পরিবেশ
কৃষিজমি বিনষ্ট করে অযাচিত উন্নয়ন
এএইচএম জেহাদুল করিম
এএইচএম জেহাদুল করিম
প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ | ০৭:২১ | আপডেট: ১৩ মে ২০২৬ | ০৭:২২
| প্রিন্ট সংস্করণ
জনসংখ্যার পরিসংখ্যানে, বাংলাদেশ পৃথিবীর অষ্টম বৃহত্তম দেশ, যার ভৌগোলিক আয়তন মাত্র ১৪৮,৪৬০ বর্গকিলোমিটার। এই ছোট্ট ভূখণ্ডে আমরা প্রায় ১৮ কোটি মানুষ অত্যন্ত আঁটোসাটো পরিবেশে বসবাস করে চলেছি। এই প্রেক্ষাপটে এটি নিঃসন্দেহে স্বীকার্য– ভারত, চীন, ইন্দোনেশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা যদিও ব্যাপক, তথাপি জনসংখ্যার ঘনত্বের দিক থেকে এসব দেশ আমাদের চেয়ে অনেকটাই সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। বর্তমানে ভারতের জনসংখ্যা ১৪৬ কোটি ৩৮ লাখ ১৫৫২৫ হলেও তাদের জনসংখ্যার ঘনত্ব মাত্র ৪৯২। একইভাবে চীনের জনসংখ্যা ১৪১ কোটি ৬০ লাখ ৯৬০৯৪ হলেও তাদের জনসংখ্যার ঘনত্ব মাত্র ১৫১। অন্যদিকে, বাংলাদেশে জনসংখ্যার ঘনত্ব হলো ১৩৫০, যা নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। প্রকৃতি প্রদত্ত কৃষিজমি ও সম্পদের মাথাপিছু পরিসংখ্যানে, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে অর্থনীতির ভারসাম্যতার তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে তার পরিবেশগত সক্ষমতার অবস্থান সম্পূর্ণভাবে অতিক্রম করে ফেলেছে।
প্রাক-ব্রিটিশ ও ব্রিটিশ বাংলায় জনসংখ্যার চাপ অনেকটাই কম থাকার কারণে সেই সময় আমাদের দেশে কৃষিজমির অপ্রতুলতা তেমন পরিলক্ষিত হয়নি। কিন্তু বর্তমানে দেশের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমার নিজস্ব এথনোগ্রাফিক গবেষণার পরিসংখ্যানে দেখা যায়, উত্তরবঙ্গে ধনঞ্জয়পাড়া নামে একটি গবেষিত গ্রামে ১৮৫০ সালে ২০৫ একর মোট জমির মধ্যে মাত্র ৯ একর জমি শুধু বসতবাড়ির জন্য ব্যবহৃত হয়েছিল। যে কারণে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই উক্ত গ্রামের বাকি ১৯৬ একর জমিই ব্যবহৃত হয়েছিল ফসল উৎপাদনে। যার ফলে তখন তাদের খাদ্য ঘাটতি একেবারে ছিল না বললেই চলে। পরে ১৯৬৮ সালের রিভিশনাল সেটেলমেন্ট সার্ভে প্রদত্ত পরিসংখ্যানে উল্লিখিত উক্ত গ্রামে বসতবাড়ির জন্য ব্যবহৃত জমি ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়ে ৫৮ একরে দাঁড়ায়। বসতবাড়ির ক্রমানুক্রমিক বৃদ্ধির সূত্র অনুসারে বর্তমানে এই গ্রামে ব্যবহৃত বসতবাড়ির পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি দাঁড়িয়েছে বলে জানা যায়। জ্যামিতিক হারে লোকসংখ্যা বৃদ্ধির সূত্র অনুযায়ী অপ্রত্যাশিত জনমিতিক চাপে আমরা এভাবে ক্রমাগত আমাদের চাষযোগ্য কৃষিজমি হারিয়ে ফেলছি, যা আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর একটি অবাঞ্ছিত চাপ।
বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত ছোট এবং আর্থিকভাবে দরিদ্র হওয়া সত্ত্বেও আজও আমাদের চিন্তা ও মননে সামন্তবাদী ভাবধারা থেকে বেরিয়ে আসতে পারিনি। ভীষণভাবে জমির স্বল্পতা থাকা সত্ত্বেও আমরা অকৃপণভাবে গ্রামের ফসলি জমিকে নির্দয়ভাবে ধব্বংস করে চলেছি। সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনায় যথেচ্ছ কৃষিজমি অধিগ্রহণ চলমান। বিশ্ববিদ্যালয়, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি বিভিন্ন শিল্প স্থাপনা, সামরিক-বেসামরিক বাসস্থানের জন্য বিশাল প্রকল্পের মাধ্যমে বেহিসাবিভাবে কৃষিজমি নষ্ট করা আমাদের স্বভাবগত বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অতি সম্প্রতি কিছু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিজস্ব ক্যাম্পাসে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের অজুহাতে অত্যন্ত সুকৌশলে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি দখল করে বিশাল ক্যাম্পাস গড়ে তুলেছে। কিছুদিন আগে পূর্বাচল এলাকায় তেমনি একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে আমরা সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিস্তীর্ণ এলাকা দখলের মাধ্যমে তাদের নিজস্ব কম্পাউন্ড তৈরির প্রবণতা দেখে হতবাক হয়ে গেছি। ধারণা করা যায়, সম্ভবত এসব প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে প্রাথমিকভাবে জমি অধিগ্রহণ করে, যা পরবর্তী সময়ে তারা অন্য উদ্দেশ্যে নিজস্ব আর্থিক কার্যক্রমে ব্যবহার করতে পারে। জমির অপ্রতুলতার এমন একটি দেশে একটি বিশ্ববিদ্যালয় বা সরকারি স্থাপনার জন্য কতটা জমি অধিগ্রহণ করা যেতে পারে, তারও একটি সীমারেখা থাকা বাঞ্ছনীয়। অবশ্যই আমাদের দেশের জমির আয়তন বিবেচনায় আমরা তা যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করতে দিতে পারি না।

সরকারি পদক্ষেপে অকারণে জমি বিনষ্ট করার আরেকটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো, সাম্প্রতিককালে বিসিএস প্রশাসনের ‘শুধুমাত্র সিনিয়র কর্মকর্তাদের’ প্রশিক্ষণের জন্য কেরানীগঞ্জে ৬৬ একর ফসলি জমি অধিগ্রহণ করে একটি ভিআইপি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রায় ৯০০ কোটি টাকা ব্যয়ে শুধু প্রশাসনের সিনিয়র কর্মকর্তাদের জন্য এ ধরনের একটি প্রকল্প কতটা প্রয়োজন, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। বিগত সরকারের সময় প্রশাসনের মধ্যে কেউ কেউ অতিউৎসাহী ও কৌশলী হয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে এই প্রতিষ্ঠানটি নির্মাণ করার জন্য সরকারকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করে।
আমরা অবগত, সাভারে বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র সম্প্রতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ১২০৭ কোটি টাকা ব্যয়ে তাদের নতুন ভবন তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে। বিপিএটিসির অনুরূপ ঢাকার শাহবাগেও বিশাল ভবন নিয়ে এমন প্রতিষ্ঠান কাজ করে যাচ্ছে। এতৎসত্ত্বেও উন্নয়নের নামে শুধু কিছু সিনিয়র অফিসারের প্রশিক্ষণের জন্য কেরানীগঞ্জে এমন ব্যয়বহুল স্থাপনা নির্মাণ কতটা যৌক্তিক, ভেবে দেখা দরকার।
আমাদের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে কখনও কখনও এমন একটি প্রবণতা কাজ করে, রাষ্ট্রীয় কল্যাণে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করার চেয়ে তারা ব্যক্তিস্বার্থ এবং তাদের নিজস্ব মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী এসব প্রজেক্টের বন্দোবস্ত করার জন্য সচেষ্ট হন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বিগত সরকারের সময়ে ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ে কক্সবাজারের পারকী সমুদ্রসৈকতে ৭২ একর জমিতে একটি সরকারি রাজকীয় অতিথিশালা তৈরি করা হয়েছে। এই অতিথিশালা কাদের জন্য তৈরি হয়েছিল, সুনির্দিষ্টভাবে আমাদের জানা নেই। তবে এটি নাকি বর্তমানে একটি শ্বেতহস্তী হিসাবে পরিগণিত। যার জন্য প্রতি মাসে অব্যবহৃত ব্যয় হয় ১৫ লাখ টাকা।
যাই হোক, আলোচনার মূল প্রসঙ্গে এ ইঙ্গিত করা যায়, অতিরিক্ত জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে আমাদের কৃষিজমির ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। সংগত কারণেই অযৌক্তিকভাবে উন্নয়নের নামে কৃষিজমি অধিগ্রহণ বন্ধ করা প্রয়োজন। এই প্রেক্ষাপটে স্বীকার করতেই হয়, প্রকৃতির ওপর আঘাত হানলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাদের খাদ্য নিরাপত্তা ও জীবিকায় মারাত্মক সংকটে পড়বে। তাই এসব বিষয় বিবেচনায় রেখে প্রকৃতি ও কৃষিজমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের অতি অবশ্যই সুপরিকল্পিত ও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন।
কৃষিজমির ক্ষয় এবং প্রকৃতিবিনাশী উন্নয়ন আমাদের জাতীয় জীবনে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এ বিষয়টি পরিকল্পনাবিদদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে।
ড. এ.এইচ.এম. জেহাদুল করিম: অ্যাডজাংক্ট প্রফেসর, নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটি; প্রাক্তন উপাচার্য, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- পরিবেশ
