টানা আট রাত ইরানে মার্কিন হামলা, পরমাণুকেন্দ্রে আঘাত
যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত সেতু। ছবি: এএফপি
আল জাজিরা
প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ | ১০:১৯
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলায় উত্তেজনা আরও বেড়েছে। টানা অষ্টম রাতের মতো ইরানে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। এতে দেশটির একটি নির্মাণাধীন পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ একাধিক স্থাপনা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। জবাবে কুয়েতে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলার দাবি করেছে তেহরান। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘বিপর্যয়কর জবাব’ দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানের সামরিক বাহিনী।
এদিকে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাতের জেরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গত ১৭ জুন স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছেন ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘরিবাবাদি। তার অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র ওই সমঝোতার শর্ত লঙ্ঘন করেছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, ইরানের এ সিদ্ধান্তে তার ‘কিছু আসে যায় না’।
সমঝোতা অনুযায়ী দুই পক্ষের হামলা বন্ধ থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের রুট নিয়েও দুই দেশের মধ্যে বিরোধ তীব্র হয়েছে। ইরানের দাবি, তাদের নির্ধারিত নৌপথ এড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র জর্ডান উপকূল ঘেঁষে জাহাজ চলাচল করাতে চাইছে।
এ পরিস্থিতিতে রোববারও হরমুজ প্রণালিতে কয়েকটি জাহাজকে সতর্ক করে ইরানি বাহিনী। তাদের দাবি, চারটি জাহাজ ‘অনিরাপদ’ রুট ব্যবহার করছিল। সতর্কবার্তার পর দুটি জাহাজ ফিরে গেলেও বাকি দুটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। তবে ওই জাহাজগুলো হামলার শিকার হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানকে পরমাণু অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন থেকে বিরত রাখাই ওয়াশিংটনের লক্ষ্য। এর মধ্যেই শনিবার রাতে ইরানের দারখোভিন অঞ্চলে নির্মাণাধীন একটি পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছে, কেন্দ্রটির নির্মাণকাজ প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল। সংস্থাটি হামলার ঘটনা তদন্ত করছে।
অন্যদিকে ইরানের আণবিক শক্তি সংস্থা এ হামলাকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ আখ্যা দিয়ে বলেছে, এটি আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, শনিবার রাতের হামলার উদ্দেশ্য ছিল হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা এবং জর্ডানে মার্কিন সেনাদের ওপর হামলার জন্য ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরকে (আইআরজিসি) জবাব দেওয়া। একই রাতে দক্ষিণাঞ্চলের সিরিক এবং ইরাক সীমান্তবর্তী শাদেগান এলাকার কাছেও হামলা চালানো হয়।
মার্কিন হামলার জবাবে কুয়েতের আল আদিরি ক্যাম্প ও আলী আল সালেম বিমানঘাঁটিতে মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলার দাবি করেছে ইরান।
কুয়েত সরকার জানিয়েছে, টানা দ্বিতীয় দিনের মতো তাদের একটি পানি পরিশোধনাগার হামলার মুখে পড়েছে। একই সময়ে জর্ডানে বিমান হামলার সতর্কসংকেত বাজে এবং দেশটির সামরিক বাহিনী কয়েকটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করে।
ইরানের খাতাম আল-আম্বিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের কমান্ডার মেজর জেনারেল আলী আবদুল্লাহি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র হামলা অব্যাহত রাখলে তার জবাব আরও কঠোর ও বিপর্যয়কর হবে। অন্যদিকে পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ দেশবাসীর প্রতি ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, বিদেশি হামলার মুখে জাতীয় ঐক্যই সবচেয়ে বড় শক্তি।
এদিকে যুদ্ধ পরিস্থিতি আবারও তীব্র হওয়ার আশঙ্কার মধ্যে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও জ্বালানিবাহী সামরিক উড়োজাহাজ গ্রহণের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। যদিও ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েল সরাসরি ইরানে হামলা চালায়নি।
মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের গবেষক রস হ্যারিসন আল-জাজিরাকে বলেন, সামরিক পদক্ষেপ তখনই কার্যকর হয়, যখন তা রাজনৈতিক বা কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হয়। তাঁর মতে, ধারাবাহিক মার্কিন হামলা ইরানের জনগণকে আরও ঐক্যবদ্ধ করতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্য অর্জনকে কঠিন করে তুলবে।
- বিষয় :
- যুক্তরাষ্ট্র
- ইরান
- হামলা