ঢাকা মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

কেন তাপপ্রবাহ নারীদের ওপর বেশি প্রভাব ফেলে, যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

কেন তাপপ্রবাহ নারীদের ওপর বেশি প্রভাব ফেলে, যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
×

ছবি: এএফপি

বিবিসি

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ | ১২:৫৬ | আপডেট: ১৪ জুলাই ২০২৬ | ১৩:০৫

প্রচণ্ড গরমে ক্লান্তি, মাথা ঘোরা, খিটখিটে মেজাজ, অনিদ্রা, অতিরিক্ত ঘাম, হট ফ্ল্যাশ কিংবা পেট ফাঁপার মতো সমস্যায় অনেক নারীই অন্যদের তুলনায় বেশি ভোগেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপপ্রবাহ শুধু আবহাওয়ার বিষয় নয়; নারীদের শরীরের হরমোন, ঋতুচক্র, গর্ভাবস্থা, মেনোপজ, বয়স এবং সামাজিক বাস্তবতা মিলিয়ে এর প্রভাব আরও তীব্র হয়ে ওঠে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপপ্রবাহ বাড়তে থাকায় নারীদের জন্য বাড়তি সচেতনতা ও সুরক্ষার প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।

জুন মাসের রেকর্ড গরমের পর বিবিসির কাছে নিজেদের অভিজ্ঞতা জানিয়ে অনেক নারী বলেছেন, প্রচণ্ড গরমে তারা অতিরিক্ত মানসিক চাপ, খিটখিটে মেজাজ, মাথা ঘোরা, পেট ফাঁপা, অনিদ্রা ও চরম ক্লান্তিতে ভুগেছেন। অনেকের মতে, বছরের অন্য সময়ের তুলনায় গরমের সময় এসব সমস্যা আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

এনএইচএসের জিপি ও নারীস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. নিঘাত আরিফ বলেন, তীব্র গরম নারীদের হৃদ্‌যন্ত্র ও রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থার জন্য এক ধরনের ‘কার্ডিওভাসকুলার স্ট্রেস টেস্ট’-এর মতো কাজ করে। ফলে পুরুষদের তুলনায় নারীদের শরীরকে বেশি চাপ সহ্য করতে হয়।

অন্যদিকে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল হেলথের জনস্বাস্থ্য গবেষক ডা. ক্যাট পিনহো-গোমেস বলেন, তাপপ্রবাহজনিত মৃত্যুর ঝুঁকিও নারীদের ক্ষেত্রে কিছুটা বেশি হতে পারে। যদিও এ বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

হরমোনের পরিবর্তনই বড় কারণ

ডা. নিঘাত আরিফের মতে, নারীদের ক্ষেত্রে তাপপ্রবাহের ঝুঁকির অন্যতম কারণ হলো শরীরের হরমোনের স্বাভাবিক ওঠানামা এবং তাপের প্রতি শরীরের ভিন্ন প্রতিক্রিয়া।

গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষদের তুলনায় নারীদের ঘাম কম হয় এবং তুলনামূলক বেশি তাপমাত্রায় ঘাম শুরু হয়। ফলে শরীরের অতিরিক্ত তাপ দ্রুত বের হতে পারে না। আবার অনেক সময় শরীরে বেশি ঘাম না হওয়ায় বিপদের মাত্রাও সহজে বোঝা যায় না।একই সঙ্গে নারীদের শরীরে চর্বির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি থাকায় তা তাপ ধরে রাখে। ফলে শরীর দ্রুত ঠান্ডা হতে পারে না এবং দীর্ঘ সময় গরম অনুভূত হয়।

ডা. আরিফ বলেন, এসবের সঙ্গে যখন হরমোনের পরিবর্তন যুক্ত হয়, তখন শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরও বেশি চাপে পড়ে।

ঋতুচক্রের সময় বাড়ে অস্বস্তি

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋতুচক্রের দ্বিতীয়ার্ধে প্রোজেস্টেরন হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। এতে শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রাও কিছুটা বৃদ্ধি পায়। ফলে তীব্র গরমে অস্বস্তি আরও বেশি অনুভূত হয়।

ঋতুস্রাব শুরু হলে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। এতে শরীরকে ঠান্ডা রাখতে হৃদ্‌যন্ত্রকে বেশি পরিশ্রম করতে হয়।

ডা. আরিফ বলেন, ঋতুস্রাবের সময় রক্তক্ষরণের সঙ্গে শরীর থেকে আয়রনও বেরিয়ে যায়। বিশেষ করে যাদের অতিরিক্ত রক্তপাত হয়, তাদের আয়রনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এতে শরীরে অক্সিজেন পরিবহন ব্যাহত হয় এবং ক্লান্তি, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা ও অনিদ্রার মতো সমস্যা বাড়ে। গরমের সময় এসব উপসর্গ আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে।

মেনোপজে আরও বাড়ে গরমের ধকল

বিশেষজ্ঞদের মতে, পেরিমেনোপজ ও মেনোপজের সময় ইস্ট্রোজেনের মাত্রা কমে যাওয়ায় হট ফ্ল্যাশ ও রাতের অতিরিক্ত ঘাম অনেক নারীর জন্য সাধারণ সমস্যা। তাপপ্রবাহের সময় এই উপসর্গগুলো আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে।

ডা. নিঘাত আরিফ বলেন, যেসব নারীর কেমিক্যাল বা সার্জিক্যাল মেনোপজ হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। হরমোন-সংবেদনশীল ক্যানসার, এন্ডোমেট্রিওসিস বা অন্যান্য স্ত্রীরোগের চিকিৎসায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে তাপমাত্রা আরও বাড়লে মেনোপজজনিত হট ফ্ল্যাশ ও রাতের ঘামের সমস্যাও বাড়তে পারে।

গর্ভাবস্থায় তাপপ্রবাহের ঝুঁকি

গর্ভাবস্থায় নারীরা তাপজনিত ধকলের প্রতি বেশি সংবেদনশীল হয়ে পড়েন। ল্যানসেট সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, এ সময় শরীরের বিপাকীয় চাহিদা ও তরলের প্রয়োজন বেড়ে যাওয়ায় শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে হিট স্ট্রেসের ঝুঁকি বাড়ে। ডা. নিঘাত আরিফ বলেন, গর্ভাবস্থায় হৃদ্‌যন্ত্র ও রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। তীব্র গরম সেই চাপ আরও বাড়িয়ে দেয় এবং মা ও গর্ভের শিশুর জন্য জটিলতার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

সামাজিক ও বয়সজনিত কারণ

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু শারীরিক কারণ নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাও নারীদের ঝুঁকি বাড়ায়। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের (ইউসিএল) গবেষক ডা. ক্যাট পিনহো-গোমেস বলেন, কম আয়, পরিবারের সদস্যদের দেখাশোনার দায়িত্ব এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ না থাকলে তাপপ্রবাহের ক্ষতিকর প্রভাব আরও বেড়ে যায়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কমে যায়। অনেক বয়স্ক মানুষের তৃষ্ণা অনুভবের ক্ষমতাও কমে যায়। এছাড়া উচ্চ রক্তচাপের কিছু ওষুধ শরীরকে তাপজনিত চাপের প্রতি আরও সংবেদনশীল করে তুলতে পারে। নারীরা গড়ে বেশি দিন বেঁচে থাকায় এই বয়সজনিত ঝুঁকিও তাদের ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়।

হিট এক্সহশন ও হিটস্ট্রোকের লক্ষণ

বিশেষজ্ঞরা জানান, অতিরিক্ত গরমে প্রথমে হিট এক্সহশন দেখা দিতে পারে। এর লক্ষণের মধ্যে রয়েছে মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত ঘাম, দুর্বলতা, বমি বমি ভাব, বমি, পেশিতে টান এবং শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়া। আর হিটস্ট্রোক হলে শরীরের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হতে পারে, ঘাম বন্ধ হয়ে যায়, ত্বক গরম ও শুষ্ক হয়ে পড়ে, বিভ্রান্তি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা খিঁচুনি দেখা দিতে পারে। এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

করণীয়

ডা. নিঘাত আরিফের পরামর্শ, তীব্র গরমে পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে, ঘর যতটা সম্ভব ঠান্ডা রাখতে হবে এবং দিনের সবচেয়ে গরম সময়ে বাইরে যাওয়া এড়িয়ে চলতে হবে। ব্যায়াম করলে ভোর বা সন্ধ্যার সময় বেছে নেওয়া, সানস্ক্রিন ব্যবহার এবং শরীরের অস্বাভাবিক লক্ষণগুলোর প্রতি সতর্ক থাকারও পরামর্শ দেন তিনি। প্রয়োজনে কাজের গতি কমিয়ে শরীরকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দিতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

ডা. ক্যাট পিনহো-গোমেস বলেন, কর্মক্ষেত্র, স্বাস্থ্যসেবা এবং নীতিনির্ধারণে নারীদের শারীরিক প্রয়োজনকে আরও গুরুত্ব দেওয়া উচিত। আর ডা. নিঘাত আরিফের ভাষায়, এটি শুধু নারীদের সমস্যা নয়, এটি একটি জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সমস্যা। নারীদের জন্য নিরাপদ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে তার সুফল সবাই পাবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে তাপপ্রবাহের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ পরিস্থিতিতে নারীদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য ও জীবনযাপনের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। সময়মতো সতর্কতা ও প্রয়োজনীয় যত্নই তাপপ্রবাহজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনতে পারে।

আরও পড়ুন

×