ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিস্ময়ের নাম হাসান মাহমুদ

বিস্ময়ের নাম হাসান মাহমুদ
×

বামের ছবিতে মা-বাবা এবং ডানের ছবিতে স্ত্রীর সঙ্গে হাসান মাহমুদ

হিল্লোল চৌধুরী

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৪৯ | আপডেট: ২২ আগস্ট ২০২৬ | ২১:১৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

উইকেট পাওয়ার পর বুনো উল্লাস নেই, আবার বাউন্ডারি হজম করলেও চেহারায় থাকে না হতাশার ছাপ। ২২ গজের ক্রিকেটে ফাস্ট বোলাররা সাধারণত যেখানে আগ্রাসী মেজাজের হয়ে থাকেন, সেখানে তিনি যেন এক শান্ত সমুদ্র। বল হাতে গতির ঝড় তুললেও, ভেতরে অদ্ভুত এক প্রশান্তি। বলছিলাম বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের তরুণ পেস সেনসেশন হাসান মাহমুদের কথা। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়া সফরের প্রথম টেস্ট ম্যাচে বাংলাদেশ যে দাপুটে জয় পেয়েছে, তার অনেকটাই এ পেসারের অবদান। অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসে ৬ উইকেটসহ ম্যাচে নিয়েছেন ৯ উইকেট। অবধারিতভাবে তিনিই হয়েছেন ম্যাচ সেরা খেলোয়াড়।

শান্ত এক কিশোরবেলা
১৯৯৯ সালের ১২ অক্টোবর লক্ষ্মীপুর পৌরসভার বাঞ্ছানগর এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন হাসান মাহমুদ। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা মো. ফারুক এবং গৃহিণী মাহমুদা খাতুন রানীর ছোট ছেলে তিনি। দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সবার ছোট হওয়ায় পরিবারের আদরের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন হাসান। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন শান্তশিষ্ট, লক্ষ্মীপুরবাসীর কাছে তিনি তাই আক্ষরিক অর্থেই এক ‘লক্ষ্মী ছেলে’।

এক সাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারে তাঁর বেড়ে ওঠা। পড়াশোনার পাশাপাশি শৈশব থেকেই ক্রিকেটের প্রতি ছিল এক দুর্বার টান। লক্ষ্মীপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয় এবং লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজে পড়ার সময়ও তাঁর ধ্যান-জ্ঞান জুড়ে ছিল কেবলই ক্রিকেট। ছোটবেলায় বাংলাদেশের কিংবদন্তি অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজাকে নিজের আইডল মানতেন। 

ব্যাটসম্যান থেকে পেসার হয়ে ওঠা
হাসানের ক্রিকেটে হাতেখড়ি হয় লক্ষ্মীপুর জেলা স্টেডিয়ামে। রাইজিং ফুটবল একাডেমির পরিচালক আব্দুল মমিন এবং জেলা ক্রীড়া সংস্থার ক্রিকেট কোচ মনির হোসেনের হাত ধরে তাঁর আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ শুরু। মজার ব্যাপার হলো, হাসান তাঁর ক্রিকেটজীবন শুরু করেছিলেন একজন ব্যাটসম্যান হিসেবে। অনুশীলনে বল করার সময় তাঁর গতি দেখে কোচরা চমকে যান। এরপরই ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি বোলিংয়েও জোর দেন তিনি। ধীরে ধীরে পরিণত হন একজন পুরোদস্তুর ফাস্ট বোলার হিসেবে।

২০১৫ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পেস বোলিং একাডেমিতে সুযোগ পান হাসান। সেখানে তাঁর গতি ও লাইন-লেন্থের নির্ভুলতা নির্বাচকদের মুগ্ধ করে। এরপর তাঁকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ২০২০ সালের মার্চে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি ম্যাচ দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয় হাসান মাহমুদের। ২০২১ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে হয় তাঁর ওয়ানডে অভিষেক। সম্প্রতি পাকিস্তানের মাটিতে টেস্ট সিরিজে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়েও বল হাতে তিনি রেখেছেন অসামান্য অবদান।

জীবনের নতুন ইনিংস
মাঠের মতো মাঠের বাইরেও হাসান বেশ শান্তশিষ্ট। ২০২৩ সালের ৯ জুন জীবনের নতুন ইনিংসে পা রাখেন এই তরুণ পেসার। ছোট পরিসরে পারিবারিকভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। তাঁর স্ত্রীর নাম চৈতি ফারিয়া ঐশী, যিনি মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে (এমআইএসটি) ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পড়াশোনা করছেন। বিয়ে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে একটি মজার ঘটনার জন্ম হয়েছিল। ভক্তরা খেয়াল করেন, বিয়ের সব ছবিতে হাসান মাহমুদের মুখে তাঁর সিগনেচার সেই ‘সিরিয়াস’ লুক! 

পারিবারিক আবহে থাকতে পছন্দ করেন হাসান। অবসরে মাছ ধরতে ভালোবাসেন, পাশাপাশি ভিডিও গেমস খেলা ও সিনেমা দেখাও তাঁর অন্যতম শখ। এ তরুণ বিশ্বাস করেন, ‘মেধার চেয়ে পরিশ্রম সবসময় এগিয়ে থাকে, যদি না মেধাবী ব্যক্তি কঠোর পরিশ্রম করে।’

হাসানের স্বপ্ন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৫০০ উইকেট শিকারের মাইলফলক ছোঁয়া। ইনজুরি মুক্ত থেকে এই ফর্ম ও শান্ত মেজাজ ধরে রাখতে পারলে শুধু বাংলাদেশ নয়, ক্রিকেটের ইতিহাসে অন্যতম সেরা এক ফাস্ট বোলার হিসেবে নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখতে পারবেন হাসান মাহমুদ–এমনটিই বিশ্বাস তাঁর পরিবার, কোচ ও অগুনতি ভক্ত-সমর্থকের।

আরও পড়ুন

×