ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

মাদকাসক্তি থেকে যুবসমাজকে ফেরাতে হবে

মাদকাসক্তি থেকে যুবসমাজকে ফেরাতে হবে
×

সৈয়দ ফারুক হোসেন

সৈয়দ ফারুক হোসেন

প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ | ০৭:১৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

বর্তমান বিশ্বে পারমাণবিক মারণাস্ত্রের চেয়েও ভয়ংকর রূপ নিয়েছে মাদকাসক্তি। মাদক প্রতিনিয়ত ধ্বংস করে দিচ্ছে আমাদের জাতির ভবিষ্যৎ যুবসমাজকে। অকালে ঝরে যাচ্ছে অসংখ্য তাজা প্রাণ। যুবসমাজ দেশকে নেতৃত্ব দেবে, এগিয়ে নেবে। কিন্তু কথাগুলো এখন অনেকটা কিতাবীয় এবং কথার কথায় পরিণত হয়েছে। কারণ বাস্তবে আমরা দেখছি, এ কথার প্রতিফলন যুবসমাজের ওপর খুব কমই দেখা যায়। বর্তমান সময়ে মাদকের ভয়াবহ গ্রাস চলছে। 

গাজীপুরের কাপাসিয়ায় সম্প্রতি মাদকের প্রভাবে একটি নৃশংস ও লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। গত ৮ মে, শুক্রবার দিবাগত রাতে কাপাসিয়া উপজেলার রাউতকোনা এলাকায় ফোরকান মিয়া নামে এক ব্যক্তি তার স্ত্রী, তিন সন্তান ও শ্যালককে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত ফোরকান মিয়া একজন মাদকাসক্ত। পুলিশ ও স্থানীয়দের মতে, মাদকের টাকার জন্য সে প্রায়ই তার স্ত্রীকে নির্যাতন করত। ঘটনার রাতে সে কৌশলে তার পরিবারের সদস্যদের খাবারের সঙ্গে চেতনানাশক মিশিয়ে অচেতন করে। পরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে সবাইকে হত্যা করে।
মাদকাসক্ত অবস্থায় বা টাকা জোগাড় করতে গিয়ে খুন, ধর্ষণ ও ছিনতাইয়ের এমন ঘটনা নিত্যদিনের খবরে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশে মাদকের ভয়াবহতা বর্তমানে প্রধান সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে। ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মাদকের পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বাংলাদেশে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনোভাবে মাদকাসক্ত। অন্য একটি তথ্যে এই সংখ্যা দেড় কোটি পর্যন্ত দাবি করা হয়েছে। মাদকাসক্তের ৮০ শতাংশই কিশোর ও তরুণ বয়সী। এর মধ্যে ৬০ শতাংশ বিভিন্ন ধরনের অপরাধের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। 
মাদক সীমান্ত পেরিয়ে দেশে প্রবেশ করছে। মাদকাসক্ত তরুণরা ক্রমশ সংসার, সমাজ ও দেশের জন্য বোঝা হয়ে উঠছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুবকরা বেশি মাদকাসক্ত হচ্ছে। মাদকসেবীর ৬০.৭৮ ভাগই এসএসসি পাস। ২০ থেকে ৪০ বছরের মাদকসেবীর সংখ্যা ৮১.৩৭ ভাগ। এ পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যাচ্ছে, মাদকের ভয়ংকর আগ্রাসনে কীভাবে তরুণ প্রজন্ম নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। 

দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ এবং দেশের ভবিষ্যৎ যাদের ওপর নির্ভর করছে, সেই যুবসমাজকে মাদকের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করতে হবে। এ কাজটি করতে পারলে দেশের তরুণ সমাজ ভয়াবহ বিপর্যয়, ধ্বংস ও অন্ধকারের দিকে ধাবিত হওয়া থেকে রক্ষা পাবে।  রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ে দাবি। 
এদিকে নারীরাও ঝুঁকছে মাদকের দিকে। দেশে নারীদের মধ্যে মাদকের দিকে ঝোঁকার প্রবণতা বাড়ছে। কয়েকটি মাদক নিরাময় কেন্দ্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আর্থিক নিরাপত্তা ভোগ করা পেশাজীবী নারী অনেকেই ঝুঁকছে মাদকের দিকে। আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে মাদকসেবী কিশোরীর সংখ্যা। গৃহবধূরাও হচ্ছে মাদকাসক্ত। এখন অভিজাত ক্লাবের পাশাপাশি বারগুলোতে প্রচুর নারী টেবিলে বসে মদ পান করে। যেসব বারে ডিস্কোর আয়োজন থাকে সেখানে প্রায় এক-

তৃতীয়াংশ নারীর উপস্থিতি দেখা যায়। দেশে গত তিন বছরে নারী ও শিশু মাদকাসক্ত হয়েছে তিন গুণ। 
ভয়ংকর তথ্য হচ্ছে, ইয়াবা সেবনকারী ৮৫ ভাগই তরুণ! আইস সেবনকারী ৮০ ভাগই তরুণ। যেভাবে বাংলাদেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা বাড়ছে, ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা ১ কোটি ছাড়িয়ে যাবে।

শিশু-কিশোররা প্রথমে সিগারেট দিয়ে নেশার জগতে প্রবেশ করে। এর পর তারা আস্তে আস্তে গাঁজা, হেরোইন, ফেনসিডিল, সিসা, ইয়াবা, পেথিড্রিন, ঘুমের ওষুধ, ড্যান্ডিসহ নানা ধরনের মাদকে আসক্ত হয়। তার মধ্যে পথশিশুদের কাছে মাদক হিসেবে আকর্ষণীয় নেশা ড্যান্ডি। এটি খেলে ক্ষুধা ও ব্যথা লাগে না। এটি দীর্ঘ মেয়াদে খেলে মস্তিষ্ক, যকৃত ও কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। 
অনেক সময় মাদকাসক্ত বন্ধুদের কু-প্রভাবেও ভালো ও মেধাবী শিশু-কিশোর অসৎ সঙ্গে পড়ে মাদক সেবনে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। মাদক গ্রহণ ও মাদক ব্যবসা দুটোই মারাত্মকভাবে সমাজে বিপর্যয় ডেকে নিয়ে আসছে এবং ভবিষ্যতে এর ফলাফল আরও ভয়াবহ। অপরদিকে নারী মাদকসেবী সামাজিকতার ভয়ে ও পরিবারের সুনাম রক্ষায় এসব অজুহাতে সঠিক চিকিৎসা ও সেবা পায় না। ফলে তাদের নিজের জীবন যেমন বিপর্যয়কর হয়ে পড়ে, তেমনি জাতির জন্য হয়ে পড়ে বোঝাস্বরূপ। 

দেশজুড়ে মাদক ভয়ংকর থাবা বিস্তার করেছে। শুধু শহর নয়, প্রত্যন্ত গ্রামেও অবাধে চলছে মাদক ব্যবসা। ফোন করলেই বাসায় চলে আসছে এসব মরণ নেশা। সম্প্রতি কক্সবাজারের সীমান্তবর্তী এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কয়েকশ নতুন মাদক ব্যবসায়ীর ভিন্ন পেশার আড়ালে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও গ্রামাঞ্চলে নানা ধরনের মাদকদ্রব্য সরবরাহ করছে।
বর্তমানে ইয়াবার পাচার হয়েছে বহু গুণ। কক্সবাজার ছাড়াও সিলেট ও কুমিল্লা সীমান্ত দিয়ে ইয়াবার পাচার বেড়েছে। মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনেকে বিভিন্ন পরিবহনের গাড়িচালক ও হেলপার এ পেশায় জড়িত। এ ছাড়া সবজি বিক্রেতা. দোকানি, সড়ক শ্রমিক, ফেরিওয়ালা, রিকশাচালকের বেশেও মাদক বিক্রি হয়। প্রাইভেটকার, বাস, ট্রেন, জরুরি পণ্যের ট্রাক, তেলের লরি, অ্যাম্বুলেন্স, পিকআপসহ বিভিন্ন যানে অভিনব কায়দায় মাদক সরবরাহ করা হচ্ছে। পাচার হয়ে আসা ইয়াবা, হেরোইন, মদ, বিয়ার, গাঁজা, ফেনসিডিল, আইসসহ ২৫ ধরনের মাদকদ্রব্য বেচাকেনা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু অসাধু ব্যক্তি মাদক ব্যবসায় জড়িত।

শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মাদকের মতো ভয়াল থাবা ছড়িয়ে পড়ার প্রধান কারণ হচ্ছে এর সহজলভ্যতা। প্যারেন্টিং গাইডেন্সের মাধ্যমে ৫ বছর বয়স পর্যন্ত সন্তানকে আদর-ভালোবাসায় রাখতে হয়। ১০ বছর বয়স থেকে শৃঙ্খলাপরায়ণতার ওপর জোর দিতে হয়। আর ১৬ বছর হয়ে গেলে তাদের সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশতে হয়। যুবসমাজকেও বুঝতে হবে– মাদক জীবন রক্ষা করে না; জীবনকে ক্ষয় করে। ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। এটা এক ধরনের আত্মহত্যার শামিল। যুবশক্তিকে দেশের অমূল্য সম্পদ বিবেচনা করে তার সংরক্ষণ ও পরিচর্যায় পদক্ষেপ নিতে হবে। মাদক নির্মূলে সরকারকে প্রয়োজনে কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

সৈয়দ ফারুক হোসেন: লেখক, সাবেক রেজিস্ট্রার, জাবিপ্রবি
 

আরও পড়ুন

×