গণতন্ত্র
সংসদের আলোচনায় ‘মানুষ’ কোথায়
এম এম খালেকুজ্জামান
এম এম খালেকুজ্জামান
প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ | ০৭:১৭ | আপডেট: ১২ মে ২০২৬ | ০৭:১৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
অধুনালুপ্ত ত্রৈমাসিক ‘প্রতিচিন্তা’র প্রাথমিক সংখ্যায় যৌথভাবে লিখিত মুখ-রচনায় সম্পাদক মতিউর রহমান ও অর্থনীতিবিদ বিনায়ক সেন বলেছিলেন, আমাদের প্রজাতন্ত্র প্রজায় ও তন্ত্রে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যাচ্ছে। আমরা নাগরিক বলে নিজেদের যতই দাবি করি না কেন, সরকার জনগণকে প্রজা ভিন্ন অন্য কিছু ভাবে কি?
মানুষ ভাবলে সংসদীয় আলোচনার কেন্দ্রে মানুষ থাকত। অথচ দেখা যাচ্ছে, ট্রেজারি বেঞ্চ ও বিরোধী দল ব্যস্ত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কৃতিত্ব, জুলাই সনদের বৈধতা, সংস্কার, না সংশোধন– এসব বিতর্কে।
রাষ্ট্রের শীর্ষ থেকে তৃণমূলের নাগরিক; প্রত্যেকের একটিই ভোট। এই ভোটের জন্য প্রার্থীরা সবাইকে সমাদর করেন। নির্বাচন শেষ হলে তৃণমূলের সেই ভোটারের আর কোনো কদর থাকে না। প্রার্থীরা ভোটের আগে আপাত অচ্ছুত ভোটারের হাতের সঙ্গে হাত মেলান, বুকে বুক মেলান। কিন্তু নির্বাচন শেষে অনেক নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিই পিঠ দেখান। আমাদের ভোটের রীতি এমনই। এখানে জনগণকে যতটা ভোটার ভাবা হয়, ততটা মানুষ ভাবা হয় কি?
২
ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন শেষ হয়েছে। একদা রাজনৈতিক মিত্র এখন মুখোমুখি। সংসদে সে বিরোধিতা কতটা জনস্বার্থবিষয়ক, আর কতটা নিজ নিজ দলের শক্তিমত্তা প্রমাণে– সেটি প্রশ্ন। ভোটের মতো সংসদ বিতর্কও ছিল ভুলে যাওয়া বিষয়। আগের তিন সংসদে ট্রেজারি বেঞ্চ ও বিরোধী দলের কোনো পার্থক্য ছিল না। কারণ বিরোধী দলও সরকারের অংশ ছিল।
ভোট ও সংসদ পঞ্চবার্ষিকী আয়োজন। কিন্তু ২০০৮ সালের পর প্রকৃত নির্বাচন থেকে বঞ্চিত দেশের জনগণ। ২০১৪ সালের পর নির্বাচিত প্রতিনিধি নয়, মনোনীত এক রকম প্রশাসকরাই ছিলেন দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। নির্বাহীরাই ছিলেন ক্ষমতাচর্চায়। প্রকৃত সংসদও ছিল অনুপস্থিত। আশা করি, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ দেশের আগামী পথরেখা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
স্বাধীনতার পর থেকে একেকটি শাসনধারার যেমন একদলীয়, সামরিক, আধাসামরিক, দ্বিদলীয় জোট, তত্ত্বাবধায়ক, অন্তর্বর্তী–অবসান ঘটে। আর জনগণ ভাবে, পুরোনো কাঠামো গুঁড়িয়ে দিয়ে রাষ্ট্র পুনর্গঠন করতে হবে। কিন্তু যারাই একবার ক্ষমতায় যায় তারা কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠে।
কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতন গণআন্দোলন বা গণঅভ্যুত্থান ছাড়া হয় না। কারণ শাসন-নির্বাচন সব তারা নিয়ন্ত্রণ করে। দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলনের পর রাষ্ট্র পুনর্গঠনে ন্যায্য শাসন, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দায়িত্ব পেতে চায় নতুন কোনো দল কিংবা ক্ষমতা থেকে দূরে থাকা কোনো দল। নির্বাচন হচ্ছে সেই শাস্ত্রীয় মাধ্যম। সংসদ তার পরীক্ষাক্ষেত্র। এবারের সংসদে এখন পর্যন্ত এসবের অনুপস্থিতি আমরা দেখছি।
এবারের নির্বাচনে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন ছাড়াও ছিল সংস্কার প্রশ্নে গণভোট। নির্বাচন অনুষ্ঠানকারী সরকার সরাসরি ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণায় ছিল শুরু থেকেই। এর অংশ হিসেবে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বেতার ও টেলিভিশনে প্রচারিত ভিডিও বার্তায় জনগণের প্রতি ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে দেশ বৈষম্য, শোষণ ও নিপীড়নের চক্র থেকে বেরিয়ে আসবে এবং একটি নতুন বাংলাদেশের পথ উন্মুক্ত হবে। ‘হ্যাঁ’ ভোট কি সেই সম্মতি? গণভোট আয়োজন নিয়ে যেমন জনপরিসরে বিতর্ক ছিল নির্বাচনের আগে, এখন সংসদ উত্তপ্ত সেটি নিয়ে। শেষ পর্যন্ত গণভোট অধ্যাদেশ সংসদে আইন আকারে উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ হয়েছে।
অথচ ঈদযাত্রার মরণঘাতী অব্যবস্থাপনা, অন্তর্বর্তী সরকারের নির্দয় অদূরদর্শিতায় হামের টিকার সংকটে শিশুমৃত্যু হতে পারত সরকারকে জবাবদিহি করার উপযুক্ত আলোচনার বিষয়।
৩
অর্থনৈতিক পশ্চাৎপদতাই যে গণতন্ত্রকে স্থিতিশীল করতে দেয় না– এটি প্রমাণিত বাস্তবতা। গণতন্ত্রের অস্থিতিশীলতার সমস্যা শুধু বাংলাদেশেই নয়; প্রায় সব উন্নয়নশীল দেশকেই এ সমস্যার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে।
অর্থনৈতিকভাবে স্থিতিশীল ও বিকশিত পুঁজিবাদী সমাজের অন্ধ অনুকরণ আমাদের বেশ প্রিয় এবং সেটিকে রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে মেনে ‘গণতন্ত্র’কে আমাদের জন্য নির্ধারিত শাসন পদ্ধতি বলে সাব্যস্ত করেছি। শত বছরের অনুশীলনে পশ্চিমা সমাজ আজ এই পর্যায়ে এসেছে। আমাদের যাত্রা শুরুই তো হয়নি সেভাবে।
কয়েক শতাব্দী ধরে নানা প্রক্রিয়ার পুঁজিবাদী দেশগুলোতে অর্থনীতি যত বিকশিত হয়েছে, ততই সর্বজনীন ভোটাধিকারভিত্তিক গণতন্ত্র পূর্ণাঙ্গ রূপ পেয়েছে। মনে রাখা দরকার, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা যুক্তরাজ্যেও নারীর ভোটাধিকারের জন্য বিশ শতকের বিশ দশক পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো যখন প্রেসক্রিপশন মেনে অবিকশিত অর্থনীতি নিয়েই বিকশিত পুঁজিবাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থার চর্চা করতে সচেষ্ট, তখন স্বাভাবিকভাবেই নানা কাঠামোগত অসংগতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সমস্যা তারই একটি কার্যকর উদাহরণ। তবে এবারের নির্বাচনে এই সমস্যাকে নীতিগতভাবে বড় দুটি জোট মেনে নিলেও তাদের ইশতেহার এ ব্যাপারে কী পরিবর্তন আনবে– পরিষ্কার নয়।

সমান এবং সমতা শব্দ দুটি বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে যে আলাদা, সেটি জামায়াতপ্রধানের নানা মন্তব্যে প্রকাশ পেয়েছে। যেমন নারীদের জন্য ৫ ঘণ্টা কাজের সীমা নির্ধারণ। যখন নারী-পুরুষ উভয়ের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের স্বাধীনতা সমান হারে সৃষ্টি করা হয়, তখন সেখানে সমতা আর সমান একই অর্থ বহন করে না। পিছিয়ে পড়া নারীদের এগিয়ে আনতে ‘ইতিবাচক বৈষম্য’ প্রয়োজন হলেও করতে হবে; এমন কথা কি অন্য দল বলেছে নির্বাচনের আগে? এবং নির্বাচিত হয়ে সংসদেও কি বলছেন? উল্টো ওয়াজ মাহফিলে সম্মানিত নারী সদস্যকে উদ্দেশ করে অপ্রকাশযোগ্য সব বয়ান দিচ্ছেন।
সরকারের বড় কাজের জন্য ঠিকাদার দরকার। ঠিকাদার নিয়োগের জন্য ‘পাস্ট পারফরম্যান্স ইভল্যুশন ম্যাট্রিক্স’ বা অতীত পারদর্শিতা মূল্যায়ন পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। এটি এমন পদ্ধতি, যেখানে অতীতে যে ঠিকাদার সবচেয়ে বেশি কাজ করেছেন, তিনিই আবার কাজ পেয়ে যান। আমাদের এই ভোটের রাজনীতিও আসলে তেমন কিছুর নির্ধারণী? সংসদীয় রাজনীতিতে বরং আমরা ব্যবসায়ী বা ঠিকাদার নয়, জনমুখী জনপ্রতিনিধিই দেখতে চাই।
৪
স্বাধীনতার পর সাড়ে পাঁচ দশক অতিক্রান্তের পথে। ইতিহাসের বিচারে খুব অল্প সময় নয়। এই সময়ের মধ্যে অনেক জাতি নিজেদের রাষ্ট্রীয় কাঠামো সুসংহত করেছে; সামাজিক শৃঙ্খলা ও নাগরিক চরিত্র গড়ে তুলেছে; জাতিগত আত্মমর্যাদাবোধকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।
বিপরীতে এই প্রশ্ন করি, আমরা কি সত্যিই একটি সুসংহত ‘জাতি’ হয়ে উঠতে পেরেছি? বরং মনে হয়, আমরা এখনও কার্যত জনসমষ্টি; যার রাষ্ট্র আছে, পতাকা আছে, সংবিধান আছে; কিন্তু জাতিগত চরিত্র গঠনের জায়গায় গন্তব্যহীন।
সূচনা টেনে শেষ করা যায়। পরিষ্কারভাবে এখানে প্রজা ও তন্ত্র পরস্পর বিচ্ছিন্ন। এর পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, প্রকৃত প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে রাজনীতিবিদদের জনগণকে প্রজা অথবা ভোটার নয়; মানুষ ভাবতে হবে ভোটে ও সংসদে।
এম এম খালেকুজ্জামান: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
- বিষয় :
- গণতন্ত্র
