উচ্চারনের বিপরীতে
আইনের শাসন এবং ‘ভায়োলেন্স’ হুমকি
মাহবুব আজীজ
মাহবুব আজীজ
প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬ | ০৬:৪১
| প্রিন্ট সংস্করণ
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারের দৃঢ়তা ও দক্ষতার পাশাপাশি রাষ্ট্রের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা জরুরি। এর মধ্যে পুলিশ বাহিনী বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে জনবিরোধী ভূমিকায় এই বাহিনীর মনোবল ও কাঠামো ভেঙে পড়েছিল। সময়ের সঙ্গে গতি ফিরলেও সম্প্রতি পুলিশ বাহিনী বিভিন্ন হামলার শিকার হচ্ছে। সমকাল জানাচ্ছে, সিলেট ও চট্টগ্রামে পুলিশ ও র্যাব সদস্য নিহত; চলতি মাসে পুলিশ বাহিনীর ওপর ১৩ হামলায় ৩২ জন আহত। চার মাসে হামলা হয়েছে ২১৩টি। অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে ৮৩৪টি (২৩ মে, ২০২৬)।
চট্টগ্রামে বাকলিয়ায় ৪ বছরের শিশু ধর্ষণ মামলার আসামির গ্রেপ্তার ঘিরে পুলিশ ও জনতার মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটে। বাকলিয়ার পর আগ্রাবাদ ও বায়েজিদে তিন শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ ওঠে। জনতা অভিযুক্তকে আটকে পিটুনি দেয়। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেবার চেষ্টা করলে উত্তেজিত জনতা পুলিশকে অবরুদ্ধ করে। রাজধানীর দনিয়ায় ব্রাইট স্কুলে এক ছাত্রীর আত্মহত্যার জেরে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মুখে পুলিশের সামনেই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানকে গণপিটুনি দেওয়া হয়। চলতি মাসে খোদ রাজধানীতে তিন দফায় দায়িত্ব পালনকালে আক্রান্ত হয়েছে পুলিশ।
গণঅভ্যুত্থানকালীন ভূমিকার কারণে পুলিশের প্রতি জনসাধারণের আস্থা কমেছে– এটা যেমন সত্য, তেমনি সত্য যে নির্বাচিত সরকারের যাত্রারম্ভের পর পুলিশের ওপর আস্থাও রাখতে চাইছে। গণতান্ত্রিক সরকারের পুলিশ অবশ্যই স্বৈরাচারী সরকারের পুলিশ হয়ে উঠবে না। কিন্তু অনবরত বিশৃঙ্খলা শুধুই পুলিশের প্রতি অনাস্থার সূচক হিসেবে ভাববার মতো সরল হতে পারে না। সরকারকে ব্যতিব্যস্ত রেখে নানা জায়গায় বিশৃঙ্খলা বাধিয়ে আলুপোড়া দিতে চাইতে পারে স্বার্থান্বেষী মহল! না, এভাবে অদৃশ্য শক্তিকে দায়ী করেও উদ্ধার পাওয়া যাবে না; বরং সরকারকে সংবেদনশীলতার সঙ্গে ক্ষতচিহ্নগুলো সন্ধান ও মেরামতের উদ্যোগ নিতে হবে।
দেশজুড়েই শিশু ধর্ষণ ও হত্যার বিকৃতি আগের তুলনায় বেশি সংখ্যায় সামনে আসছে; আইনের কঠোর ও উপযুক্ত প্রয়োগই কেবল এই বীভৎসতা থামাতে পারে। পল্লবীর শিশুটির ওপর ঘটে যাওয়া ঘটনায় সরকারের ত্বরিত পদক্ষেপ যদিও ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে; এক-দুটি ঘটনায় পদক্ষেপ অবশ্যই যথেষ্ট নয়। রাজধানীর বনশ্রীতে ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের শিকার মাদ্রাসাছাত্রসহ প্রতিটি ঘটনায় একই রকম গতি ও শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। আইনের দীর্ঘসূত্রতা কাটানো রাষ্ট্র ও জনগণের জন্যই জরুরি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পল্লবীর বালিকাটির বাড়িতে উপস্থিত হয়ে সমবেদনা জানানোর বিষয়টি অবশ্যই ইতিবাচক। তবে এই সময়ে রাস্তায় দুয়োধ্বনির ঘটনাটি ভেবে দেখবার মতো। বেদনার্ত পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর মানবিক বার্তাকে দুয়োধ্বনি দেওয়া সামাজিক সংবেদনশীলতার অবশেষ নষ্ট করবার অপচেষ্টা বলেই মনে হয়। এই অপপ্রয়াসেরই অংশ সম্ভবত কর্তব্যরত পুলিশের ওপর একের পর এক হামলা।
কারা করছে এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড? এদেরও চিহ্নিত করে আইনের হাতে সোপর্দ করবার দায়িত্ব পুলিশকে নিতে হবে। তা না করে বিভিন্ন বিরোধী পক্ষকে দায়ী করা আওয়ামী লীগ শাসনকালকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের বদলে সরকারের পক্ষ থেকে আমরা পদক্ষেপ দেখতে চাই। দুয়োধ্বনি দেওয়া গণতান্ত্রিক অধিকার যারা বলছেন, তারা মানবিক সংবেদনশীলতাকে অস্বীকার করছেন। আইন নিজের হাতে তুলে নেবার প্রবণতা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া; সেটিও বিবেচনায় রেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিজের কাজটি করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ, প্রশিক্ষণ ও লোকবল যেমন জরুরি; তার আগে জরুরি প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসনের অনুশীলন।
২.
গত সপ্তাহে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী র্যাবের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বলেছেন, নতুন আইনের অধীনে এটি এলিট ফোর্স হিসেবে থাকবে। এই সিদ্ধান্ত উদ্বেগজনক। ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে জুলাই গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি অবনমনের মূল অনুঘটক হিসেবে বাহিনীটিকে শনাক্ত করেছেন দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা। আইনিভাবে দায়মুক্তি ভোগ করবার পাশাপাশি বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জড়ায় র্যাবের অনেক সদস্য। যুক্তরাষ্ট্র ২০২১ সালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র্যাবের সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। বিএনপিও বিরোধী দলে থাকাকালে র্যাব বিলুপ্তির দাবি জানিয়েছে। বাহিনীটির বর্তমান কাঠামো পরিবর্তনের সাহসী সিদ্ধান্ত আইনের শাসনের প্রতি সরকারের অবস্থানই দৃঢ় করবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে ‘আর্বিট্র্যারি অ্যারেস্ট’ বা ইচ্ছামাফিক প্রেপ্তার এখনও চলমান বলে অভিযোগ রয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক নামের অভিনব এক প্রথা রয়েছে, যার কোনো আইনি ভিত্তি নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেছেন, ‘ডিবি বা অন্যান্য সংস্থার কার্যালয়ে আসামি রাখার কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। থানা ছাড়া অন্য কোথাও আসামি নয়– এই নীতি কঠোরভাবে কার্যকর করতে হবে’ (প্রথম আলো, ২৪ মে ২০২৬)।
থানা মানেই পুলিশের কর্মপরিসর; এখানেই নাগরিকের কাছে জবাবদিহিতা চাইতে পারে রাষ্ট্র। বাড়তি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৈরি করে সেটাকে দায়মুক্তি, নাগরিকের ওপর রাষ্ট্রের অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় নজরদারি আইনবহির্ভূত ঘটনার জন্ম দেয়।
৩.
আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার উদাহরণ আমরা নিকট অতীতে বারবার দেখেছি। বিশেষত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এক শ্রেণির উচ্ছৃঙ্খল মানুষ যত্রতত্র আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে বীভৎসতা চালিয়েছে, যাকে মব সন্ত্রাস হিসেবে দেশের মানুষ চিনেছে। গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে মব সন্ত্রাস নির্মূল প্রত্যাশিত হলেও এখনও কোথাও কোথাও মব সন্ত্রাস দেখা যায়। এই সন্ত্রাসীদের দ্রুত আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে একটি হটলাইন ও দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল চালু করা যেতে পারে।
অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ফুলেফেঁপে ওঠা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত মব সন্ত্রাসীরা এত কম সময়ে সাধু হয়ে যাবে– এমন ভাববার সময় এখনও আসেনি। আর অগণতান্ত্রিক শক্তি সব সময়ই চাইবে সামাজিক অস্থিতিশীলতা। বিশৃঙ্খলার ধোঁয়ার ভেতরে তারা উদ্দেশ্য চরিতার্থের সুযোগ খোঁজে। অবশ্য কোনটা বিশৃঙ্খলা আর কোনটা যে প্রকৃত জনবিক্ষোভ– এটি নিয়েও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছেন গণঅভ্যুত্থানের তরুণ নেতাদের অনেকে। শুক্রবার প্রেস ক্লাবে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেছেন, ‘সরকারি দল যদি ভায়োলেন্স চায়, সেটাকেই একমাত্র রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে নিতে চায়, তাহলে এটা যে আমাদের থেকে বেশি কেউ পারবে না– তা ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে দেখিয়ে দিয়েছি (সমকাল, ২৩ মে, ২০২৬)।’
অন্তর্বর্তী সরকারের ছাত্র উপদেষ্টা অবশেষে তাহলে স্বীকার করলেন– চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে তারা ভায়োলেন্স দেখিয়েছেন! তা তারা করতেই পারেন; কিন্তু দল-মত-পথ নির্বিশেষে দেশের মানুষ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শামিল হয়েছিলেন। চেয়েছিলেন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জবাবদিহিতার শাসনের সূচনা করবেন। লুণ্ঠন ও অবিচারে পিষ্ট মানুষের গণতান্ত্রিক উত্তরণের আকাঙ্ক্ষাকে তাহলে ‘ভায়োলেন্স’ দিয়ে বিপথে নিতে চেয়েছিল উচ্চাভিলাষী কেউ কেউ? হতে পারে। রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিটি বাঁকে এ রকম অনেকেই থাকতে পারেন। তবে শেষ পর্যন্ত মানুষের সম্মিলিত গণতান্ত্রিক স্বপ্নযাত্রাই বিজয়ী হয়– ইতিহাসে বারবার তা প্রমাণিত। এখনও এ দেশে আইনের শাসন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার যে অনিঃশেষ চেষ্টা দেখা যাচ্ছে; তা সেই একই উচ্চাভিলাষজাত, যার কোনো গণভিত্তি নেই। আইনের শাসনই এর একমাত্র নিদান।
মাহবুব আজীজ: উপসম্পাদক, সমকাল; সাহিত্যিক
[email protected]
- বিষয় :
- মাহবুব আজীজ
