতি হবে, তা কৃষিনির্ভর অর্থনীতির জন্য ভয়াবহ হুমকি।

প্রতিশোধের সেই আগুন রূপ নেয় গভীর প্রকৃতিপ্রেমে। সাপ না মেরে কীভাবে তাদের নিরাপদে লোকালয় থেকে উদ্ধার করা যায়, তা শিখতে ১৯৯৯ সালে তিনি পাড়ি জমান ভারতের কেরালায়। সেখানে অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে সাপ ধরার বৈজ্ঞানিক কলাকৌশল রপ্ত করে দেশে ফেরেন। শুরু হয় এক নতুন জীবনসংগ্রাম।
আমাদের সমাজে সাপুড়িয়াদের জীবন বরাবরই প্রান্তিক। এর বিপরীতে রফিকুল বলেন, ‘সাপ ধরতে কোনো জাদুটোনা বা তন্ত্রমন্ত্র লাগে না; প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক কলাকৌশল, নিখুঁত মনোযোগ আর সাহসিকতা।’
আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে তিনি বিষধর সাপ ও সাপের কামড় বিষয়ে সচেতনতা ছড়াচ্ছেন। ফোনকল কিংবা বার্তা পেলেই ছুটে যাচ্ছেন দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।

সাপ উদ্ধারের এই পথ মসৃণ নয়; পদে পদে মৃত্যুর হাতছানি। এ পর্যন্ত অন্তত সাতবার বিষধর সাপের ছোবলের শিকার হতে হয়েছে তাঁকে; একাধিকবার অ্যান্টিভেনম গ্রহণ করে ফিরে এসেছেন মৃত্যুর দুয়ার থেকে। তবুও তাঁর মনে কোনো ক্ষোভ বা ভয় দানা বাঁধেনি।

এ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ২০-২৫ প্রজাতির শত শত সাপ উদ্ধার করেছেন রফিকুল। এর মধ্যে বিষধর খৈয়া গোখরা, পদ্মগোখরা এবং সাম্প্রতিক সময়ে আতঙ্ক ছড়ানো বিপজ্জনক ‘রাসেলস ভাইপার’ বা চন্দ্রবোড়া সাপ রয়েছে অন্তত ২৫টি। গত তিন বছর ধরে উদ্ধার করা এসব সাপ নিজ দায়িত্বে তিনি হস্তান্তর করছেন খুলনা বন বিভাগের কাছে, যা পরে সুন্দরবনের করমজল ও ধানসিঁড়ি পয়েন্টের মতো গভীর অরণ্যে অবমুক্ত করা হয়।

খুলনা বন বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা তন্ময় বাবু তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, ‘রফিকুল ইসলামের মতো মানুষেরা দেশের জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছেন। নিয়মিত সাপ উদ্ধার করে বনের প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করতে প্রশংসনীয় অবদান রাখছেন।’

একসময় অভাবের তাড়নায় দশম শ্রেণিতেই পড়ালেখা ছাড়তে হয়েছিল রফিকুলকে। কিন্তু আজ তিনি স্বাবলম্বী। চিংড়ির ঘের পরিচালনা এবং উদ্ধার অভিযানের মাধ্যমে তিনি সংসারে সচ্ছলতা এনেছেন। তাঁর অধীনে বর্তমানে কাজ করছে ৩৫ জনের একটি সুপ্রশিক্ষিত কর্মী দল। এমনকি তাঁর ছোট ছেলেও বাবার এই পরিবেশবাদী কাজের অনুগামী হয়েছে।

সম্প্রতি এক আলাপচারিতায় রফিকুলের চোখে ফুটে ওঠে এক বিশাল স্বপ্নের আভা। তিনি চান সরকারি বা বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশে একটি আন্তর্জাতিক মানের ‘ভেনম ফার্ম’ বা সাপের খামার গড়ে উঠুক।

স্বাস্থ্য খাতের তথ্যমতে, প্রতিবছর বাংলাদেশে হাজার হাজার মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন এবং প্রতিষেধক হিসেবে ভারত থেকে কোটি কোটি টাকার অ্যান্টিভেনম আমদানি করতে হয়। রফিকুলের যুক্তি অত্যন্ত স্পষ্ট–দেশে বিষধর সাপের খামার গড়ে উঠলে স্থানীয় সাপের বিষ থেকেই বিশ্বমানের অ্যান্টিভেনম তৈরি সম্ভব। এতে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে এবং সাপের কামড়ে প্রাণহানি শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে।

একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর আকুল আবেদন–‘সাপে কাটলে ওঝা বা ঝাড়ফুঁকের পিছে এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করবেন না। গোল্ডেন আওয়ার অর্থাৎ প্রথম এক থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যে রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে অ্যান্টিভেনম দিতে পারলে মৃত্যুঝুঁকি প্রায় থাকেই না।’ 

আরও পড়ুন

×