সমকালীন প্রসঙ্গ
নারী ও শিশু নির্যাতন রোধে রাষ্ট্র ও সমাজের দায়
ফারাহ্ কবির
ফারাহ্ কবির
প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬ | ০৬:৩৫ | আপডেট: ২৬ মে ২০২৬ | ০৬:৩৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশে নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা একটি গভীর সামাজিক, মানবিক ও রাষ্ট্রীয় সংকটে পরিণত হয়েছে। ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন, পারিবারিক সহিংসতা, অনলাইনে হয়রানি, শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি– সব মিলিয়ে নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্ন এখন জাতীয় উদ্বেগের কেন্দ্রে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একের পর এক নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা সমাজকে নাড়া দিলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, অপরাধীর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব এবং ভুক্তভোগীকে দোষারোপের সংস্কৃতি সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ইদানীং নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা যে উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে, তা সংবাদমাধ্যমে চোখ রাখলেই স্পষ্ট হয়। প্রতিনিয়ত সংঘবদ্ধ যৌন সহিংসতা, হত্যা, সংঘবদ্ধ যৌন সহিংসতা, শিশু নির্যাতন, সাইবার হয়রানি এবং নারীর বিরুদ্ধে নির্মম সহিংসতার সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। শুধু অপরাধের সংখ্যা নয়, বরং এসব অপরাধের নির্মমতা, পুনরাবৃত্তি এবং অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীদের দায়মুক্তির প্রবণতা সমাজের জন্য গভীর সংকেত বহন করছে।
স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, আমাদের প্রচলিত আইন ও বিচার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? আইনের বাস্তব প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা ঠিক কোথায়? বড় প্রশ্ন, সমাজে এই সহিংস মানসিকতা কেন দিন দিন এমন শিকড় গাড়ছে?
নারীর প্রতি সহিংসতা কেবল আইনি কাঠামোর ভেতর দিয়ে দেখার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের সামাজিকীকরণ, ক্ষমতার রাজনীতি, জেন্ডার বৈষম্য এবং সাংস্কৃতিক মনস্তত্ত্ব। নির্যাতনের শিকার একজন নারী বা শিশুর জন্য ত্বরিত বিচার নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি তার মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠা, সামাজিক পুনর্বাসন ও আত্মমর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে অপরাধীর সহিংস আচরণের পেছনের মনস্তত্ত্ব, বিকৃত পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি, পর্নোগ্রাফি বা সহিংস কনটেন্টের নেতিবাচক প্রভাব এবং সামাজিক দায়মুক্তির সংস্কৃতি নিয়েও গভীর কাটাছেঁড়া প্রয়োজন। কারণ এই সহিংসতা শুধু ব্যক্তির বিচ্যুতি নয়; আমাদের সমাজের দীর্ঘ দিনের বৈষম্য ও নীরব সম্মতিরই এক কদর্য প্রতিফলন।

বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে একাধিক কঠোর আইন রয়েছে। বাস্তবে তদন্তে দুর্বলতা, বিচারপ্রাপ্তির দীর্ঘ পথ এবং ভুক্তভোগীর সুরক্ষার অভাবে আইনের সুফল মিলছে সামান্যই। নির্যাতনের শিকার নারীরা কেবল শারীরিক ক্ষত বহন করেন না; সমাজবিচ্ছিন্নতা, গভীর ট্রমা ও দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মধ্য দিয়েও যান। অথচ আমাদের রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় ট্রমা-সংবেদনশীল মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার সুযোগ এখনও নামমাত্র।
অন্যদিকে অপরাধ প্রতিরোধের আলোচনায় অপরাধীর মানসিক বিকার, বিকৃত পুরুষতান্ত্রিক সামাজিকীকরণ ও শৈশবের ট্রমার মতো বিষয় বরাবরই উপেক্ষিত থেকে যায়। ফলে ব্যাধির চিকিৎসা হলেও এর মূল কারণটি অন্ধকারেই থেকে যাচ্ছে।
তাই আজ একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনা জরুরি: নারী ও শিশু নির্যাতনকে কি আমরা কেবলই অপরাধ হিসেবে দেখব, নাকি একে একটি সমন্বিত মনস্তাত্ত্বিক ও রাষ্ট্রীয় সংকট হিসেবে বিবেচনা করব? যার সমাধানে আইন, শিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক রূপান্তরকে এক সুতোয় বাঁধতে হবে।
২০২৬ সালে দেশ একটি নতুন সরকার পেয়েছে। দেশ গঠনের এই সময়ে নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম শীর্ষ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। আইনকে শুধু শাস্তিমূলক অস্ত্র হিসেবে না রেখে একে প্রতিরোধমূলক, পুনর্বাসনমুখী ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থায় রূপান্তর করার এখনই সময়।
ফারাহ্ কবির: একশনএইড
বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর
- বিষয় :
- ফারাহ্ কবির
