শ্রদ্ধাঞ্জলি
আতা ভাইকে যেমন দেখেছি
আতাউর রহমান (১৯৪১-২০২৬)
কাওসার চৌধুরী
প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬ | ০৮:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
মঞ্চসারথি আতাউর রহমানকে নাট্যকর্মীরা ‘আতা ভাই’ বলেই ডাকতাম। বয়স, ব্যক্তিত্ব, পড়াশোনা আর সামাজিক অবস্থানে তিনি অনেক সিনিয়র হলেও প্রতিদিনের আচার-আচরণে তাঁর সঙ্গে আমাদের দূরত্ব ছিল খুব সামান্যই। ‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়’ প্রতিষ্ঠাকাল ১৯৬৮ থেকে আতাউর রহমান এই নাট্যদলের সাধারণ সম্পাদক পদে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। শেষের দিকে (বিগত প্রায় ১০ বছর) নাগরিক ছেড়ে ফ্রিল্যান্স কাজ করেছেন মঞ্চ ও টেলিভিশনে।
সময়টি ১৯৭৯ সাল। সে বছরেই আমি ‘অডিশন’-এ পাস করে বাংলাদেশ টেলিভিশনে তালিকাভুক্ত শিল্পীর মর্যাদা লাভ করি। ওই বছরেরই কোনো একটি সময়ে আমি বিটিভিতে অভিনয়ের প্রথম সুযোগ পাই সেলিম আল দীনের ‘আয়না’ নামে একটি সিরিজ নাটকে। ওই নাটকে আতা ভাই ছিলেন অন্যতম প্রধান চরিত্রে। সেখানেই তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম মিথস্ক্রিয়া। এরপর যখন ১৯৮৫ সালে ‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়’-এ যোগ দিই, তখন থেকে শুধু আতা ভাইকে নয়; নাগরিকের অন্যান্য ধ্বজাধারী শিল্পীকেও খুব কাছ থেকে দেখতে শুরু করি। সেই ‘দেখা-দেখি’কে পুঁজি করেই আজকের নিবন্ধটি রচনার প্রয়াস পেয়েছি।
নাগরিকে যাওয়ার পর আমি একজন ‘বিস্মিত বালক’-এর মতো অবলোকন করেছি ভিন্নধারার একটি নাট্যচর্চা আর সংস্কৃতির প্রতিপালন। মহড়াকক্ষে প্রায় প্রতিদিন নাটক নিয়ে বেশ উচ্চমার্গীয় আলোচনা চলে। সেই আলোচনা কখনও-সখনও বিতর্কে রূপ নেয়। সেই (যুক্তি) তর্ক আবার কোনো কোনোদিন যুক্তির সীমানা ছাড়িয়ে হাল্কা ঝগড়া পর্যন্ত গড়ায়। কিন্তু পরক্ষণেই আবার দেখি ঝগড়াঝাঁটি মিটিয়ে গলাগলি ভাব; একসঙ্গে চা-কফি পান করছেন। তবে সবচেয়ে বেশি তর্ক হতে দেখেছি দুজন প্রচণ্ড আবেগপ্রবণ, বিজ্ঞ আর শিশুসুলভ দুই নাট্যজনের মধ্যে। তার মধ্যে একজন আতাউর রহমান, অন্যজন আলী যাকের। সবচেয়ে মজার বিষয়; এই দুজন যতই তর্ক করুন না কেন– একজন আবার অন্যজনকে ছাড়া চলত না! সে এক ভিন্ন রকম, ভিন্নমাত্রার বন্ধুত্ব।
২০২১ সালে আমি আলী যাকেরের মঞ্চ নাটকের কর্মকাণ্ড নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছি– ‘আলী যাকের : আমাদের ছোটলু ভাই’ শিরোনামে। সেই প্রামাণ্যচিত্রে আতা ভাই যে ভাষা আর যে ভঙ্গিতে আলী যাকের, নাগরিক, মঞ্চ নাটকে স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী ও স্বাধীনতা-পরবর্তীকালকে তুলে ধরেছেন; অনেকটা সেভাবেই আমি বিষয়টাকে আপনাদের কাছে উপস্থাপনের চেষ্টা করছি।
বলে রাখা ভালো, ১৯৬৮ সালেই ‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়’-এর জন্ম। জন্মলগ্নে নাগরিকের সভাপতি ছিলেন অধ্যাপক জিয়া হায়দার এবং সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন আতাউর রহমান। এরপর আতাউর রহমান নাগরিকে যতদিন ছিলেন (মৃত্যুর কয়েক বছর আগ পর্যন্ত), ততদিন তিনিই ছিলেন নাগরিকের সাধারণ সম্পাদক।
এর মাঝে এলো মহান মক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধ, বিজয়ের পর– ১৯৭১ সালে বিশ্বসভায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াল বাংলাদেশ; ঘুরে দাঁড়াল জাতি। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে তখন নতুনের জোয়ার। দেশ গড়ার শপথে সবাই বলীয়ান। জাগরণ হলো বাঙালির। নব জাগরণ। যাকে অভিহিত করা যায় ‘রেনেসাঁ’ বলে। সেই জাগরণে আন্দোলিত হলো নাটকের মঞ্চ। মঞ্চের মানুষগুলো তখন যুক্ত হলো জাতির ‘নব তরঙ্গ’ অভিযানে।
আতাউর রহমান বলেন, ‘১৯৭২ সালে বিটিভিতে একটি নাটক করছিলাম আমি আর আবুল হায়াত। ‘মুক্তধারা’; রবীন্দ্রনাথের। আমি সেখানে যন্ত্ররাজ বিভূতি আর আবুল হায়াত সম্ভবত ধনঞ্জয় বৈরাগীর চরিত্রে অভিনয় করছিলেন। নাটকটি প্রযোজনা করছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। উনি করলেন কী; সেই সময়ের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ওই নাটকের সেট তৈরি করে ছয়টি ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি নিয়ে এলেন ‘মুক্তধারার’ বাঁধভাঙা স্রোত তৈরি করার জন্য। হাজার হাজার দর্শক ছিল সেদিন।
সে সময় আলী যাকের মামুনুর রশীদদের ‘আরণ্যক’ নাট্যদলে নাটক করতেন। আতাউর রহমানের আমন্ত্রণে আলী যাকের মামুনুর রশীদের সঙ্গে আলাপ করে নাগরিকে চলে এলেন ৭২ সালেই। সেই থেকে নাটকের উঠোনে দুজনের যুগল পথচলা শুরু।
স্বাধীন বাংলাদেশে নাগরিকের প্রথম নাটক মাইকেল মধুসূদনের লেখা ‘বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ’। সেই নাটকটি পরিচালনা করেন আতাউর রহমান। সেই নাটকে আলী যাকেরসহ আরও অভিনয় করলেন ড. ইনামুল হক, লাকী ইনাম, গোলাম রব্বানি, আবুল হায়াতসহ বেশ কজন শিল্পী; যারা বর্তমানে নাটকের জগতে কিংবদন্তির আসনে সমাসীন।
১৯৭২ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত নাগরিক যেই ৪৩টি নাটক মঞ্চে এনেছে, সেগুলো পরিচালনা করেছেন আতাউর রহমান, আলী যাকের, জিয়া হায়দার, আসাদুজ্জামান নূর, বিলেতি নির্দেশক ক্রিস্টোফার স্যান্ডফোর্ড (একটি যৌথ প্রযোজনা), আবুল হায়াত, খালেদ খান, জামালউদ্দিন হোসেন, সারা যাকের, গাজী রাকায়েত এবং পান্থ শাহরিয়ার। তালিকাটি মঞ্চায়নের কালানুক্রমিক ভিত্তিতে রচনা করেছিলেন আতাউর রহমান। সেই ধারায় আতাউর রহমান নাগরিকের জন্য নাট্য নির্দেশনা দিয়েছেন সর্বমোট ১৪টি নাটকে। সেই ১৪টি নাটকের সর্বমোট মঞ্চায়ন সংখ্যা ছিল ৩৮৭টি।
বাংলাদেশে স্বাধীনতা-পরবর্তী মঞ্চ নাটক নিয়ে আতাউর রহমানের মূল্যায়ন ছিল অত্যন্ত উজ্জ্বল ও আশাপ্রদ। আমার ‘অন ক্যামেরায়’ তিনি এক দিন বলেছেন, ‘সেই সময়ে জীবিকার জন্য কিছু একটা করতে হতো কিন্তু নাটকটি ছিল প্রাণ। খালি নাটকও নয়, নাটকের পাশাপাশি সৃষ্টিশীল নানা বিষয় নিয়ে ছিল আড্ডা। আড্ডাগুলো হতো হয় আলী যাকেরের বাসায়, নয় আমার বাসায়। সারারাত আড্ডা হতো! তখন রোববার ছিল বন্ধের দিন; বন্ধের দিনে নাটক করতাম আমরা।
নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় একটি অলিখিত বিদ্যালয় হয়ে গিয়েছিল। সেই আড্ডায় কেবল আমরা নই– আমাদের এখানে আড্ডা দিতে আসতেন কবি, নাট্যকার, চিত্রশিল্পী, নিউ-ফিল্ম মুভমেন্ট নিয়ে যারা কাজ করছিলেন তখন তারাসহ সবাই আসতেন। সেই সময়ে রাত ১২টা-১টা পর্যন্ত ধুমিয়ে আড্ডা হতো। আড্ডার পরে ঘুমাতাম হয়তো আলী যাকেরের বাসায় নয় আমার বাসায় (উল্লেখ্য, ইস্কাটনের একটি ভবনের ওপরে নিচে দুটি ফ্লোরে বসবাস করতেন আলী যাকের এবং আতাউর রহমান)। ঘুম থেকে উঠে বেলা ১১টায় আমরা চলে যেতাম মহিলা সমিতি মিলনায়তনে ‘মর্নিং শো’ করার জন্য। আগেই বলেছি– তখন রোববার ছিল সাপ্তাহিক ছুটির দিন।’
মঞ্চনাটকে স্বাধীনতা-পরবর্তী ‘রেনেসাঁ’ নিয়ে আতাউর রহমান বলেন–“‘রেনেসাঁ’ হলো পুনর্জাগরণ। যা কিছু হয়েছে, আসলে সেই সময়েই (স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে) হয়েছে। পুনর্জাগরণ কিন্তু বারবার হয় না। কলকাতাতেও তো থিয়েটারের রেনেসাঁয় উৎপল দত্ত, শম্ভু মিত্র, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়দের নিয়ে। …সেই সময়টা ছিল আমাদের নতুন একটি দেশ, বঙ্গবন্ধুর চেতনায়, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে উদ্বুদ্ধ একটি দেশ। ৩০ লাখ লোক শহীদ হয়েছেন, দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি হয়েছে– সেই রকম একটি পরিবেশে একদিকে যেমন সেলিম আল দীনের উত্থান, অন্যদিকে মামুনুর রশীদ, তার সঙ্গে পদাতিক, ঢাকা পদাতিক, নাগরিক, থিয়েটার, ঢাকা থিয়েটার, পাশাপাশি কিংবদন্তি নাট্যকার-নির্দেশক অভিনেতা আবদুল্লাহ আল-মামুন, নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হক– এদের মতো পরাক্রমশালী নাট্যজনকে আমরা আর পাচ্ছি না! নতুনদের মধ্যে মান্নান হীরা ছিল– সেও চলে গেছে করোনাকালে। এখন যে নতুনরা আর পারবে না সেটাও আমি বলছি না …তার জন্য আমাদের দীর্ঘকাল অপেক্ষা করতে হবে হয়তো। আরেকটি ‘কাল’ অপেক্ষা করতে হবে; আবার একটি রেনেসাঁ, আবার একটি পুনর্জাগরণের জন্য।’
আমাদের সেই কালের (নাকি মহাকাল) অপেক্ষায় রেখে আতাউর রহমান গত মঙ্গলবার চলে গেলেন পরপারে। ওখানে আপনি ভালো থাকুন আতা ভাই।
কাওসার চৌধুরী: প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও অভিনেতা
- বিষয় :
- শ্রদ্ধাঞ্জলি
