ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দূরপাল্লার বিমান ভ্রমণের পর শরীর খারাপ লাগার কারণ, যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

দূরপাল্লার বিমান ভ্রমণের পর শরীর খারাপ লাগার কারণ, যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
×

ছবি: গেটি ইমেজেস

বিবিসি

প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২৬ | ১২:০৫

দীর্ঘ দূরত্বের বিমান ভ্রমণের পর অনেকেই অস্বাভাবিক ক্লান্তি, মাথাব্যথা, ঘুমের সমস্যা কিংবা শরীর ম্যাজম্যাজ করার মতো সমস্যায় ভোগেন। অনেকের ধারণা, এর কারণ শুধু দীর্ঘ সময় বিমানে বসে থাকা। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূল সমস্যা শুরু হয় শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক ছন্দ বা ‘বডি ক্লক’ নতুন সময় অঞ্চলের সঙ্গে মিলতে না পারায়।

মানবদেহের একটি নিজস্ব অভ্যন্তরীণ ঘড়ি রয়েছে, যা দিন-রাতের আলো, ঘুম, ক্ষুধা, হরমোন নিঃসরণ এবং শরীরের নানা কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে। এক দেশ থেকে আরেক দেশে দ্রুত ভ্রমণের সময় একাধিক সময় অঞ্চল অতিক্রম করলে এই স্বাভাবিক ছন্দ হঠাৎ বদলে যায়। ফলে শরীর বুঝতে পারে না কখন ঘুমাতে হবে, কখন জেগে থাকতে হবে বা কখন খাবার হজমের জন্য প্রস্তুত হতে হবে। এ কারণেই দূরপাল্লার ভ্রমণের পর শরীরে নানা ধরনের অস্বস্তি দেখা দেয়।

কী কী সমস্যা দেখা দিতে পারে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে সাধারণ উপসর্গ হলো অতিরিক্ত ক্লান্তি। তবে এর পাশাপাশি মাথাব্যথা, পেশিতে ব্যথা, মনোযোগের ঘাটতি, সবকিছু ভুলে যাওয়ার প্রবণতা, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া এবং কাজে অনীহাও দেখা দিতে পারে।

শুধু তাই নয়, অনেকের বমি বমি ভাব, ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য কিংবা হজমের সমস্যাও হয়। কারণ শরীরের জৈবিক ঘড়ির সঙ্গে পরিপাকতন্ত্রেরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। যখন শরীরের সময়সূচি বদলে যায়, তখন হজম প্রক্রিয়াও সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়।

কেন এমন হয়?

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্কাডিয়ান নিউরোসায়েন্সের অধ্যাপক রাসেল ফস্টারের মতে, মানুষের মস্তিষ্কের একটি অংশ পুরো শরীরের সময়সূচি নিয়ন্ত্রণ করে। এটি অনেকটা অর্কেস্ট্রার পরিচালকের মতো কাজ করে। দীর্ঘ বিমান ভ্রমণের পর সেই সমন্বয় নষ্ট হয়ে গেলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ একসঙ্গে কাজ করতে পারে না। ফলে ক্লান্তি, ঘুমের সমস্যা ও শারীরিক অস্বস্তি দেখা দেয়।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, পূর্বদিকে ভ্রমণ করলে এই সমস্যা তুলনামূলক বেশি হয়। কারণ তখন শরীরকে আগের চেয়ে আগে ঘুমাতে ও আগে জাগতে হয়, যা জৈবিক ঘড়ির জন্য মানিয়ে নেওয়া কঠিন। পশ্চিমমুখী ভ্রমণে শরীর তুলনামূলক দ্রুত মানিয়ে নিতে পারে।

গবেষণায় যা জানা গেছে

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের নিয়মিত দীর্ঘ দূরত্বে বিমান ভ্রমণ করতে হয়—বিশেষ করে পাইলট ও কেবিন ক্রুদের—তাদের শরীরে মানসিক চাপের হরমোন কর্টিসলের মাত্রা বাড়তে পারে। দীর্ঘদিন এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হওয়া, হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি এবং স্মৃতিশক্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

কিছু গবেষণায় আরও দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় ধরে শরীরের জৈবিক ছন্দ বারবার বিঘ্নিত হলে লিভারের কার্যকারিতা, বিপাক প্রক্রিয়া এবং সামগ্রিক শারীরিক সক্ষমতার ওপরও প্রভাব পড়ে। যদিও এসব গবেষণার অনেকগুলো প্রাণীর ওপর পরিচালিত হয়েছে, তবুও বিজ্ঞানীরা বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন।

কীভাবে এই সমস্যা কমানো যায়?

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভ্রমণের কয়েক দিন আগে থেকেই ধীরে ধীরে ঘুমের সময় গন্তব্য দেশের সময় অনুযায়ী পরিবর্তন করলে শরীর সহজে মানিয়ে নিতে পারে।

গন্তব্যে পৌঁছে স্থানীয় সময় অনুযায়ী খাওয়া, ঘুমানো এবং দিনের আলোতে কিছু সময় কাটানোও শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়িকে দ্রুত নতুন সময়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করে। পাশাপাশি হালকা হাঁটাহাঁটি বা মাঝারি মাত্রার শরীরচর্চাও উপকারী হতে পারে।

অনেকে মেলাটোনিন নামের ওষুধ ব্যবহার করেন। কিছু গবেষণায় এটি উপকারী বলে উল্লেখ করা হলেও বিশেষজ্ঞরা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এই ওষুধ না খাওয়ার পরামর্শ দেন। কারণ ভুল সময় বা মাত্রায় সেবন করলে উল্টো শরীরের স্বাভাবিক ছন্দ আরও বিঘ্নিত হতে পারে।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?

সাধারণত কয়েক দিনের মধ্যেই শরীর নতুন সময় অঞ্চলের সঙ্গে মানিয়ে নেয়। তবে এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ঘুমের সমস্যা, অতিরিক্ত ক্লান্তি, মাথাব্যথা বা অন্যান্য উপসর্গ অব্যাহত থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বছরে এক-দুইবার দূরপাল্লার ভ্রমণে এসব সমস্যা সাময়িক হলেও, যাদের নিয়মিত আন্তর্জাতিক ভ্রমণ করতে হয় তাদের পর্যাপ্ত বিশ্রাম, সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত পানি পান এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

আরও পড়ুন

×