বদলে যাওয়া বেদেজীবন
ছবি:: সঞ্জিত কর্মকার
কাজী আরিফুজ্জামান
প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৪৬ | আপডেট: ২২ আগস্ট ২০২৬ | ২১:২১
| প্রিন্ট সংস্করণ
যুগ যুগ ধরে বাংলার নদনদীতে নৌকার বুকে যাদের সংসার, সেই বেদে সম্প্রদায় আজ জল ছেড়ে অনেকটাই ডাঙার বাসিন্দা। নদীর নাব্য হ্রাস, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং আধুনিকতার তোড়ে তাদের ঐতিহ্যবাহী ভাসমান জীবন অনেকটাই বিলুপ্তির পথে। এখন নদীর তীরে বা পতিত জমিতে বাঁশ আর পলিথিনের অস্থায়ী ছাউনিতেই তাদের ঠিকানা। মূলধারার সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন এ মানুষগুলোর যাপিত জীবন, বিশ্বাস ও সংস্কৃতি আজও আমাদের লোকজ ইতিহাসের এক জীবন্ত বিস্ময়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে মেঘনার পারে বেদেপল্লি ঘুরে দেখা মেলে দুয়েকটি ভ্রাম্যমাণ দোকানের, যা তাদের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে সহায়তা করে। এসব দোকানে খাবার, পানীয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীসহ নানা ধরনের পণ্য পাওয়া যায়। এ দোকানগুলো যেখানেই তারা বসতি স্থাপন করে, সেখানেই অস্থায়ীভাবে চালু করা হয়। বেদে সম্প্রদায়ের মানুষের জীবন মূলত নদীর সঙ্গে সম্পৃক্ত। নদী তাদের জন্য প্রধান চলাচলের মাধ্যম এবং জীবিকার উৎস। এ ভ্রাম্যমাণ দোকানগুলো শুধু বেদে সম্প্রদায়ের মানুষের জন্যই নয়, বরং আশপাশের এলাকার মানুষের কাছেও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। এভাবেই বেদে সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রা এবং ব্যবসার ধরন তাদের বিশেষভাবে আলাদা করে তুলে, যা তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ডাঙার এই অস্থায়ী জীবনেও বেদেরা সযতনে ধরে রেখেছে নিজেদের ঐতিহ্য ও ঐক্য। এর অন্যতম সুন্দর দৃষ্টান্ত তাদের খাদ্যাভ্যাস। সপ্তাহে অন্তত এক দিন পুরো পল্লি মেতে ওঠে এক অদ্ভুত উৎসবে–সবার হাঁড়িতে রান্না হয় একই খাবার। সর্দারের নির্দেশে নির্ধারিত এই প্রথা শুধু পেট ভরানোর অনুষঙ্গ নয়; বরং এটি টিকে থাকার কঠিন সংগ্রামে একে অপরের প্রতি সহানুভূতি, শৃঙ্খলা ও ভালোবাসার এক অদৃশ্য সুতা। সেদিন পুরো পল্লিতে হাঁস বা বিশেষ কোনো পদের সুবাস ছড়িয়ে পড়ে। খাবার এখানে কেবল পুষ্টির মাধ্যম থাকে না, হয়ে ওঠে পারস্পরিক বন্ধন সুদৃঢ় করার এক মোক্ষম হাতিয়ার।
বেদে সম্প্রদায়ের নারীদের পোশাক শুধু তাদের ব্যক্তিগত পছন্দ নয়, বরং তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতিফলন। এই রঙিন শাড়ি তাদের সামাজিক অবস্থান ও সংস্কৃতির ধারক হিসেবে বিবেচিত হয়।
একসময় বেদে বলতেই চোখের সামনে ভেসে উঠত সাপ খেলা, বানর খেলা, শিঙা লাগানো বা জাদুর আসর। আজ এসব শুধুই স্মৃতি। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন ও প্রাণী অধিকার বিষয়ে আইনি কড়াকড়ির কারণে তাদের ঐতিহ্যবাহী পেশাগুলো আজ বলতে গেলে নিষিদ্ধ। শিকলবন্দি বানর বা সাপের খেলাকে এখন আইনিভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়। পাশাপাশি টেলিভিশন, স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের এই যুগে গ্রামের মানুষও আর এসব খেলায় আগের মতো আগ্রহ দেখায় না। ফলে তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছেন তারা। বাধ্য হয়েই জীবিকার তাগিদে তাদের পেশা বদলাতে হচ্ছে। বেদে নারীরা এখন কাঁখে ঝুড়ি বা পুঁটলি নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে কাচের চুড়ি, প্রসাধনী, প্লাস্টিকের সামগ্রী বা ভেষজ ওষুধ বিক্রি করছেন। পুরুষরা কেউ কেউ দিনমজুরি বা ক্ষুদ্র ব্যবসায় ঝুঁকছেন।
নদীর তীরে বা জলাশয়ের পাশে বাস করলেও নিরাপদ পানীয়জলের অভাবে তারা প্রতিনিয়ত পানিবাহিত রোগের শিকার হচ্ছেন। খোলা জায়গায় বা অস্থায়ী তাঁবুতে বসবাস করায় মশার উপদ্রব তাদের নিত্যসঙ্গী। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করায় ডেঙ্গু বা ম্যালেরিয়ার মতো রোগের ঝুঁকি তাদের লেগেই থাকে।
এতসব অভাব, অভিযোগ আর অনিশ্চয়তার মধ্যেও বেদেপল্লিতে এখন বইতে শুরু করেছে পরিবর্তনের হাওয়া। একসময় রাতের অন্ধকার দূর করতে যেখানে কেবল কুপি বাতির ওপর ভরসা করতে হতো, আজ সেখানে এসেছে প্রযুক্তি। পলিথিন ও বাঁশের অস্থায়ী ছাউনির সামনে সগর্বে দাঁড়িয়ে থাকা সোলার প্যানেলগুলো যেন সেই পরিবর্তনেরই জ্বলন্ত প্রমাণ। এই এক চিলতে আলো যেন তাদের অন্ধকার জীবনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। সমাজের প্রান্তিক পর্যায়ে থেকেও তাদের চোখের উজ্জ্বলতা এক অদম্য মানসিক শক্তিরই বহিঃপ্রকাশ।
- বিষয় :
- কাজী আরিফুজ্জামান
- বেদে সম্প্রদায়
- বেদে